ইরানকে চাপে ফেলতে ট্রাম্পের পরবর্তী চাল কি স্থল অভিযান?

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলা শুরুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, এই যুদ্ধের মাধ্যমে তিনি মূলত ‘ইরানের জনগণের স্বাধীনতা’ নিশ্চিত করতে চান। তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্ভবত তেহরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করা বা ভেঙে দেওয়া।
বিজ্ঞাপন
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংকট্যাংক স্টিমসন সেন্টারের জ্যেষ্ঠ গবেষক কেলি গ্রিকো বলেন, এত বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন কেবল আকাশপথে হামলা চালিয়ে অর্জন করা বাস্তবে প্রায় অসম্ভব। তার মতে, কোনো দেশে শাসন পরিবর্তন ঘটাতে হলে সাধারণত বড় ধরনের মূল্য দিতে হয় এবং দীর্ঘমেয়াদি সামরিক ও রাজনৈতিক পদক্ষেপ নিতে হয়।
গ্রিকোর ভাষায়, ‘শাসন পরিবর্তনের জন্য নির্দিষ্ট কিছু মূল্য দিতে হয়। কিন্তু মনে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র সেই মূল্য দিতে প্রস্তুত নয়। তাই হয়তো এই অভিযানের পেছনে বিকল্প বা গৌণ কোনো লক্ষ্যও থাকতে পারে।’
বিজ্ঞাপন
প্রথম দফার হামলার পর ট্রাম্প ইরানের জনগণের উদ্দেশে এক বার্তায় বলেন, তাদের ‘স্বাধীনতার মুহূর্ত’ এসে গেছে। তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের অভিযান শেষ হলে ইরানের জনগণ নিজেরাই নিজেদের সরকার গঠন করার সুযোগ পাবে।
তবে সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ম্যাথিউ ডাস বলেন, শুধু বিমান হামলার মাধ্যমে কোনো দেশের শাসনব্যবস্থা পতন ঘটানোর উদাহরণ খুব কম।
তিনি বলেন, ‘আপনি ভবন ধ্বংস করতে পারেন, অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারেন, কিন্তু শুধু আকাশপথের হামলায় শাসন পরিবর্তনের নজির নেই।’
বিজ্ঞাপন
২০১১ সালে লিবিয়ায় ন্যাটো নেতৃত্বাধীন বিমান হামলা মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সহায়তা করেছিল। তবে সেখানে মাটিতে লড়াই চালিয়েছিল লিবীয় বিদ্রোহীরা।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে ইরানের ভেতরে এমন কোনো শক্তিশালী সংগঠিত বাহিনী নেই, যারা ইসলামী প্রজাতন্ত্রের শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে মাটিতে বড় ধরনের অভিযান চালাতে পারে।
স্থল অভিযানের আশঙ্কা
বিজ্ঞাপন
যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে স্থলবাহিনী ব্যবহারের সম্ভাবনাও পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। যদিও যুক্তরাষ্ট্র এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এমন কোনো সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেনি। তবে স্থল অভিযান শুরু হলে মার্কিন সেনাদের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে এবং এটি ট্রাম্প প্রশাসনের দ্রুত ও সীমিত সামরিক অভিযানের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
ম্যাথিউ ডাস বলেন, ইরানে কোনো মার্কিন সেনা না পাঠানো হলেও এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে এখনো খুব বেশি জনপ্রিয় নয়।
রয়টার্সের এক জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে মাত্র প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষ এই যুদ্ধকে সমর্থন করে। ডাস জানান, ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের সময় যুক্তরাষ্ট্রে জনসমর্থন ছিল ৫৫ শতাংশেরও বেশি।
বিজ্ঞাপন
এদিকে ডেমোক্র্যাট সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক গোপন ব্রিফিংয়ের পর আশঙ্কা প্রকাশ করেন, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো ইরানে স্থল অভিযান চালানোর দিকে এগোচ্ছে।
তার কথায়, ‘এই ব্রিফিংয়ের পর আমি আগের চেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন যে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের হয়তো মাটিতে নামতে হতে পারে।’
অন্যান্য সম্ভাব্য লক্ষ্য
বিজ্ঞাপন
তবে ট্রাম্প প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা শাসন পরিবর্তনের বদলে তুলনামূলক সীমিত লক্ষ্য সামনে রাখার কথাও বলছেন। তাদের মতে, মূল উদ্দেশ্য হলো ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করে দেওয়া।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানিয়েছেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং নৌবাহিনীর শক্তি কমিয়ে দেওয়াই এই অভিযানের প্রধান লক্ষ্য।
রুবিওর দাবি, ইরান বড় ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভাণ্ডার তৈরি করে এমন এক প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলছিল, যা ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথকে নিরাপদ করে দিতো।
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে হেগসেথ বলেছেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের এই বোমা হামলা ‘অন্তহীন যুদ্ধে’ পরিণত হবে না।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের লক্ষ্য ও কৌশল এখনো স্পষ্ট নয়।
কেলি গ্রিকো বলেন, ‘আসলে এই যুদ্ধের উদ্দেশ্য কী? আমরা কী অর্জন করতে চাই? প্রশাসন এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো বার্তা দিতে পারেনি।’
বিজ্ঞাপন
ডেমোক্র্যাট সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেনও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসনের ইরান নিয়ে কোনো স্পষ্ট পরিকল্পনা নেই। এই যুদ্ধ মিথ্যার ওপর ভিত্তি করে শুরু হয়েছে এবং এর শেষ কোথায়—সেটিও পরিষ্কার নয়।’
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় ব্যাপক বোমা হামলা চালায়। এতে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা এবং কয়েকশ বেসামরিক মানুষ নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়।
বিজ্ঞাপন
এর পর থেকেই সংঘাত দ্রুত মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনাগুলোর দিকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। একই সঙ্গে ইসরায়েলের দিকেও একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়।
এদিকে ইরানপন্থি ইরাকি গোষ্ঠীগুলোও মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে ড্রোন হামলার দাবি করেছে। পাশাপাশি লেবাননের হিজবুল্লাহও এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
যুদ্ধ কতদিন চলতে পারে, সে বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান এখনো পরিষ্কার নয়। ট্রাম্প একদিকে বলেছেন, নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনে যুক্তরাষ্ট্র সময়সূচির চেয়েও এগিয়ে রয়েছে। আবার অন্যদিকে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, এই সংঘাত চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ বা তারও বেশি সময় ধরে চলতে পারে।
বিজ্ঞাপন
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের প্রকৃত লক্ষ্য ও সময়সীমা স্পষ্ট না হওয়ায় বর্তমান পরিস্থিতি কোন দিকে এগোচ্ছে তা নির্ভুলভাবে মূল্যায়ন করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
সূত্র: আল-জাজিরা








