টানা ২৪ ঘণ্টা না খেয়ে থাকলে শরীরে কী ঘটে?

বর্তমানে ওজন নিয়ন্ত্রণ ও সুস্থ জীবনযাপনের অংশ হিসেবে অনেকেই নির্দিষ্ট সময় উপবাস বা দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার অভ্যাস অনুসরণ করছেন। অনেকের ধারণা, টানা ২৪ ঘণ্টা না খেয়ে থাকলে শরীর সতেজ হয়, ওজন কমে এবং বিপাকক্রিয়ার উন্নতি ঘটে। তবে দীর্ঘ সময় খাবার থেকে বিরত থাকলে শরীরের ভেতরে নানা ধরনের পরিবর্তন শুরু হয়, বিশেষ করে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে। চলুন জেনে নেওয়া যাক ২৪ ঘণ্টা না খেয়ে থাকলে শরীরে কী ঘটে-
বিজ্ঞাপন
শরীর ধীরে ধীরে শক্তি পাওয়ার পদ্ধতি পরিবর্তন করে। এর কারণ হলো, আপনার খাওয়া খাবার হজম হওয়ার পর রক্তে শর্করার মাত্রা কিছুটা কমতে শুরু করে। তখন শরীর প্রথমে রক্তে শর্করার স্বাভাবিক মাত্রা বজায় রাখার জন্য লিভারে সঞ্চিত গ্লাইকোজেন নামক গ্লুকোজ ব্যবহার করে।
এরপরে এটি শক্তির জন্য সঞ্চিত চর্বি ব্যবহার করতে শুরু করে এবং কিটোন নামক পদার্থ তৈরি করে। একই সময়ে, সঞ্চিত শক্তি মুক্ত করতে সাহায্য করার জন্য গ্লুকাগনের মতো হরমোনের মাত্রা বাড়ে এবং ইনসুলিনের মাত্রা কমে যায়।
বিজ্ঞাপন
বিশেষজ্ঞরা বলেন, সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে এসব পরিবর্তন সাধারণত স্বাভাবিকভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকে। তবে যারা দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার অভ্যাসে অভ্যস্ত নন, তাদের ক্ষুধা, ক্লান্তি, মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা, বিরক্তি, মনোযোগ কমে যাওয়া কিংবা হালকা দুর্বলতা দেখা দিতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, অধিকাংশ সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে ২৪ ঘণ্টা না খেয়ে থাকলেও রক্তে শর্করার মাত্রা বিপজ্জনকভাবে কমে যায় না। কারণ যকৃত প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তে গ্লুকোজ সরবরাহ করতে থাকে। তবে সবার জন্য বিষয়টি একই রকম নয়। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি, যারা ইনসুলিন বা রক্তে শর্করা কমানোর ওষুধ সেবন করেন, গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী নারী, শিশু এবং দুর্বল বা বয়স্ক ব্যক্তিদের জন্য দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাদের ক্ষেত্রে রক্তে শর্করা অতিরিক্ত কমে যাওয়া, পানিশূন্যতা কিংবা অন্যান্য জটিলতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ছাড়া তাদের দীর্ঘ সময় উপবাস না থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়।
বিজ্ঞাপন
ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশন (NCBI)-এ প্রকাশিত ফিজিওলজি, ফাস্টিং শিরোনামের একটি ২০২৩ সালের গবেষণায় দেখানো হয়েছে, কীভাবে উপবাস শরীরে উল্লেখযোগ্য বিপাকীয় পরিবর্তন ঘটায়। এতে না খেয়ে থাকার কিছু উপকারিতা তুলে ধরা হয়েছে। এর অন্যতম প্রধান উপকারিতা হলো ইনসুলিন সংবেদনশীলতার উন্নতি, যা মেটাবলিক সিনড্রোম এবং ডায়াবেটিস থেকে সুরক্ষা দিতে সাহায্য করে। এই পদ্ধতি পদ্ধতি শরীরের চর্বি কমাতে, রক্তচাপ কমাতে এবং অ্যাথেরোজেনিক লিপিড হ্রাস করতে পারে। প্রাণিদের ওপর করা গবেষণায় দেখা গেছে যে এই অভ্যাস আলঝেইমার এবং পারকিনসন রোগের মতো স্নায়বিক ব্যাধির অগ্রগতি বিলম্বিত করতে পারে।
২৪ ঘণ্টা না খেয়ে থাকার এই রুটিনের প্রাথমিক পর্যায়ে অনেকে মাথাব্যথা অনুভব করতে পারেন, যা সম্ভবত হাইপোগ্লাইসেমিয়া, ডিহাইড্রেশন, ক্যাফেইন প্রত্যাহার বা প্রদাহজনক প্রক্রিয়ার কারণে হয়ে থাকে। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা কর্টিসলের মতো গ্লুকোকর্টিকয়েডের অতিরিক্ত সংস্পর্শের কারণ হতে পারে। এর ফলে পেশীক্ষয় এবং প্যারাডক্সিক্যাল ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স হতে পারে। গবেষণাটিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, কম ওজনের, শিশু এবং বয়স্কদের ক্ষেত্রে উপবাসের নিরাপত্তা সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য নেই। গবেষণাটিতে জোরালোভাবে সুপারিশ করা হয়েছে যে, ২৪ ঘণ্টা না খেয়ে থাকার রুটিন সব সময় একজন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে করা উচিত।








