Logo

ইরান যুদ্ধের কারণেই নির্বাচনে ডুবল ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি?

profile picture
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
৪ নভেম্বর, ২০২৬, ১৭:০৭
ইরান যুদ্ধের কারণেই নির্বাচনে ডুবল ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি?
ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি। কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পথে রয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। গভর্নর নির্বাচনেও দলটির উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছে। এই ফলকে ট্রাম্পের নেতৃত্ব ও নীতির প্রতি ভোটারদের অনাস্থার প্রকাশ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।

বিজ্ঞাপন

নির্বাচনের আগে থেকেই ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ভাটা দেখা যাচ্ছিল। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ, বাণিজ্যযুদ্ধ এবং অভিবাসননীতি নিয়ে অসন্তোষ ভোটের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

দ্য ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রতিনিধি পরিষদের জাতীয় পর্যায়ের ভোটে ডেমোক্র্যাটরা প্রায় ১৩ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে এগিয়ে থাকার পথে। ১৯৭০-এর দশকের পর কংগ্রেস নির্বাচনে এটি অন্যতম বড় ব্যবধান।

সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিতে ডেমোক্র্যাটদের চারটি আসনে জয় প্রয়োজন ছিল। শেষ পর্যন্ত রিপাবলিকানদের দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত কয়েকটি অঙ্গরাজ্যেও জয় পেয়েছেন দলটির প্রার্থীরা।

বিজ্ঞাপন

আইওয়া, ওহাইও, সাউথ ক্যারোলাইনা, টেক্সাস ও কানসাসের মতো অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্য বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

কানসাসে ১৯৩২ সালের পর প্রথমবারের মতো সিনেটে কোনো ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জয়ী হওয়ার পথে রয়েছেন। নর্থ ক্যারোলিনায় দলটির প্রার্থী ২০ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে, জর্জিয়ায় ১৮ শতাংশ পয়েন্ট এবং টেক্সাসে ১১ শতাংশ পয়েন্টে এগিয়ে রয়েছেন।

প্রতিনিধি পরিষদেও বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে ডেমোক্র্যাটরা। দলটির আসনসংখ্যা প্রায় ২৬০-এ পৌঁছাতে পারে। ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক সংকটের সময় পাওয়া আসনের তুলনায়ও এটি বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

অঙ্গরাজ্যগুলোর গভর্নর নির্বাচনেও ভালো ফল করেছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। টেক্সাসে সাত শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জিনা হিনোজোসা। এ ছাড়া জর্জিয়া, ওহাইও ও আইওয়ায় রিপাবলিকানদের কাছ থেকে গভর্নরের পদ ছিনিয়ে নিয়েছে দলটি।

আলাস্কা, নেভাডা ও কানসাসেও ভোট গণনার শেষ পর্যায়ে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা এগিয়ে ছিলেন।

নির্বাচনের আগে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পাওয়া ডেমোক্র্যাটদের জন্য কঠিন বলে মনে করা হচ্ছিল। কারণ, সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে এমন কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে জয় প্রয়োজন ছিল, যেখানে ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্প বড় ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ায় নির্বাচনি সমীকরণ বদলে যায়।

বিজ্ঞাপন

রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলোর একটি ছিল সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অসন্তোষ। ক্ষমতায় ফেরার আগে ট্রাম্প জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং বিদেশে যুদ্ধ বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু ক্ষমতায় এসে ইরানের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েন তিনি। পাশাপাশি শুরু করেন বৈশ্বিক বাণিজ্যযুদ্ধ।

অন্যদিকে সাধারণ মানুষের আর্থিক পরিস্থিতিরও উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। নির্বাচনি প্রচারণার শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দাম আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি ছিল। ডিজেলের দামও রেকর্ড পর্যায়ের কাছাকাছি পৌঁছায়।

গত ছয় মাস ধরে মজুরি বৃদ্ধির চেয়ে মূল্যস্ফীতির হার বেশি ছিল। তিন বছরের মধ্যে বাড়ি কেনার ঋণের সুদের হারও সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল।

বিজ্ঞাপন

ট্রাম্পের শুল্কনীতির প্রভাব পড়েছে কৃষিপ্রধান অঞ্চলগুলোতে। একই সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বড় অঙ্কের ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েও সমালোচনার মুখে পড়ে তাঁর প্রশাসন। এসব কারণে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে রিপাবলিকানদের প্রতি অসন্তোষ বেড়েছে।

রিপাবলিকানদের পরাজয়ের আরেকটি বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে হিস্পানিক ভোটারদের সমর্থন হারানো। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এই জনগোষ্ঠীর ভোটে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে ট্রাম্পের ব্যবধান অনেকটাই কমে এসেছিল। সেই সাফল্য ধরে রাখতে রিপাবলিকানরা দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে নির্বাচনি এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ করেছিল।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

তবে এবারের নির্বাচনে তাদের সেই কৌশল প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। দ্য ইকোনমিস্টের প্রাথমিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হিস্পানিক জনগোষ্ঠীর বসবাস বেশি—এমন এলাকাগুলোতে ডেমোক্র্যাটদের ভোট উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

বিজ্ঞাপন

টেক্সাসের দক্ষিণ সীমান্তবর্তী ওয়েব কাউন্টির ফল এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২০ সালে সেখানে জো বাইডেন ২৩ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন। ২০২৪ সালে ট্রাম্প দুই শতাংশ পয়েন্টে এগিয়ে ছিলেন। কিন্তু এবারের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস তালারিকো ৪৭ শতাংশ পয়েন্টের বিশাল ব্যবধানে জয় পেয়েছেন।

ফ্লোরিডা ও টেক্সাসে নির্বাচনি এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ করে রিপাবলিকানরা যে সুবিধা নিতে চেয়েছিল, হিস্পানিক ভোটারদের মধ্যে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন বেড়ে যাওয়ায় সেই পরিকল্পনাও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।

নির্বাচনের শেষ দিকে ভোটারদের সামনে তুলে ধরার মতো ইতিবাচক সাফল্য খুব বেশি ছিল না রিপাবলিকান প্রার্থীদের। ফলে অনেক প্রার্থী সমাজতন্ত্র, উদারনৈতিক রাজনীতি ও ইসলাম নিয়ে নেতিবাচক প্রচারণায় মনোযোগ দেন।

বিজ্ঞাপন

মিশিগানে ডেমোক্র্যাট সিনেট প্রার্থী আবদুল আল-সায়েদকে ‘জিহাদি’ বলেও আক্রমণ করেন ট্রাম্প। প্রগতিশীল এই রাজনীতিকের নির্বাচনি প্রচারে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং ইসরায়েলে মার্কিন সামরিক সহায়তার বিরোধিতা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল।

তবে এসব আক্রমণ ভোটারদের মন জয়ে রিপাবলিকানদের প্রত্যাশিত সুবিধা এনে দিতে পারেনি।

ডেমোক্র্যাটদের এই বিজয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন পরিস্থিতি তৈরি হতে যাচ্ছে। কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলেও প্রেসিডেন্টের ভেটো ক্ষমতা অকার্যকর করার মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা দলটির থাকবে না। ফলে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিগুলো আইন হিসেবে বাস্তবায়ন করতে ডেমোক্র্যাটদের বাধার মুখে পড়তে হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে রিপাবলিকান পার্টির সামনে তৈরি হয়েছে নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে কঠিন প্রশ্ন। গত এক দশকে দলটির রাজনীতিতে ট্রাম্পের প্রভাব ছিল ব্যাপক। অনেক নেতা তাঁর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেই রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রেখেছেন।

কিন্তু নির্বাচনে বড় বিপর্যয়ের পর তাঁদের সামনে দ্বিমুখী সংকট তৈরি হয়েছে। ট্রাম্পের সমালোচনা করলে দলীয় প্রাথমিক নির্বাচনে তাঁর বিরোধিতার মুখে পড়তে পারেন। আবার তাঁকে সমর্থন দিয়ে গেলে সাধারণ নির্বাচনে ভোটারদের সমর্থন হারানোর ঝুঁকি রয়েছে।

সব মিলিয়ে এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচন শুধু কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বদলের ঘটনা নয়; রিপাবলিকান পার্টির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট

জেবি/জেএইচআর

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD