Logo

পদ্মায় ইলিশের আকাল, জাল-নৌকা বিক্রি করে পেশা বদলাচ্ছে জেলেরা

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
মানিকগঞ্জ
১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৩:৫৫
পদ্মায় ইলিশের আকাল, জাল-নৌকা বিক্রি করে পেশা বদলাচ্ছে জেলেরা
ছবি: সংগৃহীত

একসময় পদ্মায় জাল ফেললেই ধরা পড়ত রুপালি ইলিশ। ইলিশের মৌসুমে নদীপাড়ের ঘাটগুলো সরগরম হয়ে উঠত, ব্যস্ততা বাড়ত জেলেদের। এই মাছ ধরেই নদীপারের বহু পরিবারের জীবিকা চলত। তবে সেই চেনা দৃশ্য এখন অনেকটাই ফিকে। কাঙ্ক্ষিত ইলিশের আশায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা নদীতে থেকেও অনেক জেলেকে ফিরতে হচ্ছে প্রায় খালি হাতে।

বিজ্ঞাপন

মাছ ধরার সময় ও ব্যয় বাড়লেও সেই তুলনায় আয় বাড়ছে না। বরং কয়েক বছর ধরে পদ্মায় ইলিশের উপস্থিতি কমে যাওয়ায় অনেক জেলে বিকল্প পেশা বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। কেউ কৃষিকাজ করছেন, আবার কেউ নৌকা-জাল বিক্রি করে রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

পদ্মা ও যমুনাঘেরা মানিকগঞ্জের দৌলতপুর, শিবালয় ও হরিরামপুর উপজেলার মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে নদী দুটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এসব এলাকার জেলেদের আয়ের অন্যতম উৎস ছিল পদ্মার ইলিশ। কিন্তু নদীতে ইলিশের উপস্থিতি কমে যাওয়ায় সেই নির্ভরতা এখন সংকটে পরিণত হয়েছে।

পাঁচ বছরে আহরণ কমেছে প্রায় ৪৬ শতাংশ

বিজ্ঞাপন

মৎস্য অধিদপ্তরের ‘ইয়ারবুক অব ফিশারিজ স্ট্যাটিস্টিকস অব বাংলাদেশ’-এর ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তথ্য অনুযায়ী, লোয়ার পদ্মায় ইলিশ আহরণে উল্লেখযোগ্য পতন হয়েছে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

পরিসংখ্যান বলছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে লোয়ার পদ্মা থেকে ১ হাজার ১৫৯ মেট্রিক টন ইলিশ আহরণ করা হয়েছিল। পরের অর্থবছরে তা কমে হয় ১ হাজার ১১৭ মেট্রিক টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে সামান্য বেড়ে আহরণ দাঁড়ায় ১ হাজার ১২২ মেট্রিক টনে।

তবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা আবার কমে ১ হাজার ৯০ মেট্রিক টনে নেমে আসে। সবচেয়ে বড় পতন দেখা যায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে। ওই বছর লোয়ার পদ্মায় ইলিশ আহরণ নেমে দাঁড়ায় মাত্র ৬২২ মেট্রিক টনে।

অর্থাৎ ২০২০-২১ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে লোয়ার পদ্মায় ইলিশ আহরণ কমেছে ৫৩৭ মেট্রিক টন। শতাংশের হিসাবে এই পতন ৪৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ।

বিজ্ঞাপন

বিশেষ করে ২০২৩-২৪ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ব্যবধানটি উল্লেখযোগ্য। এক বছরের ব্যবধানে আহরণ কমেছে ৪৬৮ মেট্রিক টন।

‘শুধু মাছ ধরে সংসার চালানো যায় না’

সরকারি পরিসংখ্যানের সঙ্গে নদীপাড়ের জেলেদের অভিজ্ঞতাতেও ইলিশ কমে যাওয়ার চিত্র উঠে এসেছে।

বিজ্ঞাপন

বাহিরচর গ্রামের জেলে ফারুক ব্যাপারী বলেন, আগে মাছ ধরেই সংসার চালাতাম। এখন নদীতে আগের মতো মাছ নেই। কৃষিকাজের পাশাপাশি মাছ ধরতে হয়। শুধু মাছ ধরে এখন আর সংসার চালানো সম্ভব হচ্ছে না।

নদীর গভীরতা কমে যাওয়াকেও মাছ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ মনে করেন তিনি। ফারুক ব্যাপারীর ভাষায়, “আমার মনে হয়, নদী আগের মতো গভীর নেই। এ কারণে মাছও আগের মতো আসে না। আমরা বুঝতে পারছি না, সেই আগের মাছগুলো গেল কোথায়?”

ভেলাবাদ গ্রামের জেলে লালন মোল্লার অভিজ্ঞতাও প্রায় একই। তিনি বলেন, আগে নদীতে অনেক মাছ পাওয়া যেত। এখন মাছ নেই। নদীর গভীরতা কমে গেছে। জাহাজ চলাচলের শব্দেও মাছ ভয় পেতে পারে। এসব কারণেই নদীতে মাছ কমে গেছে বলে মনে হয়।

বিজ্ঞাপন

ইলিশের বদলে হাতে উঠেছে রিকশার হ্যান্ডেল

ইলিশ কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে জেলেদের জীবিকায়। দড়িকান্দি গ্রামের কার্ডধারী জেলে লিটন তাদেরই একজন।

তিনি বলেন, “নদীতে ইলিশ পাওয়া যায় না। তাই নৌকা ও জাল বিক্রি করে একটি রিকশা কিনেছি। এখন রিকশা চালিয়েই সংসার চালাই।”

বিজ্ঞাপন

অর্থাৎ যে নদী একসময় একটি পরিবারের পুরো জীবিকার জোগান দিত, সেই নদীতেই এখন মাছ ধরাকে অনেকের কাছে অনিশ্চিত পেশা মনে হচ্ছে।

কেন কমছে পদ্মার ইলিশ

মৎস্য বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ইলিশের বিচরণ ও প্রজনন অনেকটাই নদীর পরিবেশগত অবস্থার ওপর নির্ভরশীল। নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া, পলি জমে চর ও ডুবোচর তৈরি হওয়া, পানিদূষণ, খাদ্যের সংকট, মিঠাপানির প্রবাহে পরিবর্তন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয় ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণে প্রভাব ফেলতে পারে।

বিজ্ঞাপন

ইলিশ সাধারণত প্রজননের জন্য সমুদ্র থেকে নদীর দিকে আসে। এই যাত্রাপথে পানির প্রবাহ, তাপমাত্রা, লবণাক্ততা ও খাদ্যের প্রাপ্যতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নদীর প্রবাহ ও পরিবেশে পরিবর্তন হলে ইলিশের বিচরণ ও প্রজননেও তার প্রভাব পড়তে পারে।

নদীর মোহনা ও প্রবাহপথে অতিরিক্ত পলি জমে চর বা ডুবোচর তৈরি হলে ইলিশের স্বাভাবিক চলাচলেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। পাশাপাশি নদীতে বর্জ্য ও অন্যান্য দূষণ বাড়লে জলজ পরিবেশের ওপরও চাপ পড়ে।

নিষিদ্ধ জালে জাটকা ও মা ইলিশ শিকার

বিজ্ঞাপন

ইলিশের সংকটের সঙ্গে অবৈধভাবে মাছ ধরার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল ও চায়না দুয়ারি জালে জাটকা এবং মা ইলিশসহ বিভিন্ন মাছ ধরা হচ্ছে। এতে ইলিশের প্রজনন ও ভবিষ্যৎ উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

হরিরামপুর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নূরুল ইকরাম বলেন, প্রাকৃতিক বিভিন্ন কারণে ইলিশের প্রজনন ও বিচরণে প্রভাব পড়তে পারে। ইলিশের খাদ্য কমে যাওয়া, নদীতে চর সৃষ্টি, জাহাজ চলাচল এবং নদীদূষণ—এসব বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হবে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

নিষিদ্ধ জাল ব্যবহারের বিষয়ে তিনি বলেন, কিছু মানুষ নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল ও চায়না দুয়ারি ব্যবহার করে মা ইলিশসহ বিভিন্ন মাছ শিকার করছে। এতে ইলিশের প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। অবৈধভাবে মাছ শিকারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে আরও কঠোরভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মানিকগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা শেখ মনিরুল ইসলাম মনিরের মতে, নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া, দূষণ, মানুষের অসচেতনতা এবং নিষিদ্ধ সময়ে কিছু মৌসুমি জেলের মা ইলিশ শিকার—এসব কারণে পদ্মা-যমুনায় ইলিশের পরিমাণ কমেছে।

চলছে অভিযান, জব্দ হচ্ছে জাল

ইলিশ রক্ষায় নিয়মিত অভিযান ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনার তথ্যও দিয়েছে জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়।

২০২৬ সালের জুন মাসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাতীয় মাছ ইলিশ রক্ষায় ২৬২টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। একই সময়ে ৭৫টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। অভিযানে ৩ মেট্রিক টন ইলিশ এবং ২ লাখ ২৯ হাজার মিটার জাল জব্দ করা হয়েছে।

এ ছাড়া নিয়মিত মামলা হয়েছে ১০৯টি। কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে ৭০ জনকে এবং জরিমানা আদায় করা হয়েছে ২ লাখ টাকা।

তবে নদীর পরিবেশগত পরিবর্তন, ইলিশের বিচরণপথের সংকট এবং অবৈধ শিকার—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে মোকাবিলা না করা গেলে পদ্মায় ইলিশের পুরোনো প্রাচুর্য ফিরিয়ে আনা কঠিন হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আর সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় চাপটি এখন পড়ছে নদীকে ঘিরে বেঁচে থাকা জেলেদের জীবনে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD