ডিজেল সংকটে থমকে যেতে পারে মশা নিধন কার্যক্রম, ভোগান্তিতে নগরবাসী

রাজধানী ঢাকায় সাম্প্রতিক সময়ে মশার উপদ্রব এমন মাত্রায় পৌঁছেছে যে নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবন প্রায় দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। দিন-রাতের পার্থক্য না রেখে ঘর, অফিস কিংবা রাস্তাঘাট—সবখানেই মশার আক্রমণে মানুষ অতিষ্ঠ। দীর্ঘদিন ধরে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর সাফল্য দেখাতে পারেনি দুই সিটি কর্পোরেশন। এরই মধ্যে নতুন করে দেখা দিয়েছে জ্বালানি সংকট, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বিজ্ঞাপন
মশা নিধনের অন্যতম প্রধান পদ্ধতি ‘ফগিং’ কার্যক্রম এখন হুমকির মুখে। এই কার্যক্রম পরিচালনায় বিপুল পরিমাণ ডিজেল প্রয়োজন হয়। কিন্তু বাজারে ডিজেলের ঘাটতির কারণে এই কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে নগরবাসীর উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের জন্য প্রায় সাড়ে তিন লাখ লিটার এবং দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের জন্য দুই লাখ লিটার ডিজেলের জরুরি প্রয়োজন রয়েছে। এই জ্বালানি সংগ্রহে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন দপ্তরে চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে সরবরাহ নিশ্চিত না হলে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
কীটনাশক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, মশা মারার ওষুধ প্রস্তুতে ব্যবহৃত ডিজেল এখন পাওয়া যাচ্ছে না বললেই চলে। ফলে ফগিং কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলে মশার বিস্তার অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই রসিকতার সুরে বলছেন, সামনে হয়তো মশারই ‘স্বর্ণযুগ’ আসছে।
অন্যদিকে, গত এক দশকে মশা নিধনে বিপুল অর্থ ব্যয় করেও প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায়নি। এই সময়ে দুই সিটি কর্পোরেশন মিলিয়ে প্রায় ৮৩০ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরেও বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৫৪ কোটি টাকা। এত বড় অঙ্কের ব্যয়ের পরও মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
মশা দমনে নানা পরীক্ষামূলক উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। ড্রোন ব্যবহার করে মশার অবস্থান শনাক্ত, জলাশয়ে ব্যাঙ, হাঁস, তেলাপিয়া ও গাপ্পি মাছ ছাড়ার মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু এসব পদ্ধতি বাস্তবে কার্যকর ফল দিতে পারেনি।
বিজ্ঞাপন
বর্তমানে দুই সিটি কর্পোরেশনেই কীটনাশকের মজুত সীমিত পর্যায়ে রয়েছে। উত্তর সিটিতে প্রতিদিন প্রায় ১১০০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়, যা দিয়ে সীমিত সময় পর্যন্ত কার্যক্রম চালানো সম্ভব। দক্ষিণ সিটিতেও একই অবস্থা বিরাজ করছে। জরুরি ভিত্তিতে ডিজেল সরবরাহ না পেলে চলতি মাসের পর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইতোমধ্যে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে, ম্যালাথিয়ন প্রস্তুতের প্রধান উপাদানই হচ্ছে ডিজেল। এটি মোট উপাদানের প্রায় ৯০ শতাংশের বেশি। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহে বিধিনিষেধ থাকায় প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সংগ্রহে তারা ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে নির্ধারিত সময়ে কীটনাশক সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে, নগরবাসীর দুর্ভোগ আরও বাড়িয়েছে তদারকির ঘাটতি। প্রায় দেড় বছর ধরে সিটি কর্পোরেশনগুলোতে নির্বাচিত ওয়ার্ড কাউন্সিলর না থাকায় কার্যক্রমে সমন্বয় ও নজরদারি কমে গেছে। ফলে মশা নিধন কার্যক্রমও ধীরগতির হয়ে পড়েছে।
বিজ্ঞাপন
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন, নিয়মিত ওষুধ ছিটানো দেখা যায় না। অনেকেই বাধ্য হয়ে দিনেও কয়েল ব্যবহার করছেন বা মশারির ভেতরে থাকছেন। বিশেষ করে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে অভিভাবকরা উদ্বিগ্ন।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আশাবাদী। তারা বলছেন, মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যক্রম আরও জোরদার করা হচ্ছে এবং জ্বালানি সংকট দ্রুত সমাধানের চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে নাগরিকদেরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে—নিজ নিজ আশপাশ পরিষ্কার না রাখলে শুধুমাত্র ওষুধ প্রয়োগ করে মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।
বিজ্ঞাপন
বিশেষজ্ঞদের মতে, মশা নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। প্রশাসনের পাশাপাশি জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া এ সমস্যা সমাধান করা কঠিন।
সব মিলিয়ে, ডিজেল সংকটের সমাধান না হলে রাজধানীতে মশার উপদ্রব আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে—এমন আশঙ্কাই এখন সামনে এসেছে। নগরবাসী তাই দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের প্রত্যাশায় রয়েছে।








