Logo

শূন্য প্রায় ৫ লাখ সরকারি চাকরির পদ, তবু বাড়ছে বেকারত্ব

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৮ এপ্রিল, ২০২৬, ১৭:৫৭
শূন্য প্রায় ৫ লাখ সরকারি চাকরির পদ, তবু বাড়ছে বেকারত্ব
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের কর্মসংস্থান পরিস্থিতিতে স্পষ্ট হয়ে উঠছে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য—সরকারি খাতে বিপুলসংখ্যক পদ দীর্ঘদিন খালি পড়ে থাকলেও বেকার মানুষের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষ করে শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে চাকরির অভাব উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা নিয়ে নীতিনির্ধারক ও অর্থনীতিবিদদের মধ্যে আলোচনা বাড়ছে।

বিজ্ঞাপন

সংসদে উপস্থাপিত সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে মোট ৪ লাখ ৬৮ হাজার ২২০টি সরকারি পদ শূন্য রয়েছে। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারী এক সংসদীয় প্রশ্নের জবাবে এ তথ্য জানান, যা ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত হালনাগাদ।

পদগুলোর গ্রেডভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, উচ্চ ও মধ্যম স্তরের পাশাপাশি নিম্নস্তরেও বড় ধরনের শূন্যতা রয়েছে। গ্রেড ১ থেকে ৯ পর্যন্ত ৬৮ হাজার ৮৮৪টি, গ্রেড ১০ থেকে ১২ পর্যন্ত ১ লাখ ২৯ হাজার ১৬৬টি, গ্রেড ১৩ থেকে ১৬ পর্যন্ত ১ লাখ ৪৬ হাজার ৭৯৯টি এবং গ্রেড ১৭ থেকে ২০ পর্যন্ত ১ লাখ ১৫ হাজার ২৩৫টি পদ খালি রয়েছে। এছাড়া অন্যান্য শ্রেণিতে আরও ৮ হাজারের বেশি পদ পূরণ হয়নি।

বিজ্ঞাপন

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রেড ১৩ থেকে ২০—যা মূলত মাঠপর্যায়ের সেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট—এই স্তরে সবচেয়ে বেশি শূন্যতা থাকায় স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও স্থানীয় প্রশাসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে সেবার মান ব্যাহত হচ্ছে।

সরকার শূন্য পদ পূরণে ধাপে ধাপে নিয়োগের পরিকল্পনা নিয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আওতায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে কয়েক হাজার পদ পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে সব মন্ত্রণালয়কে শূন্য পদের তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, নতুন পদ সৃষ্টি ও অবসরজনিত শূন্যতা পূরণের মধ্যে ভারসাম্য না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে পদগুলো খালি থেকে যাচ্ছে। এছাড়া রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নানা কারণে নিয়োগ প্রক্রিয়া ধীরগতির হওয়াও একটি বড় কারণ।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে, বেকারত্বের হারও বাড়ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষ প্রান্তিকে বেকারত্বের হার দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৬৩ শতাংশে, এবং মোট বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৭ লাখ ৩০ হাজার। এক বছরের ব্যবধানে বেকারের সংখ্যা বেড়েছে কয়েক লাখ।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বাস্তব পরিস্থিতি আরও জটিল। অনেকেই আংশিক বা অস্থায়ী কাজে যুক্ত থাকলেও স্থায়ী কর্মসংস্থানের অভাবে তাদের প্রকৃত অর্থে বেকার হিসেবেই ধরা উচিত।

এ প্রসঙ্গে বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারি চাকরিতে নিয়োগের গতি বাড়ানো গেলে তা শুধু প্রশাসনিক কার্যক্রমকে গতিশীল করবে না, বরং লাখো মানুষের জীবিকায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন জানিয়েছে, নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুততর করতে ইতোমধ্যে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আগে যেখানে একটি নিয়োগ সম্পন্ন করতে তিন বছরের বেশি সময় লাগত, এখন তা এক বছরের মধ্যে আনার চেষ্টা চলছে। ভবিষ্যতে এই সময় আরও কমিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে চাকরিপ্রার্থীদের অভিযোগ, দীর্ঘসূত্রতা ও অনিশ্চয়তা তাদের মানসিক চাপ বাড়াচ্ছে। তারা চান, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির সঙ্গেই নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করা হোক, যাতে পুরো প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়।

বিজ্ঞাপন

সরকারি চাকরিতে মেধাভিত্তিক নিয়োগ জোরদার করার পাশাপাশি পরীক্ষাপদ্ধতিতেও পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মুখস্থনির্ভর মূল্যায়নের বদলে দক্ষতা ও বিশ্লেষণী ক্ষমতার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

সার্বিকভাবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দীর্ঘদিন শূন্য পদ পড়ে থাকা যেমন প্রশাসনিক দক্ষতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, তেমনি বাড়তে থাকা বেকারত্ব দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। সরকারি চাকরির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং বেসরকারি খাতে সীমিত কর্মসংস্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

প্রায় পাঁচ লাখ শূন্য সরকারি পদের বিপরীতে বিপুলসংখ্যক বেকার মানুষের উপস্থিতি দেশের শ্রমবাজারে গভীর অসামঞ্জস্যের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে দ্রুত নিয়োগ, কার্যকর পরিকল্পনা এবং সমন্বিত নীতিগত সংস্কারের ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD