বাংলাদেশের নতুন ইতিহাস ‘ত্রয়োদশ’, ভাঙছে সব পুরনো রেকর্ড

বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে নতুন অধ্যায় রচনা করতে যাচ্ছে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা, অংশগ্রহণকারী প্রার্থী এবং নির্বাচনী প্রতীকের দিক থেকে এবারের ভোট আয়োজন ইতোমধ্যেই রেকর্ডের কাতারে উঠে এসেছে।
বিজ্ঞাপন
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) চূড়ান্ত তথ্য অনুযায়ী, ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য এই নির্বাচনে ৫০টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মিলিয়ে মোট ২০২৮ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
এবার ভোটাররা ধানের শীষ, দাঁড়িপাল্লা, শাপলা কলিসহ মোট ১১৯টি প্রতীকে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবেন, যা দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এর পাশাপাশি সংস্কার প্রস্তাবের ওপর ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দেওয়ার ব্যবস্থাও থাকছে, যা এবারের ভোটকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।
বর্তমানে ইসির নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ৬০টি। তবে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত থাকায় দলটি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। এছাড়া নিবন্ধিত আরও আটটি দল কোনো প্রার্থী দেয়নি।
বিজ্ঞাপন
এসব দলের মধ্যে রয়েছে— সাম্যবাদী দল (এমএল), কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ), বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, বিকল্পধারা বাংলাদেশ, তৃণমূল বিএনপি, বাংলাদেশ জাতীয়বাদী আন্দোলন (বিএনএম) এবং তরিকত ফেডারেশন।
২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যেখানে ২৮টি দল অংশ নিয়েছিল এবং ৬৯টি প্রতীকে ভোট হয়েছিল, সেখানে এবার অংশগ্রহণকারী দল ও প্রতীকের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ— যা নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় ব্যাপক বিস্তারের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
দলীয় প্রতীকের হিসেবে প্রার্থীসংখ্যায় এগিয়ে রয়েছে বিএনপি। ধানের শীষ প্রতীকে দলটির ২৮৮ জন প্রার্থী মাঠে রয়েছেন। জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে লড়ছেন ২২৪ জন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীকে ২৫৩ জন এবং জাতীয় পার্টির লাঙল প্রতীকে ১৯২ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
অন্যদিকে গণ অধিকার পরিষদের ট্রাক প্রতীকে ৯০ জন, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) কাস্তে প্রতীকে ৬৫ জন, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) মই প্রতীকে ৩৯ জন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের রিকশা প্রতীকে ৩৪ জন এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) শাপলা কলি প্রতীকে ৩২ জন প্রার্থী রয়েছেন।
বিজ্ঞাপন
এ ছাড়া খেলাফত মজলিসের দেওয়াল ঘড়ি প্রতীকে ২১ জন, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির ঈগল প্রতীকে ৩০ জন, গণফোরামের উদীয়মান সূর্য প্রতীকে ১৯ জন, গণসংহতি আন্দোলনের মাথাল প্রতীকে ১৭ জন, এলডিপির ছাতা প্রতীকে ১২ জন এবং নাগরিক ঐক্যের কেটলি প্রতীকে ১১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিকরা আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে। তবে ইসির তালিকায় জোটের শরিক জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)-এর ছয়জন প্রার্থীর নাম রয়েছে। যদিও দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না।
স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৪টি দল অংশ নেয়। ৩০০ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ২৯৩টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। ভোটের হার ছিল ৫৫.৬১ শতাংশ।
বিজ্ঞাপন
১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ২০৭টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করে। এতে ২৯টি দল অংশ নেয় এবং ভোটের হার ছিল ৫১.২৯ শতাংশ।
১৯৮৬ সালের তৃতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ১৫৩টি আসন পায়। ভোটের হার ছিল ৬৬.৩১ শতাংশ। ১৯৮৮ সালের চতুর্থ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি বর্জন করলেও জাতীয় পার্টি ২৫১টি আসনে জয়ী হয়।
১৯৯১ সালের পঞ্চম সংসদ নির্বাচন ছিল বহুদলীয় অংশগ্রহণের এক বড় উদাহরণ, যেখানে ৭৫টি দল অংশ নেয়। বিএনপি ১৪০টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করে। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচন সীমিত অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হলেও একই বছরের জুনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সপ্তম নির্বাচন হয়, যেখানে ৮০টির বেশি দল অংশ নেয় এবং ভোটের হার ছিল প্রায় ৭৫ শতাংশ।
বিজ্ঞাপন
২০০১ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ১৯৩টি আসন পায়। ২০০৮ সালের নবম নির্বাচনে নিবন্ধন পদ্ধতি চালুর পর প্রথমবারের মতো ভোট হয়; এতে আওয়ামী লীগ ২৩০টি আসনে জয়ী হয় এবং ভোটের হার ছিল ৮৭.১৩ শতাংশ।
২০১৪ সালের দশম নির্বাচন বিএনপিসহ বড় বিরোধী দলগুলোর বর্জনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়; ১৫৩টি আসনে প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালের একাদশ নির্বাচন উচ্চ ভোটার উপস্থিতির দাবি নিয়ে আলোচিত হয়, যেখানে আওয়ামী লীগ ২৫৮টি আসন পায়।
বিজ্ঞাপন
২০২৪ সালের দ্বাদশ নির্বাচনে ২৮টি দল অংশ নেয় এবং ভোটের হার ছিল ৪১.৮ শতাংশ। আওয়ামী লীগ ২২২টি আসন পায়। তবে ওই সংসদ স্থায়ী হয় মাত্র ছয় মাস সাত দিন। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন সরকারপ্রধান পদত্যাগ করলে সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীতে ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়।
রাজনৈতিক পালাবদল ও অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে আয়োজিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণ, প্রতীক বৈচিত্র্য এবং প্রার্থীর সংখ্যার বিচারে নতুন মানদণ্ড স্থাপন করতে যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এত বিপুল সংখ্যক দল ও প্রতীকের উপস্থিতি ভোটারদের সামনে যেমন বহুমাত্রিক বিকল্প তৈরি করছে, তেমনি নির্বাচনী ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
সব মিলিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে— এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।








