Logo

বাংলাদেশে উৎপাদন কমলেও গুজরাটে ইলিশের রেকর্ড

profile picture
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৪:০২
বাংলাদেশে উৎপাদন কমলেও গুজরাটে ইলিশের রেকর্ড
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ইলিশের উৎপাদন কমার খবরের মধ্যেই গুজরাটের নর্মদা নদীতে বেড়েছে এই মাছের উপস্থিতি। বিশেষ করে নর্মদার নিম্ন অববাহিকায় ভরুচের আশপাশে সাম্প্রতিক সময়ে বিপুল পরিমাণ ইলিশ ধরা পড়ছে। পরিবেশগত পরিবর্তন, নদীর পানির বৈশিষ্ট্য এবং অনুকূল বর্ষার কারণে ওই অঞ্চলের নদীমোহনা ইলিশের জন্য উপযোগী হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন মৎস্যবিজ্ঞানীরা।

বিজ্ঞাপন

ইলিশকে মূলত পরিযায়ী মাছ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। জীবনের বড় একটি সময় এটি সমুদ্রে কাটালেও প্রজননের সময় মিঠা পানির নদীতে প্রবেশ করে। বর্ষাকালে নদী থেকে পুষ্টিসমৃদ্ধ পানি সাগরে মেশার ফলে তৈরি হওয়া বিশেষ পরিবেশ ইলিশের চলাচল ও প্রজননের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

নর্মদার নিম্ন অববাহিকায় ভরুচের কাছে মিঠা ও লবণাক্ত পানির সংমিশ্রণে এমন একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যা ইলিশের জন্য অনুকূল হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

কামধেনু বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ অব ফিশারিজ সায়েন্সের সহকারী অধ্যাপক আর বি ভালা ও এ এম পারমারের মতে, পরিবেশের এ ধরনের পরিবর্তন ইলিশের স্বাভাবিক গতিপথে প্রভাব ফেলতে পারে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশে কমছে ইলিশের উৎপাদন

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ আসে ইলিশ থেকে। একই সঙ্গে বিশ্বে উৎপাদিত ইলিশের বড় একটি অংশ বাংলাদেশে উৎপাদিত হয়।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাব বলছে, ২০০২-০৩ অর্থবছরে বাংলাদেশে ইলিশের উৎপাদন ছিল ১ লাখ ৯৯ হাজার মেট্রিক টন। এরপর কয়েক বছর ধরে উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে সেই প্রবৃদ্ধিতে পরিবর্তন দেখা যায়।

বিজ্ঞাপন

২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে ইলিশ উৎপাদিত হয় ৫ লাখ ৭১ হাজার মেট্রিক টন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন কমে দাঁড়ায় ৫ লাখ ২৯ হাজার মেট্রিক টনে। এরপর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন আরও কমে হয় ৫ লাখ ৪ হাজার মেট্রিক টন।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান এখনও পাওয়া না গেলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, ওই বছর দেশে ইলিশের উৎপাদন ৫ লাখ মেট্রিক টনের নিচে নেমেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত-বাংলাদেশের গঙ্গা-হুগলি-পদ্মা নদী ব্যবস্থা একসময় ইলিশের গুরুত্বপূর্ণ প্রজননক্ষেত্র ছিল। তবে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে পরিবর্তন, বিভিন্ন নির্মাণকাজ, নাব্যতা কমে যাওয়া, দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলো ইলিশের চলাচল ও প্রজনন পরিবেশে প্রভাব ফেলছে।

বিজ্ঞাপন

ফারাক্কা ব্যারাজের কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে পরিবর্তনসহ দীর্ঘদিনের বিভিন্ন পরিবেশগত পরিবর্তন ঐতিহ্যবাহী প্রজননক্ষেত্রগুলোতে ইলিশের বিচরণে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

গুজরাটে চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ উৎপাদন

বাংলাদেশে উৎপাদন কমার বিপরীতে গুজরাটে ইলিশের উৎপাদন ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

