ইরানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধে কতদিন টিকবে ইসরায়েল?

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ নেতারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক সংঘাত আরও কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প–এর নেতৃত্বাধীন যুক্তরাষ্ট্র বলছে, দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ তাদের জন্য বড় কোনো চ্যালেঞ্জ নয়; কারণ তাদের সামরিক সক্ষমতা দীর্ঘ সময় ধরে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মতো শক্তিশালী।
বিজ্ঞাপন
তবে ইসরায়েলের বাস্তবতা ভিন্ন। গাজায় সামরিক অভিযান পরিচালনার বিপুল ব্যয়, লেবানন ও সিরিয়ায় সংঘাত, এবং ইরানের সঙ্গে আগের দফার উত্তেজনা—সব মিলিয়ে দেশটি আগে থেকেই চাপে রয়েছে। ফলে নতুন করে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ শুরু হলে সেটি অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে।
শনিবার গত (২৮ ফেব্রুয়ারি) ইরানে হামলার পর থেকে ইসরায়েল টানা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে পড়ছে। দেশজুড়ে একের পর এক সতর্কতা সাইরেন বাজছে, বহু এলাকায় শিক্ষা কার্যক্রম স্থগিত রাখা হয়েছে এবং বিপুলসংখ্যক রিজার্ভ সেনাকে পুনরায় ডেকে নেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
হাইফা ও তেল আবিব–এর মতো বড় শহরগুলো ধারাবাহিক হামলার শিকার হচ্ছে। জরুরি সেবা ব্যবস্থাতেও চাপ দেখা দিয়েছে। যে জনগোষ্ঠী এতদিন অন্যদের ওপর বড় আকারের সামরিক অভিযান চাপিয়ে দিতে অভ্যস্ত ছিল, তারা এখন নিজের ভূখণ্ডে একই মাত্রার হামলার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি। ফলে বহু মানুষকে নিয়মিত বাঙ্কারে আশ্রয় নিতে হচ্ছে।
তবে আপাতত ইসরায়েলের ভেতরে যুদ্ধ-উচ্ছ্বাস প্রবল। অধিকাংশ বড় শহরের ইসরায়েলিদের সঙ্গে কথা বললে বোঝা যায়, দীর্ঘদিন ধরে যাদের সম্পর্কে বলা হয়েছিল, ইরান ইসরায়েলকে ধ্বংস করতে চায়- তাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একটি তীব্র আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বামপন্থি অল্প কয়েকজন ছাড়া সব রাজনৈতিক দলই সরকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
ইসরায়েলি রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ শির হেভার মনে করেন, যুদ্ধ শুরু হতেই দেশে সামরিকতাবাদী আবেগ ছড়িয়ে পড়েছে। তার ভাষ্য, এটি ২০২৫ সালের জুনের ১২ দিনের যুদ্ধের মতো নয়। তখন ইরান ইসরায়েলকে ধ্বংস করতে পারে—এমন আশঙ্কা ছিল প্রবল। এখন পরিস্থিতি উল্টো—অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস ও সামরিক উদ্দীপনা স্পষ্ট। এমনকি সমালোচকরাও বলছেন, যুদ্ধ ‘সংক্ষিপ্ত’ রাখতে হবে, যাতে সময়সীমা ইসরায়েলই নির্ধারণ করতে পারে।
বিজ্ঞাপন
এদিকে,অনেকে যুদ্ধে সমর্থনকে ইসরায়েলি সমাজের ‘উগ্রবাদের’ অংশ হিসেবে দেখছেন। আগে যেসব অতিডানপন্থি রাজনীতিক প্রান্তিক ছিলেন, তারা এখন সরকারে কেন্দ্রীয় জায়গা দখল করেছেন। রাজনৈতিক মেরুকরণ ও অর্থনৈতিক চাপ তরুণদের দেশ ছাড়ার প্রবণতা বাড়িয়ে তুলছে।
যারা দেশে রয়েছেন, তারা বহু বছর ধরেই ‘ইরান হলো মূল শত্রু’ এই ভাবনায় শাসিত। আরও কয়েক সপ্তাহের যুদ্ধ এ সমাজকে আরও বেশি সামরিক মনোভাবাপন্ন করে তুলতে পারে।
তেল-আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ড্যানিয়েল বার-তাল বলেন, এটি অনেকটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাজ্যের ব্লিটজের মতো। তখন ব্রিটিশরা নিজেদের ‘চূড়ান্ত অশুভর’ বিরুদ্ধে যুদ্ধরত মনে করে বোমাবর্ষণ সহ্য করেছিল। ইসরায়েলিরাও ঠিক সেই অনুভূতিতেই আছে। ছোটবেলা থেকেই আমাদের শেখানো হয়- ইরান অশুভ। কিন্ডারগার্টেন থেকে শুরু করে হাইস্কুল, সেনাবাহিনী, সব জায়গাতেই এই বার্তা দৃঢ়ভাবে শেখানো হয়।
বিজ্ঞাপন
বার-তাল আরও বলেন, সপ্তাহব্যাপী যুদ্ধ শেষে ইসরায়েলি সমাজ কেমন হবে, তা অনুমান করা কঠিন। কারণ দেশটির ‘নৈতিক ন্যায্যতাতে’ আস্থা কোনোদিনই কমেনি। ১৯৪৮ সালের নাকবার গণহত্যা কিংবা সাম্প্রতিক গাজা গণহত্যার সময়ও নয়।
তার ভাষায়, এখন নতুন এক প্রজন্ম তৈরি হয়েছে, যারা আরও সামরিকতাবাদী ও আরও বেশি ডানপন্থি। নেতানিয়াহু বলছেন, আমাদের ‘তলোয়ার হাতে’ বাঁচতে হবে। এসবই প্রমাণ করে, ইসরায়েলের টিকে থাকতে শত্রুর প্রয়োজন।
সামরিক হিসাব-নিকাশ
বিজ্ঞাপন
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সামরিক সক্ষমতা বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক হামজা আত্তার বলেন, ইরানের মতো শক্তিধর দেশের বিরুদ্ধে বর্তমান মাত্রার যুদ্ধ কতদিন ধরে রাখা সম্ভব, তা নির্ভর করছে মিত্রদের সহায়তা ও দুই পক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার স্থায়িত্বের ওপর।
তিনি আল-জাজিরাকে বলেন, যুদ্ধের প্রথম তিন দিনে ইরান ইসরায়েলের দিকে ২০০টিরও বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। তুলনা হিসাবে বললে, ১২ দিনের যুদ্ধে তারা মোট ৫০০ ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়েছিল। প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে ইসরায়েলকেও একটি প্রতিরক্ষা রকেট ছুড়তে হয়। এটি ইসরায়েলের সামর্থ্যের চেয়েও বেশি। যুক্তরাষ্ট্র সাহায্য না করলে এখন পর্যন্ত ইসরায়েল আকাশসীমার নিয়ন্ত্রণ হারাতো।
ইসরায়েলের তিন ধরনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে, আয়রন ডোম (স্বল্প-পাল্লার রকেট প্রতিহত করতে), ডেভিড’স স্লিং (মাঝারি-পাল্লার রকেট ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধে), অ্যারো ২ ও অ্যারো ৩ (ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধে)।
বিজ্ঞাপন
ইসরায়েল কখনোই জানায় না তাদের কাছে কত সংখ্যক ইন্টারসেপ্টরের মজুত আছে। তবে ১২ দিনের যুদ্ধে দেশটি ইন্টারসেপ্টর স্বল্পতায় পড়েছিল। এর মানে, দীর্ঘ যুদ্ধ হলে একই মাত্রার প্রতিরক্ষা বজায় রাখা কঠিন হয়ে যাবে। তখন ইসরায়েলকে ইন্টারসেপ্টর রেশনিং করতে হবে, সামরিক ও রাজনৈতিক স্থাপনা রক্ষায় অগ্রাধিকার দিতে হবে। এতে বেসামরিক হতাহতের ঝুঁকি বাড়বে।
ইসরায়েলি ও মার্কিন সূত্রের বরাত দিয়ে আত্তার বলেন, ইরান ২০২৫ সালের জুনের যুদ্ধের পর থেকে প্রতি মাসে প্রায় ১০০ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন করছে। অর্থাৎ তেহরানের বড় ধরনের মজুত এরই মধ্যে তৈরি হয়ে গেছে।
তবে আত্তার মনে করেন, ইরানের সামর্থ্য শুধু ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না। তিনি বলেন, কী ধরনের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের কাছে আছে, তা আমরা জানি না। দীর্ঘ-পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র গ্রিস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, মাঝারি-পাল্লারগুলো ইসরায়েলকে আঘাত করতে পারে, আর স্বল্প-পাল্লারগুলো উপসাগরীয় দেশগুলো লক্ষ্য করতে পারে।
বিজ্ঞাপন
তিনি আরও বলেন, ১২ দিনের যুদ্ধের আগে ইরানের কাছে কত ক্ষেপণাস্ত্র ছিল কতটা ধ্বংস হয়েছে, তাদের কতটি লঞ্চার আছে এসবও অজানা। লঞ্চার না থাকলে হাজার ক্ষেপণাস্ত্র থাকলেও তা কাজে লাগে না। এটি অনেকটা রাইফেল ছাড়া গুলি থাকার মতো।
ইসরায়েলের অর্থনৈতিক টানাপড়েন চরমে
বিজ্ঞাপন
প্রায় দুই বছরের টানা যুদ্ধে ইসরায়েলের অর্থনীতি নাজুক হয়ে পড়েছে। গোলাবারুদের ব্যয় বেড়েছে, লাখ লাখ রিজার্ভ সদস্যকে দীর্ঘ সময় ধরে মোতায়েন রাখতে হচ্ছে, যা পরিকল্পনার তুলনায় অনেক বেশি।
২০২৪ সালে লেবানন ও গাজার যুদ্ধে ইসরায়েলের ব্যয় দাঁড়ায় ৩১ বিলিয়ন বা ৩১ হাজার ডলার, যা গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ঘাটতি তৈরি করে। ২০২৫ সালের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী এ ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৫৫ বিলিয়ন বা ৫৫ হাজার ডলার।
অর্থনীতির ওপর চাপের কারণে ২০২৪ সালে বিশ্বের তিন প্রধান ক্রেডিট রেটিং সংস্থা ইসরায়েলের সার্বভৌম রেটিং কমিয়ে দেয়। শির হেভার বলেন, ইসরায়েল এখন ঋণ সংকট, জ্বালানি সংকট, পরিবহন সংকট, স্বাস্থ্যসেবা সংকট- সবকিছু মিলিয়ে জর্জরিত।
বিজ্ঞাপন
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, অর্থনৈতিক সংকট যুদ্ধ থামানোর কারণ নয়, এটি অর্থনীতির নয়, প্রযুক্তির প্রশ্ন।
তবে তার সতর্কবার্তা—অর্থনৈতিক দুরবস্থা যুদ্ধ থামানোর নিশ্চয়তা নয়। যদি যুক্তরাষ্ট্র উন্নত প্রযুক্তির এমন অস্ত্র সরবরাহ করে, যা দূর থেকে লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে সক্ষম এবং সেনাদের ঝুঁকি কমায়, তাহলে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকটও ইসরায়েলের সামরিক নীতিকে থামাতে পারবে না।
সূত্র: আল-জাজিরা








