সমতার বিশ্ব গড়তে অতিধনীদের ওপর কর বাড়ানোর আহ্বান

বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান সম্পদ বৈষম্য ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রেক্ষাপটে অতিধনীদের ওপর কর বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রায় ৪০০ জন মিলিয়নিয়ার ও বিলিয়নিয়ার। ২৪টি দেশের এসব বিত্তশালী ব্যক্তি মনে করছেন, ধনীদের হাতে অস্বাভাবিকভাবে সম্পদ কেন্দ্রীভূত হওয়ায় সামাজিক ন্যায়বিচার ও গণতন্ত্র মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
বিজ্ঞাপন
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) বার্ষিক সম্মেলন উপলক্ষে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে প্রকাশিত এক খোলা চিঠিতে তারা বিশ্বনেতাদের প্রতি এই আহ্বান জানান। চিঠিতে বলা হয়, বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষ ১ শতাংশ ধনীর হাতে যে পরিমাণ সম্পদ জমা হয়েছে, তা বিশ্বের বাকি ৯৫ শতাংশ মানুষের সম্মিলিত সম্পদের চেয়েও বেশি।
চিঠিতে স্বাক্ষরকারীরা সতর্ক করে বলেন, ধনী ও সাধারণ মানুষের মধ্যকার ব্যবধান প্রতিদিনই বাড়ছে। এই বৈষম্য শুধু ব্যক্তি পর্যায়ে নয়, পাড়া-মহল্লা, রাষ্ট্র এমনকি প্রজন্মের মধ্যেও গভীর ফাটল সৃষ্টি করছে। তাদের ভাষায়, কয়েকজন বৈশ্বিক অলিগার্ক বিপুল সম্পদের জোরে গণতন্ত্রকে প্রভাবিত করছে, সরকার ও নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করছে এবং গণমাধ্যম ও প্রযুক্তির ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করছে। এর ফলে দারিদ্র্য, সামাজিক বঞ্চনা ও পরিবেশগত সংকট আরও তীব্র হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
চিঠিতে হলিউড অভিনেতা ও নির্মাতা মার্ক রাফালো, সংগীতশিল্পী ব্রায়ান ইনো এবং চলচ্চিত্র প্রযোজক ও মানবাধিকারকর্মী অ্যাবিগেইল ডিজনিসহ বেশ কয়েকজন পরিচিত মুখ স্বাক্ষর করেছেন। তারা বলেন, অতিরিক্ত সম্পদ শুধু বিশ্ব রাজনীতিকে কলুষিত করছে না, একই সঙ্গে জলবায়ু সংকট ও সামাজিক বৈষম্যকেও ভয়াবহ রূপ দিচ্ছে।
স্বাক্ষরকারীরা বলেন, “যখন আমাদের মতো কোটিপতিরাই স্বীকার করছি যে অতি সম্পদ অন্য সবার ন্যায্য অধিকার কেড়ে নিচ্ছে, তখন স্পষ্ট বোঝা যায় সমাজ কতটা বিপজ্জনক দিকে এগোচ্ছে।”
বিজ্ঞাপন
এদিকে ফোর্বসের তথ্য অনুযায়ী, পুনর্নির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে ধনী মন্ত্রিসভা গঠন করেন। গত আগস্ট পর্যন্ত ওই মন্ত্রিসভার সদস্যদের সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ ছিল আনুমানিক ৭৫০ কোটি ডলার।
‘প্যাট্রিয়টিক মিলিয়নিয়ার্স’ নামের একটি সংগঠনের পক্ষে পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, জি-২০ দেশগুলোর ৭৭ শতাংশ কোটিপতি মনে করেন—অতিধনীরা বৈশ্বিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে অস্বাভাবিক প্রভাব ফেলছেন। এই জরিপে অংশ নেন জি-২০ দেশগুলোর প্রায় ৩ হাজার ৯০০ জন ব্যক্তি, যাদের প্রত্যেকের সম্পদ এক মিলিয়ন ডলারের বেশি।
জরিপে আরও উঠে এসেছে, অংশগ্রহণকারীদের তিন-পঞ্চমাংশ মনে করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছেন। পাশাপাশি ৬০ শতাংশের বেশি কোটিপতির মতে, চরম সম্পদ বৈষম্য গণতন্ত্রের জন্য বড় হুমকি। দুই-তৃতীয়াংশ উত্তরদাতা অতিধনীদের ওপর বাড়তি কর আরোপ করে তা জনসেবায় ব্যয়ের পক্ষে মত দিলেও এর বিরোধিতা করেছেন মাত্র ১৭ শতাংশ।
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে উন্নয়ন সংস্থা অক্সফামের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, গত বছর রেকর্ডসংখ্যক নতুন বিলিয়নিয়ার তৈরি হয়েছে। এর ফলে বিশ্বে বিলিয়নিয়ারের সংখ্যা প্রথমবারের মতো ৩ হাজার ছাড়িয়েছে।
অক্সফাম ইন্টারন্যাশনালের নির্বাহী পরিচালক অমিতাভ বেহার বলেন, “গত বছর বিলিয়নিয়ারদের সম্পদ বৃদ্ধির হার ছিল নজিরবিহীন। বিশ্বের শীর্ষ ১ শতাংশ মানুষের হাতে এখন বৈশ্বিক সরকারি সম্পদের প্রায় তিন গুণ সম্পদ জমা হয়েছে।”
বিজ্ঞাপন
এই পরিস্থিতি অলিগার্কদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের ব্যবধানকে ভয়াবহভাবে স্পষ্ট করে তুলেছে। বৈষম্য কমাতে এখনই অতিধনীদের ওপর কার্যকর কর আরোপকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে বলে তিনি মনে করেন।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান








