সাইবার অপরাধ দমনে বাড়ছে ডিজিটাল ফরেনসিক ও ল্যাব

সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় পুলিশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও দক্ষতা বাড়াতে দেশে ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব এবং সাইবার ল্যাবের সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে আগামী অক্টোবরে ঢাকার পাশাপাশি চট্টগ্রামেও ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব ও সাইবার ল্যাব উদ্বোধনের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, ইন্টারনেটসহ বিভিন্ন ডিজিটাল ডিভাইস ও নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে প্রতারণা এবং অন্যান্য অপরাধ দমনে পুলিশকে আরও সক্ষম করতে একটি পূর্ণাঙ্গ ও বিশেষায়িত ‘সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট’ গঠনের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরির কাজ চলছে।
সিআইডি জানিয়েছে, বিশেষায়িত সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট গঠনের জন্য চলতি বছরের ২১ সেপ্টেম্বর গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সহযোগিতা সম্প্রসারণেও কাজ করছে সরকার।
প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং উন্নত সাইবার ল্যাব পরিদর্শনের মাধ্যমে সক্ষমতা বাড়াতে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে যৌথ উদ্যোগ ও দ্বিপক্ষীয় আলোচনা চলছে বলেও সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো. ছুফি উল্লাহ বলেন, “সাইবার জালিয়াতি, হ্যাকিং ও অনলাইন হয়রানি সংক্রান্ত যেসব মামলা সিআইডিতে আসে, তা পেশাদারিত্ব ও আন্তরিকতার সঙ্গে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
বিজ্ঞাপন
তিনি আরও বলেন, “এ ক্ষেত্রে কর্মরত অফিসারদের সাইবার ট্রেনিং সেন্টার, ফরেনসিক ট্রেনিং ইন্সটিটিউট (এফটিআই) ও ডিটেকটিভ ট্রেনিং স্কুলে (ডিটিএস) চলমান ট্রেনিংয়ে নতুন নতুন মডিউল সংযোজন করা হচ্ছে। এ ছাড়া পুলিশ সদর দপ্তরের উদ্যোগে সম্প্রতি দেশব্যাপী সাইবার ‘ট্রেনিং অব ট্রেইনার্স’ (টিওটি) কোর্স চালু করা হয়েছে, যেখানে সিআইডি’র অফিসাররা অংশগ্রহণ করছেন।”
সিআইডির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক বছরে সাইবার অপরাধসংক্রান্ত জিআর ৩২টি ও সিআর ১৫৯টিসহ মোট ১৯১টি মামলা হয়েছে। একই সময়ে এসব অপরাধের ঘটনায় ১০১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সিআইডির তথ্যে বলা হয়েছে, হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে অনুমতি ছাড়া অন্যের ফেসবুক, ই-মেইল কিংবা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করে প্রতারণা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ভুয়া লিংক ও ওয়েবসাইট তৈরি করে ব্যবহারকারীর পাসওয়ার্ড বা ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে প্রতারণা চালানো হয়। পরিচয় ও জাতীয় পরিচয়পত্র জালিয়াতিও সাইবার অপরাধের অন্যতম পদ্ধতি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইন্টারনেটে ভয় দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল এবং মানহানির ঘটনাও ঘটছে।
বিজ্ঞাপন
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, “সাইবার অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। পুলিশ যেকোনো অপরাধ দমনে তৎপর রয়েছে। সমাজ থেকে অপরাধ দমন ও মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ সচেষ্ট রয়েছে।”
পুলিশ সদরদপ্তর জানিয়েছে, সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় বাংলাদেশ পুলিশ প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। ইন্টারনেটের অপব্যবহার, অনলাইন প্রতারণা ও আর্থিক জালিয়াতি বাড়ার প্রেক্ষাপটে পুলিশ বাহিনীকে আরও আধুনিক ও দক্ষ করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
এর অংশ হিসেবে মিরপুরের পুলিশ স্টাফ কলেজে সাইবার অপরাধের মামলা তদন্তবিষয়ক ১০ দিনের বিশেষ ‘ট্রেনিং অব ট্রেইনার্স’ (টিওটি) কোর্স শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে ৩৩২ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে এ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা পরবর্তী সময়ে মাঠপর্যায়ের তদন্তকারীদের প্রশিক্ষণ দেবেন। পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির বিশেষায়িত এই প্রশিক্ষণ কোর্সের উদ্বোধন করেন।
বিজ্ঞাপন
ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মো. আকতার হোসেন বলেন, “সাইবার অপরাধ দমনে পুলিশ দায়িত্বশীলতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে। অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে পুলিশ সচেষ্ট রয়েছে।”
তিনি জানান, সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় ডিএমপির গোয়েন্দা শাখায় একটি সাইবার ল্যাব রয়েছে। এ ছাড়া কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমে (সিটিটিসি) একটি ফরেনসিক ল্যাব চালুর অনুমোদন হয়েছে। ডিজিটাল মামলা তদন্তে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের দ্রুত প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগও রয়েছে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত সাইবার অপরাধের ঘটনায় রমনা বিভাগে ৮৮টি মামলা হয়েছে এবং ১৬৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। লালবাগ বিভাগে ২২টি মামলায় ২৩ জন, ওয়ারী বিভাগে ১২টি মামলায় ২৪ জন, মতিঝিল বিভাগে ৩৩টি মামলায় ৪৯ জন, তেজগাঁও বিভাগে ৫৩টি মামলায় ৪৯ জন, মিরপুর বিভাগে ৩৩টি মামলায় ২৭ জন, গুলশান বিভাগে ৩৮টি মামলায় ৩৭ জন এবং উত্তরা বিভাগে ২৬টি মামলায় ৩৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
মাঠপর্যায়ে সাধারণ মানুষকে অনলাইন ব্ল্যাকমেইল, ভুয়া লিংক ও আর্থিক প্রতারণা সম্পর্কে সতর্ক করতে কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মাধ্যমেও সচেতনতামূলক প্রচার চালানো হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
বিজ্ঞাপন
পুলিশের তথ্যমতে, দেশে সাইবার অপরাধের প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। হ্যাকিং, আর্থিক প্রতারণার পাশাপাশি নারী ও শিশুদের লক্ষ্য করে সংঘটিত অপরাধও উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মেসেজিং অ্যাপে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে ভয়েস ও ভিডিও ক্লোনিংয়ের মাধ্যমে পরিচিত ব্যক্তির পরিচয় নকল করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার নতুন ধরনের অপরাধচক্রও সক্রিয় রয়েছে।
পুলিশের মতে, চুরি বা প্রচলিত অপরাধের তুলনায় সাইবার ক্রাইম ও ডিজিটাল জালিয়াতির বিস্তার দ্রুত বাড়ছে। এ ধরনের অপরাধ থেকে সুরক্ষিত থাকতে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রযুক্তিগত সচেতনতা বাড়ানোকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিজ্ঞাপন
তথ্য সূত্র: বাসস








