Logo

বিদায়ের আগে কেনাকাটার ধুম, হাজার কোটি টাকার বাস কিনছে সরকার

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১৭:৪৮
বিদায়ের আগে কেনাকাটার ধুম, হাজার কোটি টাকার বাস কিনছে সরকার
ছবি: সংগৃহীত

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে এসে প্রায় সাড়ে ১১শ কোটি টাকার বাস কেনার প্রক্রিয়া শুরু করায় অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। ভোটের আগে শেষ কর্মদিবসের মাত্র দুদিন আগে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) প্রায় ১ হাজার ১৩৩ কোটি টাকার প্রকল্পে ঠিকাদার নিয়োগের কার্যক্রম এগিয়ে নিচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

এই উদ্যোগ ঘিরে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে—বিদায়ের আগে কি পছন্দের ঠিকাদারকে সুবিধা দিতে তড়িঘড়ি করে এই প্রক্রিয়া এগোনো হচ্ছে কি না।

বিআরটিসি সূত্রে জানা গেছে, ৩৪০টি সিএনজি চালিত একতলা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস কেনার এই প্রকল্পের মেয়াদ গত বছরের ডিসেম্বরে শেষ হয়েছে। ঠিকাদার নিয়োগের জন্য ডিসেম্বরের শুরুতে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়। প্রাথমিকভাবে ২৯ জানুয়ারির মধ্যে দরপত্র কার্যক্রম শেষ হওয়ার কথা থাকলেও পরে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানের জন্য দরপত্র জমা দেওয়ার সময় বাড়ানো হয়।

সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী রোববার দরপত্র জমা ও একই দিনে তা উন্মুক্ত করা হবে।

বিজ্ঞাপন

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বুধবার পর্যন্ত আটটি প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দিয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, দরপত্র খোলার পর অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম প্রকাশ করা হবে। এরপর কারিগরি ও আর্থিক যাচাই-বাছাই শেষে সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার কথা রয়েছে।

ঋণচুক্তির শর্ত অনুযায়ী, এই দরপত্র বিজ্ঞপ্তির মেয়াদ তিন মাস—অর্থাৎ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই ঠিকাদার নিয়োগ চূড়ান্ত করতে হবে।

বিজ্ঞাপন

বাস সংগ্রহ প্রকল্পের পরিচালক কাজী আইয়ুব আলী এ প্রসঙ্গে বলেন, শেষ সময়ে এসে কোনো তাড়াহুড়া করা হচ্ছে—এমন অভিযোগ সঠিক নয়। অর্থায়ন সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী নিয়ম মেনেই সব কাজ করা হচ্ছে।

এই প্রকল্পটি দক্ষিণ কোরিয়ার এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংকের ঋণে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। দরপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, বাসের পাশাপাশি যন্ত্রপাতি ও রক্ষণাবেক্ষণ সরঞ্জাম সরবরাহ করতে হবে এবং প্রতিটি বাস সম্পূর্ণ নির্মিত অবস্থায় দিতে হবে। তবে দরপত্রের কিছু শর্ত ও আর্থিক কাঠামো নিয়ে স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা সীমিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

দরপত্রে অংশ নিতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে ১০ লাখ মার্কিন ডলার জামানত দিতে হবে। পাশাপাশি অন্তত ২০ বছরের বাস সরবরাহের অভিজ্ঞতা, গত ২০ বছরে বিদেশে কমপক্ষে ২০০টি ডিজেল বাস ও ৩৪০টি সিএনজি বাস রপ্তানির অভিজ্ঞতা এবং বছরে ন্যূনতম ২৫০টি সিএনজি সিঙ্গেল ডেকার এসি বাস উৎপাদনের সক্ষমতা থাকার শর্ত দেওয়া হয়েছে। এসব সক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে কারখানা ও উৎপাদন সুবিধার তথ্যও জমা দিতে হবে।

বিজ্ঞাপন

পরিবহন খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সব শর্ত একসঙ্গে পূরণ করা প্রতিষ্ঠান সংখ্যা খুবই সীমিত। ফলে দরপত্র কার্যত কয়েকটি বড় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই আবদ্ধ হয়ে পড়তে পারে।

বিআরটিসি কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রথমে টেকনিক্যাল সাব-কমিটি দরপত্র যাচাই করবে। কারিগরি দিক থেকে উত্তীর্ণ হলেই কেবল আর্থিক প্রস্তাব খোলা হবে। তবে অতীতে বিআরটিসির বিভিন্ন প্রকল্পে ‘টেকনিক্যালি নন-রেসপনসিভ’ দেখিয়ে প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠান বাদ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে, যা নতুন করে সন্দেহ তৈরি করেছে।

এ ছাড়া মূল প্রকল্প উন্নয়ন প্রস্তাব (ডিপিপি) ও ঋণচুক্তির বাইরে এসে কিছু শর্ত শিথিল করার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। প্রাথমিকভাবে বাসগুলো কোরিয়ায় নির্মিত হওয়ার কথা থাকলেও এখন বলা হচ্ছে, কোরিয়ান মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান হলে বাস অন্য দেশেও তৈরি হতে পারবে।

বিজ্ঞাপন

এ বিষয়ে বিআরটিসির চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা বলেন, পুরো প্রক্রিয়ায় ঋণদাতা সংস্থার বড় ভূমিকা রয়েছে এবং এটি নিয়মিত প্রশাসনিক কার্যক্রমের অংশ। এই সরকারের মেয়াদের মধ্যেই পুরো টেন্ডারিং শেষ হবে না। কারণ, দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে ৪৫ থেকে ৬০ দিন সময় লাগবে এবং ঠিকাদার নিয়োগের পর বাস সরবরাহে কমপক্ষে ১৫ মাস সময় নির্ধারিত থাকবে।

উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর একনেকে এই প্রকল্প অনুমোদন পায়। তবে প্রায় আড়াই বছরেও দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। প্রকল্প পরিচালক ও কোরিয়ান পরামর্শক নিয়োগে বিলম্ব, দরপত্র প্রক্রিয়ার জট এবং ঋণদাতা সংস্থার নানা মন্তব্যের কারণে প্রকল্পটি দীর্ঘদিন স্থবির ছিল। শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে দক্ষিণ কোরিয়ার এক্সিম ব্যাংক দরপত্র নথির চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়।

বিজ্ঞাপন

প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল রাজধানীর নগর পরিবহন ব্যবস্থা আধুনিক করা, বাস রুট পুনর্বিন্যাসে সহায়তা এবং পুরোনো তেলচালিত বাস ধাপে ধাপে তুলে নেওয়া। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৩৪০টি বাসের মধ্যে ১৪০টি ঢাকার বিভিন্ন রুটে এবং বাকি ২০০টি রাজধানীর বাইরে চলাচলের কথা। প্রকল্প ব্যয়ের বড় অংশ—৮২৯ কোটি টাকা—আসবে কোরিয়ার উন্নয়ন সহায়তা তহবিল থেকে, আর বাকি ৩০৫ কোটি টাকা দেবে বাংলাদেশ সরকার।

তবে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ বুয়েটের অধ্যাপক শামছুল হক বলেন, কেবল বাস কেনার আগ্রহ দেখালেই হবে না। বিআরটিসির আগে নিশ্চিত করা উচিত এসব বাস কোথায় রাখা হবে এবং কীভাবে পরিচালনা করা হবে। বাস রাখার পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় রাস্তায় বাস দাঁড় করানো লজ্জাজনক বাস্তবতা তৈরি করেছে।

সব মিলিয়ে, নির্বাচনের ঠিক আগে এই বড় অঙ্কের ক্রয় প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় স্বচ্ছতা, প্রয়োজনীয়তা ও সময়োপযোগিতা—তিনটি বিষয়ই নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে।

জেবি/এএস
Logo

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ

মোঃ শফিকুল ইসলাম ( শফিক )

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ৫৭, ময়মনসিংহ লেন, ২০ লিংক রোড, বাংলামটর, ঢাকা-১০০০।

ফোনঃ 02-44615293

ই-মেইলঃ dailyjanobaninews@gmail.com; dailyjanobaniad@gmail.com

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD