Logo

পুরুষদের যৌনাঙ্গ বড় করার চিকিৎসার প্রবণতা বাড়ছে, ঝুঁকি কতটা?

profile picture
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১৬ আগস্ট, ২০২৬, ১৮:৪৩
পুরুষদের যৌনাঙ্গ বড় করার চিকিৎসার প্রবণতা বাড়ছে, ঝুঁকি কতটা?
ছবি: সংগৃহীত

পুরুষদের মধ্যে যৌনাঙ্গের আকার কিংবা পুরুত্ব বাড়াতে ফিলার ব্যবহারের প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে হায়ালুরোনিক অ্যাসিড ফিলার ব্যবহার করে পেনিসের পুরুত্ব বাড়ানোর পদ্ধতি কিছু ক্লিনিকে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। তবে চিকিৎসকদের সতর্কতা, দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা ও তথ্যের ঘাটতি এবং গুরুতর জটিলতার আশঙ্কা থাকায় এই চিকিৎসাপদ্ধতি নিয়ে উদ্বেগও তৈরি হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

ম্যানচেস্টারের জেসন নামের এক ব্যক্তি এমন ফিলার চিকিৎসা নিয়েছেন। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে তিনি জানান, এই চিকিৎসার পর তার পেনিসের পুরুত্ব প্রায় ১৬ শতাংশ বেড়েছে। জেসনের দাবি, শারীরিক এই পরিবর্তনের কারণে তার আত্মবিশ্বাসও আগের তুলনায় বেড়েছে।

তবে তিনি এমন মাত্রাতিরিক্ত ফিলার নেওয়ার পক্ষে ছিলেন না, যেটিকে অনেকে মজা করে ‘কোকাকোলার ক্যান’ বলে থাকেন। অতিরিক্ত ফিলার ব্যবহারের কারণে যৌনাঙ্গ অস্বাভাবিকভাবে মোটা হয়ে গেলে এমন নাম দেওয়া হয়।

জেসন বলেন, পেনিসের দৈর্ঘ্য নিয়ে তার কোনো অসন্তুষ্টি ছিল না। তার মূল উদ্দেশ্য ছিল পুরুত্ব কিছুটা বাড়ানো এবং যৌনাঙ্গের আকৃতিতে আরও ভারসাম্য আনা। প্রায় এক বছর ধরে বিভিন্ন ধরনের পদ্ধতি নিয়ে চিন্তাভাবনা করার পর অস্ত্রোপচারের পরিবর্তে তিনি হায়ালুরোনিক অ্যাসিড ফিলার নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

এই ধরনের ফিলার স্থায়ী নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি শরীরে শোষিত হয়ে যায়। ফলে চিকিৎসার পর কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়া গেলে পরিবর্তনটি স্থায়ী হয়ে থাকবে না—এই বিষয়টিও জেসনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছে।

কেন বাড়ছে আগ্রহ?

বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরুষদের সৌন্দর্য, শরীরের গঠন এবং শারীরিক আকৃতি নিয়ে সামাজিক প্রত্যাশার পরিবর্তনও এই প্রবণতা বাড়ার অন্যতম কারণ।

বিজ্ঞাপন

জেসনের ভাষায়, বিষয়টি পুরুষত্ব দেখানোর প্রতিযোগিতা নয়। বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিজ্ঞাপন এবং নিখুঁত শরীরের ছবি মানুষের নিজের শরীর সম্পর্কে ধারণাকে প্রভাবিত করছে।

পেনিস বড় বা মোটা করার জন্য অস্ত্রোপচার ও অস্ত্রোপচারবিহীন—দুই ধরনের পদ্ধতিই রয়েছে। এর মধ্যে হায়ালুরোনিক অ্যাসিড ফিলার সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। একই উপাদান ঠোঁটের ফিলারেও ব্যবহার করা হয়।

এই উপাদান শরীরে স্বাভাবিকভাবেই পাওয়া যায়। এটি পানি ধরে রাখে। ফলে ইনজেকশন দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট স্থানে কিছুটা ভলিউম তৈরি হয়।

বিজ্ঞাপন

গ্রেটার ম্যানচেস্টারের একটি ক্লিনিকে এ ধরনের চিকিৎসা দেন চিকিৎসক জাভেদ হুসেইন। তিনি জানান, তার কাছে বিভিন্ন বয়সের পুরুষ আসছেন। তাদের মধ্যে ২০-এর কোঠার পুরুষ যেমন রয়েছেন, তেমনি ৭২ বছর বয়সী রোগীও রয়েছেন।

তার মতে, চিকিৎসার আগে রোগীর স্বাস্থ্য, কেন তিনি এই পদ্ধতি নিতে চান এবং তার প্রত্যাশা—সবকিছু নিয়ে আলোচনা করা হয়।

সাধারণত যৌনাঙ্গের কয়েকটি অংশে হায়ালুরোনিক অ্যাসিড দেওয়া হয়। এরপর ফিলারটি সমানভাবে ছড়িয়ে দিতে ম্যাসাজ করা হয়। রোগীকেও পরে বাড়িতে নির্দিষ্টভাবে ম্যাসাজ করতে বলা হয়।

বিজ্ঞাপন

প্রক্রিয়াটির খরচ প্রায় ৩ হাজার ৫০০ পাউন্ড পর্যন্ত হতে পারে। এর মাধ্যমে সাধারণত ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত পুরুত্ব বাড়তে পারে। তবে এই ফলাফল স্থায়ী নয়। সাধারণত ছয় থেকে নয় মাস পর ফিলারের প্রভাব কমে আসে।

ঝুঁকিও কম নয়

চিকিৎসকদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা এখানেই। যৌনাঙ্গের পুরুত্ব বাড়ানোর জন্য ফিলার ব্যবহার করলেও এর সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও জটিলতার ঝুঁকি রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

ফিলার প্রয়োগের পর ব্যথা, ফোলা, কালশিটে দাগ কিংবা ফিলার অসমভাবে ছড়িয়ে পড়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও গুরুতর হয়ে সংক্রমণও হতে পারে।

এক রোগীর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল বলে জানান হুসেইন। অন্য জায়গা থেকে চিকিৎসা নেওয়ার পর ওই ব্যক্তির যৌনাঙ্গ কালো হতে শুরু করে। ভুল ধরনের ফিলার ব্যবহারের পাশাপাশি রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ত্বকও মারা যেতে শুরু করেছিল। পরে তাকে জরুরি চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

ম্যানচেস্টারের এনএইচএসের ইউরোলজিক্যাল সার্জন অধ্যাপক বৈভব মোদগিলও এমন রোগী দেখেছেন। তার ভাষায়, এসব জটিলতা দেখা দিলে রোগীর জন্য পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

কিছু ক্ষেত্রে ত্বকের একটি অংশ মারা যেতে পারে। ত্বক কালো হয়ে পরে খসে পড়তেও পারে। ফলে যে ব্যক্তি নিজের চেহারা বা আত্মবিশ্বাস বাড়াতে চিকিৎসা নিতে গিয়েছিলেন, তিনি আরও বেশি অসন্তুষ্ট হয়ে ফিরতে পারেন।

অস্ত্রোপচারেও ঝুঁকি

শুধু ফিলার ব্যবহারের ক্ষেত্রেই যে ঝুঁকি রয়েছে, তা নয়। যৌনাঙ্গের আকার বাড়ানোর অন্যান্য পদ্ধতিতেও বিভিন্ন ধরনের জটিলতার আশঙ্কা রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

অ্যালেক্স নামের এক ব্যক্তি জার্মানিতে পেনিস বড় করার জন্য অস্ত্রোপচার করিয়েছিলেন। তার ক্ষেত্রে পেনিসকে কিছুটা লম্বা দেখানোর উদ্দেশ্যে একটি লিগামেন্ট কেটে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে শরীরের অন্য একটি অংশ থেকে চর্বি সংগ্রহ করে যৌনাঙ্গে ইনজেকশনের মাধ্যমে প্রয়োগ করা হয়।

অস্ত্রোপচারের পর প্রচণ্ড ব্যথায় তার শারীরিক অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। পায়ে প্রচুর কালশিটে পড়ে এবং কয়েক দিন পর্যন্ত তিনি স্বাভাবিকভাবে হাঁটতেও পারেননি। পরে চিকিৎসা নেওয়ার পর ধীরে ধীরে তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন।

অ্যালেক্স বলেন, সমাজের প্রচলিত ধারণা এবং পর্নোগ্রাফির প্রভাবে একসময় তার মনে হয়েছিল, বড় পেনিসই পুরুষত্বের প্রতীক। পরে তিনি উপলব্ধি করেন, এই ধারণা তার নিজের শরীর সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।

চিকিৎসকদের সতর্কতা

পেনিস ফিলার বা অন্যান্য যৌনাঙ্গ বড় করার চিকিৎসা নিয়ে নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যানও নেই। কতজন পুরুষ এসব পদ্ধতি নিচ্ছেন, তার সরকারি কোনো হিসাব নেই।

তবে অনলাইন সার্চ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিজ্ঞাপনের প্রবণতা দেখে চিকিৎসকদের ধারণা, এ ধরনের চিকিৎসা বাড়ছে।

ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইউরোলজিক্যাল সার্জনস সম্প্রতি এসব পদ্ধতি নিয়ে সতর্ক করেছে। সংস্থাটি ৩৬টি গবেষণা পর্যালোচনা করেছে। এসব গবেষণায় প্রায় ৩ হাজার ৭৫০ জন পুরুষের তথ্য ছিল। তারপরও দীর্ঘমেয়াদে এসব চিকিৎসা কতটা নিরাপদ, সে বিষয়ে পরিষ্কার সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো দীর্ঘমেয়াদি তথ্যের অভাব। ফিলার যৌনাঙ্গে বছরের পর বছর কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, তা এখনো যথেষ্ট জানা যায়নি।

আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো—এই ধরনের ফিলার দেওয়ার জন্য সব জায়গায় চিকিৎসা প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক নয়। ফলে অনভিজ্ঞ ব্যক্তির হাতে চিকিৎসা নেওয়ার ঝুঁকি আরও বাড়ে।

অধ্যাপক মোদগিল সরাসরি নিষেধাজ্ঞাকে হয়তো অতিরিক্ত কঠোর মনে করেন। তবে তার মতে, এই চিকিৎসা চালু থাকলে পুরো খাতটিতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।

তিনি জাতীয় পর্যায়ে একটি রেজিস্ট্রি চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন। এতে কতজন পুরুষ এই চিকিৎসা নিচ্ছেন, কী ধরনের জটিলতা হচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদে এর ফল কী—এসব তথ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।

তবু জেসনের মতো কিছু পুরুষ ফলাফল নিয়ে সন্তুষ্ট। বর্তমান ফিলারের প্রভাব শেষ হয়ে গেলে তিনিও আবার চিকিৎসাটি নেওয়ার কথা ভাবছেন।

তবে বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা স্পষ্ট—শুধু আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর উদ্দেশ্যে যৌনাঙ্গের আকার বা পুরুত্ব পরিবর্তনের মতো চিকিৎসা নেওয়ার আগে সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে ভালোভাবে জানা প্রয়োজন। একই সঙ্গে চিকিৎসকের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা, ব্যবহৃত উপাদানের নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল সম্পর্কেও পর্যাপ্ত তথ্য নেওয়া জরুরি। সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে চিকিৎসকের সঙ্গে বিস্তারিত পরামর্শ করাও গুরুত্বপূর্ণ।

সূত্র: বিবিসি

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD