ভুলে ভরা ৫০তম বিসিএস পরীক্ষা, ২০০ প্রশ্নে বানান ভুল ১৭৭

দেশের সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগ পরীক্ষা বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের অধীনে অনুষ্ঠিত ৫০তম বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে ব্যাপক বানান ভুলের ঘটনা সামনে এসেছে। শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) সকালে অনুষ্ঠিত এই পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে অন্তত ১৭৭টি বানান ত্রুটি শনাক্ত হয়েছে, যা পরীক্ষার্থী ও শিক্ষাঙ্গনে বিস্ময় এবং উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
বিজ্ঞাপন
প্রশ্নপত্রের দিকে এক নজর তাকালেই স্পষ্ট হয়, বাংলা বানানের একটি মৌলিক নিয়ম—ণত্ববিধি—প্রণয়নে চরম অবহেলা করা হয়েছে। আচরণ, গ্রহণ, কারণ, গবেষণা, জনগণ, উদাহরণসহ অত্যন্ত পরিচিত ও বহুল ব্যবহৃত শব্দেও মূর্ধন্য ‘ণ’-এর পরিবর্তে দন্ত্য ‘ন’ ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে ‘আচরণ’ লেখা হয়েছে ‘আচরন’, ‘গবেষণা’ হয়েছে ‘গবেষনা’, ‘জনগণ’ লেখা হয়েছে ‘জনগন’ এবং ‘কারণ’ লেখা হয়েছে ‘কারন’।

এমন ভুল শুধু কয়েকটি শব্দে সীমাবদ্ধ নয়। প্রশ্নপত্রজুড়ে ‘পরিগণিত’, ‘সম্প্রসারণ’, ‘অংশগ্রহণ’, ‘নিয়ন্ত্রণ’, ‘নির্মাণ’, ‘পরিমাণ’, ‘মন্ত্রণালয়’, ‘বর্ণ’—এসব শব্দেও একই ধরনের বানান বিভ্রাট দেখা গেছে। এমনকি ‘সদ্গুণ’ শব্দটি লেখা হয়েছে ‘সদগূন’, যা অর্থ ও উচ্চারণ—দুটো ক্ষেত্রেই বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।
বিজ্ঞাপন
এ ছাড়া প্রশ্নপত্রে অসংখ্য শব্দে অপ্রমিত ও ভুল বানান ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন—‘নির্বাহি’, ‘জালানী’, ‘লংঘনের’, ‘শৃংখলার’, ‘বাংগালি’, ‘উচু’, ‘কোন্’, ‘জানুয়ারী’, ‘ফেব্রুয়ারী’, ‘প্রস্থাব’, ‘মূলতঃ’, ‘শ্রেণী’, ‘রপ্তানী’, ‘এলগরিদম’, ‘প্লাটফর্ম’, ‘তিব্বতী’, ‘ভিডিও’, ‘অডিও’, ‘হ্যাণ্ডেল’, ‘তৈরী’, ‘বেশী’, ‘শূণ্য’, ‘কিনাএ’, ‘পেন্সিল’, ‘ব্যাক্তিগত’, ‘গাড়ী’—এমন বহু শব্দের ভুল বানান প্রশ্নপত্রে ছড়িয়ে আছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব শব্দের শুদ্ধ ও প্রমিত বানান বহু বছর ধরে পাঠ্যপুস্তক ও একাডেমিক লেখায় প্রতিষ্ঠিত। অথচ যে পরীক্ষায় অংশ নিতে পরীক্ষার্থীদের প্রমিত বানান আয়ত্ত করতে হয়, সেই পরীক্ষার প্রশ্নপত্রেই যদি এ ধরনের ভুল থাকে, তবে তা পরীক্ষার মান ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
বাংলা সাহিত্য ও ইতিহাসের ক্ষেত্রেও চরম অসতর্কতার নজির মিলেছে প্রশ্নপত্রে। বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন নিদর্শন চর্যাপদের কবি ভুসুকুপার নাম ভুল করে লেখা হয়েছে ‘ভুসুরুপা’। একইভাবে পল্লিকবি জসীমউদ্দীনের নাম লেখা হয়েছে ‘জসীমউদ্দীন’, যা সাহিত্যিক ঐতিহ্যের প্রতি অবহেলারই প্রতিফলন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিজ্ঞাপন
এ বিষয়ে এক পরীক্ষার্থী জানান, প্রশ্নপত্রে এত সংখ্যক বানান ভুল দেখে তিনি মানসিকভাবে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। তার ভাষায়, বিসিএসে ভালো করার জন্য যেখানে বানানের শুদ্ধতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে প্রশ্নপত্রেই যদি ভুল থাকে, তাহলে সেটি সত্যিই হতাশাজনক।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোবাশ্বের মোনেম বলেন, তিনি এখনো বিষয়টি বিস্তারিতভাবে দেখেননি। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন। তবে অতিসাধারণ শব্দে মূর্ধন্য ‘ণ’-এর পরিবর্তে দন্ত্য ‘ন’ ব্যবহারের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি স্বীকার করেন, এসব ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত ছিল এবং বাংলা বানানবিধি অনুযায়ী তা ভুল।
বিজ্ঞাপন

প্রশ্নপত্রে এমন ব্যাপক বানান ত্রুটি কীভাবে থেকে গেল—তা নিয়ে এখন শিক্ষার্থী ও সচেতন মহলে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও যাচাই প্রক্রিয়ায় আরও কঠোর নজরদারি না থাকলে বিসিএসের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।









