ইরান যুদ্ধে ফুরিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুত

ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ সমরাস্ত্রের মজুত উদ্বেগজনকভাবে কমে এসেছে বলে জানিয়েছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত শুক্রবার (১০ জুলাই) দুই দেশের মধ্যকার যুদ্ধবিরতি ‘শেষ’ ঘোষণা করার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট ভবিষ্যতে চীন বা উত্তর কোরিয়ার মতো দেশের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতে মার্কিন সামরিক সক্ষমতার ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
বিজ্ঞাপন
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস)–এর প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও অবসরপ্রাপ্ত মেরিন কর্নেল মার্ক কানসিয়ান বলেন, বর্তমান গতিতে যুদ্ধ চলতে থাকলে অস্ত্রের মজুত আরও দ্রুত কমে যাবে। এতে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নতুন নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধের প্রথম ধাপে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে কয়েক হাজার দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে।
সিএসআইএসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, গত এপ্রিল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র তাদের অন্তত অর্ধেক ‘থাড’ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা, প্রায় অর্ধেক ‘প্যাট্রিয়ট’ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং প্রায় ৩০ শতাংশ ‘টমাহক’ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ফেলেছে। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশন–এর পররাষ্ট্রনীতি গবেষক মাইকেল ও’হ্যানলনের ভাষ্য, অস্ত্রের মজুত প্রত্যাশার তুলনায় অনেক বেশি কমে গেছে।
বিজ্ঞাপন
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘাটতি দ্রুত পূরণ করা পেন্টাগনের জন্য সহজ হবে না। মার্ক কানসিয়ান জানান, বর্তমানে প্রতি মাসে পেন্টাগন গড়ে মাত্র ১৫টি টমাহক এবং ২০টি নতুন প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র পাচ্ছে। আর ২০২৬ সালে নতুন কোনো থাড ক্ষেপণাস্ত্র হাতে পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
সিএসআইএসের মূল্যায়ন অনুযায়ী, যুদ্ধের আগের অবস্থায় অস্ত্রের মজুত ফিরিয়ে আনতে অন্তত তিন বছর বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে। সাবেক পেন্টাগন কর্মকর্তা এলেন ম্যাককাসকারও বলেন, অধিকাংশ সমরাস্ত্রের মজুত স্বাভাবিক পর্যায়ে আনতে দুই থেকে পাঁচ বছর সময় প্রয়োজন হবে।
প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয় বিশেষজ্ঞ জন ফেরারি বলেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এখন পর্যন্ত ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্রের পরিবর্তে নতুন অস্ত্র সংগ্রহে কংগ্রেস থেকে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। ফলে উৎপাদন এখনো স্বাভাবিক গতিতেই চলছে।
বিজ্ঞাপন
এদিকে, ইরান যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের জন্য হোয়াইট হাউস কংগ্রেসের কাছে আবেদন করেছে। তবে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই প্রস্তাব অনুমোদন পাওয়া কঠিন হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পেন্টাগনের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রতিরক্ষা শিল্প সম্প্রসারণে সরকার কাজ করছে। গত জুনে ট্রাম্প ‘ডিফেন্স প্রোডাকশন অ্যাক্ট’ প্রস্তাব করেন, যাতে প্রশাসনিক জটিলতা কমিয়ে দ্রুত ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন সম্ভব হয়। তবে মার্ক কানসিয়ানের মতে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলেও এর প্রভাব সীমিত থাকবে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
বিশ্বব্যাপী সমরাস্ত্রের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের লাইসেন্স অন্যান্য দেশকে দেওয়া হলে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ কিছুটা কমতে পারে। তুরস্কে ন্যাটো সম্মেলনের ফাঁকে গত বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) ট্রাম্প ইউক্রেনকে এমন লাইসেন্স দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানান। তবে এই উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে দীর্ঘ সময় লাগে। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়, জাপানে একটি প্যাট্রিয়ট কারখানা নির্মাণে তিন বছর লেগেছে, আর জার্মানি ২০২২ সালে কাজ শুরু করলেও এখনো উৎপাদন শুরু করতে পারেনি।
বিজ্ঞাপন
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, চীন বা উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাত দেখা দিলে ক্ষেপণাস্ত্রের এই ঘাটতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে উত্তর কোরিয়ার হামলা প্রতিহত করা এবং পাল্টা জবাব দিতে বিপুল পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র প্রয়োজন হবে।
তবে পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পার্নেল এক বিবৃতিতে বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী এখনো যুক্তরাষ্ট্রের। প্রেসিডেন্টের নির্দেশে যেকোনো সময়, যেকোনো স্থানে অভিযান পরিচালনার মতো প্রয়োজনীয় সক্ষমতা এবং পর্যাপ্ত অস্ত্রভাণ্ডার তাদের রয়েছে।
অন্যদিকে মাইকেল ও’হ্যানলনের মতে, বর্তমানে চীন ও উত্তর কোরিয়াকে মোকাবিলার সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, একসময় এই সক্ষমতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, আর সেই সীমা কোথায়—তা আগেভাগে নির্ধারণ করা কঠিন।