বিজ্ঞাপন

গুজরাটের মৎস্যশিল্প কমিশনার বিজয় খারাদির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে রাজ্যে ইলিশ উৎপাদন হয়েছিল ১৪ হাজার ১৯৮ দশমিক ৯৮ মেট্রিক টন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে ৮ হাজার ২০৯ দশমিক ৪৮ মেট্রিক টনে নেমে আসে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন সামান্য বেড়ে হয় ৮ হাজার ৫৩৫ দশমিক ৭৫ মেট্রিক টন। তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে দাঁড়ায় ১৪ হাজার ৫৮৭ দশমিক ৭২ মেট্রিক টনে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

এই উৎপাদন বৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে অভ্যন্তরীণ জলসীমা থেকে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গুজরাটের অভ্যন্তরীণ জলসীমায় ইলিশের উৎপাদন ছিল মাত্র ১২৩ দশমিক ৬২ মেট্রিক টন। পরের অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ৬৪৫ দশমিক ৯৯ মেট্রিক টনে।

বিজ্ঞাপন

ভরুচে বাড়ছে ইলিশ, লাভবান জেলেরা

গুজরাটের ভরুচ জেলায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট ৭ হাজার ৪১০ দশমিক ৯ মেট্রিক টন ইলিশ উৎপাদিত হয়েছে। এর মধ্যে সামুদ্রিক ইলিশের পরিমাণ ২ হাজার ৯৪৯ দশমিক ৭৬ মেট্রিক টন এবং অভ্যন্তরীণ জলসীমা থেকে এসেছে ৪ হাজার ৪৬০ দশমিক ৩৩ মেট্রিক টন।

অর্থাৎ, গুজরাটের মোট ইলিশ উৎপাদনের প্রায় ৫১ শতাংশই এসেছে ভরুচ জেলা থেকে।

বিজ্ঞাপন

নর্মদা নদীর তীরবর্তী এলাকায় ইলিশের বাড়তি উপস্থিতি স্থানীয় জেলেদের আয়েও প্রভাব ফেলেছে। এই নদী ঘিরে ২৫ হাজারের বেশি জেলে ইলিশ আহরণের সঙ্গে যুক্ত বলে সংশ্লিষ্টদের তথ্য।

ভাদভুত গ্রামের জেলে ধবল মাচ্ছি জানান, বর্ষার চার মাসের ইলিশ মৌসুম তাদের আয়ের গুরুত্বপূর্ণ সময়। এবার হানসোট, দাহেজ ও ভাদভুত এলাকায় ভালো পরিমাণে ইলিশ ধরা পড়ছে।

ভরুচের জেলে রমেশ মাচ্ছির ভাষ্য, নর্মদায় এত বেশি ইলিশ ধরা পড়ার ঘটনা তারা আগে দেখেননি। বাড়তি মাছ আহরণের ফলে স্থানীয় জেলেদের আয় বেড়েছে এবং পরিবারগুলোর আর্থিক পরিস্থিতিতেও স্বস্তি এসেছে বলে জানান তিনি।

বিজ্ঞাপন

গুজরাটের ইলিশ যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে

গুজরাটের স্থানীয় বাজারে ইলিশের চাহিদা তুলনামূলক কম। ফলে উৎপাদিত মাছের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পশ্চিমবঙ্গের বাজারে পাঠানো হচ্ছে। এমনকি গুজরাটের ইলিশ বাংলাদেশেও আসছে।

ব্যবসায়ীদের হিসাবে, চলতি মৌসুমে ভরুচ জেলা থেকে প্রায় ২৫০ টন ইলিশ কলকাতা ও হাওড়ার বাজারে পাঠানো হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের বাজারে ইলিশের চাহিদা থাকায় গুজরাটের জেলেরা তুলনামূলক ভালো দাম পাচ্ছেন।

তবে নর্মদায় ইলিশের এই বাড়তি উপস্থিতিকে শুধু উৎপাদন বৃদ্ধির ঘটনা হিসেবে দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এর সঙ্গে নদীর পরিবেশ এবং ইলিশের পরিযায়ী আচরণের পরিবর্তনের বিষয়টিও জড়িত থাকতে পারে।

নদীর পানির প্রবাহ, লবণাক্ততার মাত্রা, দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তন ইলিশের গতিপথে দীর্ঘমেয়াদে কী ধরনের প্রভাব ফেলছে, তা বুঝতে আরও গবেষণা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সূত্র: এনডিটিভি, বিবিসি বাংলা

জেবি/জেএইচআর

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD