Logo

পাম্পে পাম্পে ‘তেল নেই’ পোস্টার, চরম জ্বালানি সংকটে দিশেহারা চালকরা

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
৮ মার্চ, ২০২৬, ১১:৫৬
পাম্পে পাম্পে ‘তেল নেই’ পোস্টার, চরম জ্বালানি সংকটে দিশেহারা চালকরা
ছবি: সংগৃহীত

ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনাকে ঘিরে দেশে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা তীব্র আকার ধারণ করেছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব ও সম্ভাব্য ঘাটতির আশঙ্কায় অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত তেল কিনে মজুত করছেন, যা ‘প্যানিক বায়িং’ হিসেবে পরিচিত। এর ফলে ঢাকার কয়েকটি এলাকা এবং গাজীপুরের অধিকাংশ ফিলিং স্টেশনে দ্রুত তেলের মজুত ফুরিয়ে গেছে। অনেক পাম্পে এখন পেট্রোল বা অকটেনের কোনও সরবরাহ নেই।

বিজ্ঞাপন

রবিবার (৮ মার্চ) সকাল থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন প্রধান সড়ক ও জেলার বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনের সামনে ‘পেট্রোল নেই’, ‘অকটেন নেই’ লেখা হাতে তৈরি পোস্টার ও ব্যানার ঝুলতে দেখা গেছে। হঠাৎ এমন পরিস্থিতিতে বিপাকে পড়েছেন মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি এবং গণপরিবহনের চালকরা।

তেল না পেয়ে অনেক চালককে এক পাম্প থেকে আরেক পাম্পে ঘুরে হতাশ হয়ে ফিরে যেতে দেখা গেছে। কেউ কেউ আবার গাড়ি নিয়ে রাস্তার পাশে বা বন্ধ হয়ে যাওয়া পাম্পের সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন। তবে পেট্রোল ও অকটেনের সংকট থাকলেও কিছু কিছু স্থানে সিএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। ফলে সেই পাম্পগুলোতে গাড়ির দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সরেজমিনে দেখা যায়, সকাল থেকে গাজীপুর ও ঢাকার অন্তত আটটি এলাকায় ঘুরে বেশিরভাগ ফিলিং স্টেশন প্রায় জনশূন্য অবস্থায় রয়েছে। পাম্পের বিক্রয়কর্মীদের পরিবর্তে সেখানে কেবল নিরাপত্তাকর্মীদের বসে থাকতে দেখা গেছে। জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ার কারণে অনেক পাম্পের প্রবেশমুখে দড়ি টেনে বা ব্যারিকেড দিয়ে বন্ধ করে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে যেসব পাম্পে সিএনজি পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে গাড়ির ভিড় উপচে পড়েছে। তেলের অভাবে আন্তঃজেলা রুটে চলাচলকারী কয়েকটি মিনিবাসকে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে।

গাজীপুরের খাঁপাড়া রোড সংলগ্ন এশিয়া ফিলিং স্টেশনের সামনে বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বেসরকারি চাকরিজীবী কামরুল হাসান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সকাল থেকে ৪টা পাম্প ঘুরলাম, কোথাও এক লিটার তেলও পেলাম না। অফিসে যাব কীভাবে বুঝতে পারছি না। এখনই এই অবস্থা হলে সামনের দিনগুলোতে কি হবে বুঝতে পারছি না।

গাড়িতে তেল নিতে আসা আরিফ আহমেদ নামের আরেক ব্যক্তি বলেন, এমন অবস্থা হলে রাস্তায় আর গাড়ি বের করা সম্ভব হবে না। এখন যে গ্যারেজে যাব সেই তেলটুকুও নেই। এখানে এসে দেখি তেল নাই বোর্ড ঝুলছে। এখন গাড়ি রাস্তায় ফেলে রাখা ছাড়া উপায় নেই।

বিজ্ঞাপন

পাম্পের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি ফিলিং স্টেশনের নিরাপত্তাকর্মী বলেন, গত কয়েকদিন থেকেই মানুষের ভিড় সামলাতে হিমশিম খেয়েছি। সবাই ড্রাম ভরে তেল নিতে চাচ্ছিল। গতকালই আমাদের স্টক শেষ হয়ে গেছে। এখন আমাদের কাজ শুধু মানুষকে নেই বলে বিদায় করা।

জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটের মধ্যেও রাজধানীর বিমানবন্দরসহ কয়েকটি এলাকায় দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। ওই এলাকার মাত্র দুটি ফিলিং স্টেশনে তেল মজুত থাকায় সেখানে হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন শত শত চালক। তবে চাহিদার তুলনায় জোগান কম থাকায় পাম্প কর্তৃপক্ষ সরকার নির্দেশিত ‘রেশনিং’ বা লিমিটেড পরিমাণে তেল সরবরাহ করছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, এই দুই পাম্পকে কেন্দ্র করে বিমানবন্দর সড়কে তৈরি হয়েছে যানবাহনের বিশাল জটলা। তেলের আশায় অপেক্ষা করছেন কমপক্ষে ২০০-৩০০ চালক। পাম্প দুটির প্রবেশমুখে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন নিরাপত্তাকর্মীরা।

বিজ্ঞাপন

সোহরাব হোসেন নামের এক প্রাইভেটকার চালক বলেন, সারা শহর ঘুরে কোথাও তেল পাইনি, এখানে এসে শুনলাম তেল দিচ্ছে। লাইনে দাঁড়িয়েছি দুই ঘণ্টা হলো, গাড়ি কখন পাম্পের মুখে পৌঁছাবে জানি না।

অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দেশে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সংকট এড়াতে আজ রোববার (৮ মার্চ) থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে রেশনিং পদ্ধতিতে তেল বিক্রি শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। নির্দিষ্ট যানবাহনের ধরন অনুযায়ী তেলের পরিমাণ নির্ধারণ করে দিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। এর আগে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এবং প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এই নতুন পদ্ধতির বিষয়ে ফিলিং স্টেশনগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করেন।

বিজ্ঞাপন

বিপিসির প্রকাশিত নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, একটি মোটরসাইকেল দিনে সর্বোচ্চ ২ লিটার পেট্রোল বা অকটেন সংগ্রহ করতে পারবে। ব্যক্তিগত গাড়ির (কার) ক্ষেত্রে এই সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ লিটার। এছাড়া স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিক্যাল (এসইউভি) বা জিপ এবং মাইক্রোবাসের জন্য দৈনিক ২০ থেকে ২৫ লিটার তেল বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

পরিবহন খাতে ব্যবহৃত ডিজেল সরবরাহেও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। স্থানীয় রুটে চলাচলকারী বাস বা পিকআপ ভ্যান দৈনিক ৭০ থেকে ৮০ লিটার ডিজেল নিতে পারবে। অন্যদিকে দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান বা কনটেইনারবাহী লরির জন্য প্রতিদিন ২০০ থেকে ২২০ লিটার ডিজেল সরবরাহের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।

সরকার জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে এই রেশনিং পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। এতে দেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং অপ্রয়োজনীয় মজুত বা অপচয় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD