সংসদের উচ্চকক্ষ-নিম্নকক্ষ কী, কীভাবে পরিচালিত হবে?

সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত নিম্নকক্ষ বা জাতীয় সংসদই রাষ্ট্র পরিচালনার প্রধান চালিকাশক্তি। দেশের বাজেট ও অর্থসংক্রান্ত সব বিল পাশের একচ্ছত্র ক্ষমতা থাকবে নিম্নকক্ষের হাতে। তবে অর্থবিল ছাড়া অন্য যেকোনো বিল পাশের ক্ষেত্রে দুই কক্ষের সমন্বয় প্রয়োজন হবে। উচ্চকক্ষ মূলত নিম্নকক্ষ থেকে পাস হওয়া বিলগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করবে—যা আইন প্রণয়নে ‘দ্বিতীয় চিন্তার’ সুযোগ তৈরি করবে।
বিজ্ঞাপন
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হয়েছে এবং শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) আনুষ্ঠানিকভাবে গেজেট আকারে ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। আগামী ৩০ দিনের মধ্যে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে সংসদের অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
এবারের সংসদ হবে ব্যতিক্রমধর্মী। এতদিন এককক্ষবিশিষ্ট সংসদ থাকলেও এবার প্রথমবারের মতো দেশে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ চালু হতে যাচ্ছে—নিম্নকক্ষ ও উচ্চকক্ষ। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত ৩০০ সদস্য এবং সংরক্ষিত ৫০ নারী সদস্য নিয়ে গঠিত হবে নিম্নকক্ষ।
বিজ্ঞাপন
উচ্চকক্ষ গঠিত হবে প্রথম সংসদ অধিবেশন শুরু হওয়ার ২১০ দিনের মধ্যে। প্রথম ১৮০ দিন নিম্নকক্ষের সদস্যরা সংবিধান সংস্কারের কাজ করবেন। এরপর পরবর্তী ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতে (পিআর পদ্ধতি) ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে। উচ্চকক্ষের মেয়াদ থাকবে নিম্নকক্ষের শেষ কার্যদিবস পর্যন্ত।
উচ্চকক্ষ গঠনের পদ্ধতি সংশোধিত সংবিধান ও প্রণীত আইনের ওপর নির্ভর করবে। সদস্যরা সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হতে পারেন, আবার পরোক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থাও থাকতে পারে। বিশেষজ্ঞ, নারী বা সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে মনোনয়ন ব্যবস্থাও রাখা হতে পারে।
উচ্চকক্ষে মোট সদস্য হবেন ১০০ জন। সংসদ নির্বাচনে বিভিন্ন দল যে পরিমাণ ভোট পাবে, সেই আনুপাতিক হারে (পিআর পদ্ধতি) সদস্য মনোনীত হবে। অর্থাৎ কোনো দল যদি ৪০ শতাংশ ভোট পায়, তাহলে তারা ৪০টি আসন পাবে। আবার কেউ ১ শতাংশ ভোট পেলে তাদের ১ জন প্রতিনিধি থাকবে উচ্চকক্ষে।
বিজ্ঞাপন
এবার আসা যাক সংসদের কাজ নিয়ে। বাংলাদেশের সংসদ মূলত আইন প্রণয়নের সর্বোচ্চ সভা। এখান থেকে রাষ্ট্রের বিভিন্ন আইন পাশ হয়ে থাকে। এখানে একজন স্পিকার ও এক বা একাধিক ডেপুটি স্পিকার থাকেন, যারা সংসদের অধিবেশন পরিচালনা করেন। সংসদের একটি অধিবেশন শেষ হওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে পরবর্তী অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।
সংসদে মূলত আইন প্রণয়ন প্রস্তাব বিল আকারে হয়। এটি প্রথমে সংসদে প্রস্তাব করা হয়। পরে বিবেচনা ও অনুমোদনের জন্য ভোট হয়। এছাড়া কোনো প্রকার কর আরোপ বা অর্থ ব্যয় করতে হলে সংসদের অনুমোদন লাগে। তবে সাংবিধানিকভাবে সংসদ পাস করা সব আইনের ওপর রাষ্ট্রপতির অনুমোদন প্রয়োজন।
বিজ্ঞাপন
একটি বৈধ অধিবেশন চালানোর জন্য কোরাম (কথোপকথনে সভায় উপস্থিতি) প্রয়োজন, সাধারণত সদস্যদের একটি নির্দিষ্ট ন্যূনতম সংখ্যা উপস্থিত থাকতে হয়। উচ্চকক্ষ এবং নিম্নকক্ষ সংসদের ক্ষেত্রে সংবিধান সংস্কার বা সংশোধনের জন্য নিম্নকক্ষের দুই-তৃতীয়াংশের ভোট এবং উচ্চকক্ষের মেজরিটির ভোট লাগবে।
বিশ্লেষকরা এ ব্যবস্থার কিছু চ্যালেঞ্জও তুলে ধরেছেন। দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের জন্য নতুন ভবন, প্রশাসনিক কাঠামো এবং ১০৫ জন নতুন সদস্যের বেতন-ভাতা বাবদ রাষ্ট্রের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হবে। দুই কক্ষের পর্যালোচনার কারণে জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত আইন পাশ করার প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। উচ্চকক্ষ বা সিনেট শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিকভাবে পরাজিত বা দলের অনুগত ব্যক্তিদের ‘পুনর্বাসন কেন্দ্র’ হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার আশঙ্কা করছেন অনেকে।
সংস্কার কমিশনের মতে, এই ব্যবস্থা জাতীয় রাজনীতিতে ভারসাম্য ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে এবং কোনো একক দলের একচ্ছত্র আধিপত্য রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। উভয় কক্ষের মেয়াদ হবে চার বছর। আগামী গণভোটে জনগণের সমর্থন পেলে এ কাঠামো চূড়ান্তভাবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
বিজ্ঞাপন








