ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে নিহত বেড়ে ৩৮৮৯, আহত ১৬ হাজার ছাড়াল

ভেনেজুয়েলায় গত ২৪ জুন স্থানীয় সময় ভোর ৬টা ৪ মিনিটে মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। ৭ দশমিক ২ এবং ৭ দশমিক ৫ মাত্রার এ দুই ভূমিকম্পে দেশটিতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৩ হাজার ৮৮৯ জনে দাঁড়িয়েছে। আহত হয়েছেন ১৬ হাজারেরও বেশি মানুষ। গত ১২৬ বছরের মধ্যে এটিই দেশটির অন্যতম ভয়াবহ ভূমিকম্প বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
দেশটির যোগাযোগ ও তথ্য মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, দুর্যোগের পর ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য এখন পর্যন্ত ৯ হাজার ৫৮৫ মেট্রিক টন খাদ্য এবং ৬ লাখ ৬৯ হাজার ৮ লিটার বিশুদ্ধ পানি বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া ২৩ হাজার ৮২০ জন চিকিৎসাসেবা পেয়েছেন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ৭৯টি অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) জানিয়েছে, এই ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৬ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। এ অবস্থায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে সহায়তা দিতে যুক্তরাষ্ট্র ৯০০ সামরিক সদস্য মোতায়েন করেছে। মানবিক সহায়তাবাহী বিমান চলাচল নিশ্চিত করতে কারাকাসের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ক্ষতিগ্রস্ত রানওয়ে মেরামত করেছে মার্কিন বাহিনী। পাশাপাশি উপকূলীয় এলাকায় নৌবাহিনীর জাহাজ মোতায়েন এবং মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের আরও ১০০ সদস্যকে সহায়তা কার্যক্রমে যুক্ত করা হয়েছে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
ভেনেজুয়েলার দুর্যোগ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ৬ হাজার ৪৬২ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। পাশাপাশি ৮৬ হাজার ১১৭টি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। ভূমিকম্পে মোট ৮৮৬টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে ১৯০টি সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে ৩ হাজার ৩০০-এর বেশি আন্তর্জাতিক উদ্ধারকর্মী অংশ নিয়েছেন। এছাড়া রাজধানী কারাকাস থেকে প্রায় ৩০ হাজার কর্মী দুর্গত এলাকায় পাঠানো হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এই দুর্যোগে বাস্তুচ্যুত হাজারো মানুষ বিশুদ্ধ পানির সংকটে ভুগছেন। অনেকেই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে আশ্রয়কেন্দ্র বা খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছেন। সহায়তা সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে, অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতির কারণে দুর্গত এলাকায় সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বেড়েছে।
বিজ্ঞাপন
নাসার স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে ধারণা করা হয়েছে, প্রায় ৫৮ হাজার ৮৭০টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে থাকতে পারে, যা সরকারের প্রকাশিত হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি।
মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলোর মতে, ভূমিকম্প-পরবর্তী পরিস্থিতি দ্রুত একটি বড় স্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিচ্ছে। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে আগামী দিন ও সপ্তাহগুলোতে প্রাণহানি আরও বাড়তে পারে। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট, স্বাস্থ্য খাতে সীমিত বিনিয়োগ এবং চিকিৎসকদের দেশত্যাগের কারণে ভেনেজুয়েলার স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতাও এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে।
কারাকাসের হাসপাতাল দেল ওয়েস্তে ড. হোসে গ্রেগরিও হার্নান্দেজের ট্রমা ইউনিটের প্রধান ইউজেনিও কোভা বলেন, বর্তমানে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ সংক্রমণ। দীর্ঘ সময় ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকা আহতদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে।
বিজ্ঞাপন
লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের জন্য জাতিসংঘের মানবিক সংস্থার মুখপাত্র ভেরোনিক দুরো বলেন, তীব্র গরমের কারণে মশাবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি ধ্বংসস্তূপ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে ট্রাম্প প্রশাসন জাতিসংঘ ও বিভিন্ন ত্রাণ সংস্থার মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার জন্য ৩০০ মিলিয়ন ডলার সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে। তবে ইউএনডিপির মূল্যায়ন অনুযায়ী, ক্ষয়ক্ষতির তুলনায় এই সহায়তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।
ইতোমধ্যে ইকুয়েডর, ইসরায়েলসহ বিভিন্ন দেশের অন্তত ৫০টি আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দল ভেনেজুয়েলায় পৌঁছেছে। কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকা কয়েকটি দেশের উদ্ধারকারীরাও এ অভিযানে অংশ নিয়েছেন।
বিজ্ঞাপন
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ইয়ারাকুই অঙ্গরাজ্যের ইউমারে শহরের দক্ষিণ-পূর্বে প্রায় ২৩ কিলোমিটার দূরে। আর ৭ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পটি আঘাত হানে একই অঙ্গরাজ্যের সান ফেলিপের উত্তর-পূর্বে প্রায় ২৩ দশমিক ৯ কিলোমিটার দূরে। এখন পর্যন্ত ৮৯০টি পরাঘাত (আফটারশক) রেকর্ড করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে দেশটির যোগাযোগ ও তথ্য মন্ত্রণালয়।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
উল্লেখ্য, ১৯০০ সালের সান নারসিসো ভূমিকম্প ভেনেজুয়েলার ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী ভূমিকম্প হিসেবে বিবেচিত হয়। ৭ দশমিক ৬ থেকে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ওই ভূমিকম্পে দেশটির উত্তর উপকূলজুড়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটে এবং রাজধানী কারাকাস সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি ছিল।
বিজ্ঞাপন
সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, ইউএসজিএস








