ছায়া মন্ত্রিসভা কী— জানুন বিস্তারিত

‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ ধারণাটি বহুদিনের হলেও সম্প্রতি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর নেতা আসিফ মাহমুদ ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের প্রস্তুতির কথা জানানোর পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
বিজ্ঞাপন
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচিত সরকারকে জবাবদিহির আওতায় রাখতে এ ধারণার উদ্ভব। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের বিতর্ক গুরুত্বপূর্ণ হলেও শুধু বক্তব্য-প্রতিবাদ যথেষ্ট নয়। সরকারের কাজকর্ম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ এবং বিকল্প নীতি প্রস্তাবের জন্য বিরোধীদলকে সংগঠিত কাঠামোতে কাজ করতে হয়। এ ধরনের সমান্তরাল আনুষ্ঠানিক কাঠামোকেই বলা হয় ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’।
ছায়া মন্ত্রিসভা কী:
সাধারণত সংসদের বৃহত্তম বিরোধী দলের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। সরকারের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের বিপরীতে একজন করে ‘ছায়া মন্ত্রী’ থাকেন। যেমন অর্থমন্ত্রীর বিপরীতে ছায়া অর্থমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিপরীতে ছায়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিপরীতে ছায়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তারা ক্ষমতায় না থাকলেও সংশ্লিষ্ট খাতের নীতি, বাজেট, আইন ও কর্মসূচি বিশ্লেষণ করে সমালোচনা ও বিকল্প প্রস্তাব তুলে ধরেন।
বিজ্ঞাপন
গঠনের প্রক্রিয়া:
দেশভেদে প্রক্রিয়ায় কিছু পার্থক্য থাকলেও মূল কাঠামো প্রায় একই। বৃহত্তম বিরোধী দলের নেতা সাধারণত ছায়া মন্ত্রিসভা ঘোষণা করেন। অভিজ্ঞ সংসদ সদস্য, সাবেক মন্ত্রী, নীতিনির্ধারক ও বিশেষজ্ঞদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। সরকারের মন্ত্রণালয় কাঠামো অনুসরণ করে দায়িত্ব বণ্টন করা হয়। একই সঙ্গে আঞ্চলিক ও মতাদর্শিক ভারসাম্যও বিবেচনায় রাখা হয়।
বিজ্ঞাপন
কী কাজ করে:
ছায়া মন্ত্রিসভা শুধু সমালোচনার মঞ্চ নয়; এটি বিকল্প সরকার পরিচালনার প্রস্তুতিমূলক কাঠামো হিসেবেও কাজ করে। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত, ব্যয়, নীতিমালা ও আইনপ্রস্তাব বিশ্লেষণ করে প্রশ্ন তোলে। পাশাপাশি একই বিষয়ে নিজেদের নীতিগত অবস্থান ও সমাধানও তুলে ধরে। বাজেট, আইন প্রণয়ন বা আন্তর্জাতিক চুক্তি—সব গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতেই ছায়া মন্ত্রীরা খাতভিত্তিক বক্তব্য দেন।
যেসব দেশে প্রচলিত:
বিজ্ঞাপন
ছায়া মন্ত্রিসভা মূলত যুক্তরাজ্য-এর ওয়েস্টমিনস্টার ধাঁচের সংসদীয় গণতন্ত্রে বেশি প্রচলিত। সেখানে বিরোধী দলকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘হিজ ম্যাজেস্টিস মোস্ট লয়্যাল অপজিশন’ বলা হয়—অর্থাৎ রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত কিন্তু সরকারের বিরোধী।
এ ছাড়া অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও নিউজিল্যান্ড-এ সুসংগঠিত ছায়া মন্ত্রিসভা রয়েছে। কানাডায় অনেক সময় ‘অপজিশন ক্রিটিক’ নামে খাতভিত্তিক সমালোচক নির্ধারণ করা হয়।
বিজ্ঞাপন
ভারত ব্রিটিশ ধারার সংসদীয় গণতন্ত্র অনুসরণ করলেও সেখানে আনুষ্ঠানিক ছায়া মন্ত্রিসভা নেই। তবে কিছু রাজনৈতিক দল অনানুষ্ঠানিকভাবে খাতভিত্তিক মুখপাত্র বা সমন্বয়ক রাখে, যা আংশিকভাবে একই ধরনের ভূমিকা পালন করে।
এ ছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকা, জ্যামাইকা, মালয়েশিয়া এবং ত্রিনিদাদ ও টোবাগো-সহ কয়েকটি কমনওয়েলথভুক্ত দেশে বিভিন্ন মাত্রায় এ চর্চা রয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়া ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট:
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ-এ সাংবিধানিকভাবে ছায়া মন্ত্রিসভা প্রতিষ্ঠিত না হলেও বিভিন্ন সময়ে বিরোধী দলগুলো ঘোষিত কমিটির পাশাপাশি অনানুষ্ঠানিক ছায়া কমিটি গঠন করেছে। তবে সেগুলো নিয়মিত সংসদীয় কাঠামোর অংশ নয় এবং বাজেট বা আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় তাদের প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকা সীমিত। ফলে ওয়েস্টমিনস্টার ধাঁচের পূর্ণাঙ্গ ও প্রভাবশালী ছায়া মন্ত্রিসভার মতো কাঠামো এখানে গড়ে ওঠেনি।
কেন গুরুত্বপূর্ণ:
বিজ্ঞাপন
বিশ্লেষকদের মতে, শক্তিশালী ছায়া মন্ত্রিসভা থাকলে সংসদীয় গণতন্ত্রে ক্ষমতার ভারসাম্য সুদৃঢ় হয়। বিকল্প নীতিচিন্তার বিকাশ ঘটে, ক্ষমতার পালাবদলে নীতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকে এবং একদলীয় আধিপত্যের ঝুঁকি কমে।
ছায়া মন্ত্রিসভা সরাসরি সরকার পরিচালনা না করলেও সরকারের সিদ্ধান্তে নজরদারি রেখে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখে। অনেক ক্ষেত্রে পরবর্তী নির্বাচনে জয়ী হলে ছায়া মন্ত্রীরাই মন্ত্রিত্ব পান, ফলে প্রশাসনিক প্রস্তুতি আগেই তৈরি থাকে।








