Logo

শহীদদের স্বপ্ন বৃথা যেতে দেব না: সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
৩০ এপ্রিল, ২০২৬, ২০:২৩
শহীদদের স্বপ্ন বৃথা যেতে দেব না: সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
ছবি: সংগৃহীত

দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, গুমের আতঙ্ক, নির্বাসনের যন্ত্রণা এবং স্বজনহারা পরিবারের অসহনীয় বেদনার অভিজ্ঞতা থেকে শোষণমুক্ত ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেছেন, গুম হওয়া মানুষ আর কখনো ফিরে না আসার যে শোক, তা তিনি নিজের জীবন-অভিজ্ঞতা দিয়ে উপলব্ধি করেছেন। শহীদদের রক্ত, জনগণের আত্মত্যাগ এবং দীর্ঘ গণতান্ত্রিক সংগ্রামের যে বিজয়, তা কোনোভাবেই ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না।

বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।

আবেগঘন বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ ১৯ বছরের রাজনৈতিক লড়াই তার ব্যক্তিজীবনকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে সাড়ে নয় বছরের নির্বাসন, বিদেশে কাটানো অনিশ্চিত সময় এবং কারাজীবনের অভিজ্ঞতা তাকে রাষ্ট্র, রাজনীতি ও মানুষের কষ্টকে নতুনভাবে বুঝতে শিখিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, গুম হওয়া নেতাকর্মীদের পরিবারের আর্তনাদ কেবল রাজনৈতিক পরিসংখ্যান নয়, এটি একেকটি ভেঙে পড়া পরিবারের ইতিহাস।

নিখোঁজ বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর পরিবারের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এমন বহু সন্তান আজও প্রতিদিন দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে, এই আশায়— তাদের বাবা হয়তো একদিন ফিরে আসবেন। কিন্তু সেই প্রতীক্ষা আর শেষ হয় না।

বিজ্ঞাপন

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এই অশ্রু, এই দীর্ঘ প্রতীক্ষা এবং এই বেদনার মর্যাদা দিতে হলে এমন একটি রাষ্ট্র গড়তে হবে, যেখানে আর কোনো মানুষ গুম হবে না, কাউকে অন্যায়ভাবে নিখোঁজ হতে হবে না, কারও অধিকার কেড়ে নেওয়া হবে না। ২০২৬ সালের নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত হতে হবে বৈষম্যহীন, জবাবদিহিমূলক এবং ন্যায়বিচারভিত্তিক।

তিনি সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, শহীদদের আত্মত্যাগকে অর্থবহ করতে হলে রাষ্ট্রকে এমন জায়গায় নিতে হবে, যেখানে মানুষের ভোট, অধিকার ও মর্যাদা নিরাপদ থাকবে।

বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং বীর মুক্তিযোদ্ধার রাষ্ট্রীয় সংজ্ঞা নিয়েও কথা বলেন। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় সহযোগী রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে যারা লড়েছেন, তারাই বীর মুক্তিযোদ্ধা। এই সংজ্ঞা এখন সংসদীয় আইনে প্রতিষ্ঠিত। ফলে এ জাতীয় প্রশ্নে নতুন করে বিভ্রান্তি তৈরির কোনো সুযোগ নেই।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে দ্ব্যর্থক অবস্থান গ্রহণকারীদের উচিত জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের সম্মান রক্ষা করা। যারা দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রেখেছেন, ইতিহাসের আকাশে তারা নক্ষত্র হয়ে আছেন— তাদের মর্যাদা নিয়ে বিতর্ক জাতির জন্য অসম্মানের।

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন ও নির্বাচন প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ২০২৪ সালের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থান কোনো বিচ্ছিন্ন বা আকস্মিক ঘটনা নয়; এটি দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের স্বাভাবিক পরিণতি। ছাত্র-জনতা, রাজনৈতিক দল এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণে দেশে ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটেছে।

তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মূল্যায়ন অনুযায়ী বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচন আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। নির্বাচন নিয়ে নানা অভিযোগ থাকলেও বিশ্ব সম্প্রদায় কোনো প্রকার প্রকৌশলী কারসাজির প্রমাণ খুঁজে পায়নি বলেও দাবি করেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, যারা এই গণরায়কে খাটো করতে চান, তারা মূলত শহীদদের আত্মত্যাগ ও জনগণের সংগ্রামকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছেন।

সংবিধান সংস্কার ও জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে চলমান বিতর্কের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিএনপি কখনোই জুলাই জাতীয় সনদের মূল চেতনা থেকে সরে যায়নি। বরং দলটি সবসময় জনগণের সার্বভৌমত্ব, রাজনৈতিক জবাবদিহি এবং গণতান্ত্রিক সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

তিনি বলেন, সংবিধানের মৌলিক কাঠামো কোনো অধ্যাদেশ বা প্রশাসনিক আদেশে পরিবর্তন করা যায় না। এ ধরনের বড় পরিবর্তনের জন্য জনগণের প্রত্যক্ষ মতামত প্রয়োজন। এ কারণেই বিএনপি গণভোটের প্রস্তাব দিয়েছিল।

বিজ্ঞাপন

জাতীয় সনদকে পাশ কাটিয়ে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠনের উদ্যোগকে তিনি প্রতারণামূলক বলে আখ্যা দেন। তার দাবি, রাজনৈতিক ঐকমত্য ছাড়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এমন উদ্যোগ সাংবিধানিক প্রশ্ন তৈরি করেছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সংসদকে উপেক্ষা করে বাইরে থেকে সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ রাষ্ট্রের আইনগত কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, সংসদীয় কমিটিতে আলোচনা না এনে বিকল্প প্রক্রিয়ায় সংবিধান সংস্কারের চেষ্টা কেন করা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

তিনি আরও বলেন, বিরোধী দল সংবিধান সংশোধন কমিটির জন্য প্রতিনিধি না দিলেও সংসদের বাইরে সংস্কার নিয়ে সক্রিয়। অথচ এই প্রক্রিয়ার সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে স্পষ্ট প্রশ্ন রয়েছে।

সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদ উল্লেখ করে তিনি বলেন, গণভোট ছাড়াই ‘ব্লু পেপার’-এ শপথ ফরম তৈরি এবং সংস্কার কাঠামো দাঁড় করানো সংবিধানের সরাসরি লঙ্ঘন। রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন স্তরে ধারাবাহিকভাবে সাংবিধানিক ব্যত্যয় ঘটছে।

বিজ্ঞাপন

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও আইনি জটিলতা নিরসনে সংবিধান সংস্কার জরুরি। তার মতে, পঞ্চদশ সংশোধনীর অনেক বিতর্কিত ধারা এখনো বহাল রয়েছে, যা রাষ্ট্রের মূল আদর্শ ও জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

তিনি বলেন, প্রজাতন্ত্রের প্রকৃত মালিক জনগণ। তাদের আকাঙ্ক্ষা, অধিকার ও ভবিষ্যৎ বিবেচনায় একটি আধুনিক, ভারসাম্যপূর্ণ ও ভবিষ্যতমুখী সংবিধান প্রণয়ন করতে হলে সব পক্ষকে সংসদীয় প্রক্রিয়ায় আসতেই হবে।

বক্তব্যের শেষাংশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিএনপির ইতিহাস বহুদলীয় গণতন্ত্র, সংসদীয় রাজনীতি এবং রাষ্ট্রীয় ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার ইতিহাস।

বিজ্ঞাপন

তিনি জানান, দেশনায়ক তারেক রহমানের নেতৃত্বে পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাষ্ট্র সংস্কারের যে রূপরেখা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বাস্তবায়নে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ।

একইসঙ্গে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাকস্বাধীনতার নামে অপব্যবহার, বিদ্বেষ ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে আনার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD