ট্রলার থেকে লঞ্চে যাত্রী ওঠানামা বন্ধ, থাকবে কঠোর নজরদারি

আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে নৌপথে যাত্রী চলাচল নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল করতে একগুচ্ছ কঠোর নির্দেশনা জারি করেছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, চলন্ত কিংবা ঘাটে নোঙর করা কোনো লঞ্চে আর ট্রলার বা নৌকা থেকে সরাসরি যাত্রী ওঠানামা করা যাবে না। একই সঙ্গে সদরঘাটসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ নৌটার্মিনালগুলোতে সার্বক্ষণিক নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
সম্প্রতি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে ঈদযাত্রা উপলক্ষে আয়োজিত প্রস্তুতিমূলক সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
সভা সূত্রে জানা গেছে, এখন থেকে শুধু বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) নির্ধারিত টার্মিনাল পন্টুন ব্যবহার করেই যাত্রী ওঠানামা করা যাবে। সদরঘাটে নোঙর করা লঞ্চের পাশ বা পেছন দিয়ে কিংবা নদীর মাঝপথে ট্রলার বা নৌকা ব্যবহার করে যাত্রী পরিবহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে নৌপুলিশ ও কোস্টগার্ডকে দিন-রাত নিরবচ্ছিন্নভাবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সদরঘাটে স্থাপিত সিসিটিভি ক্যামেরা ও কন্ট্রোল রুমের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে। কোনো লঞ্চ নিয়ম ভঙ্গ করলে তাৎক্ষণিকভাবে সেই লঞ্চের যাত্রা বাতিল এবং মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
গত ১৮ মার্চ সদরঘাটে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পরই মূলত এ কঠোর অবস্থান নেয় মন্ত্রণালয়। ওইদিন পন্টুনে থাকা ‘এমভি আসা-যাওয়া–৫’ লঞ্চে অবৈধভাবে ট্রলারের মাধ্যমে যাত্রী ওঠানোর সময় ‘এমভি জাকির সম্রাট–৩’ নামের আরেকটি লঞ্চ ধাক্কা দিলে দুই লঞ্চের মাঝখানে পড়ে বাবা ও ছেলে নিহত হন। ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
এ ধরনের দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে এবার ঈদযাত্রায় বিশেষ সতর্কতা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
বিজ্ঞাপন
সদরঘাটের বিপরীত পাশে কেরানীগঞ্জ এলাকা থেকে ট্রলার ভিড়িয়ে যাত্রী ওঠানামা বন্ধে নৌপুলিশ, কোস্টগার্ড ও জেলা পুলিশ যৌথভাবে অভিযান চালাবে। একই সঙ্গে ট্রলার থেকে যাত্রী ওঠানামার জন্য বিআইডব্লিউটিএ নির্মিত নির্ধারিত নতুন ট্রলার ঘাট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ বিষয়ে ট্রলারচালকদের সচেতন করতে প্রচার কার্যক্রমও চালানো হবে।
ঈদযাত্রায় যাত্রীদের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে সদরঘাট টার্মিনালকে হকার ও ক্যানভাসারমুক্ত রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। টার্মিনাল গেট, জেটি ও পন্টুন এলাকায় আনসার, কমিউনিটি পুলিশ ও নৌপুলিশের সমন্বয়ে বিশেষ রোস্টার ডিউটি চালু থাকবে।
এ ছাড়া কন্ট্রোল রুমের অনুমতি ছাড়া কোনো লঞ্চ ঘাটে প্রবেশ বা বার্থিং করতে পারবে না। অনুমোদিত লঞ্চগুলোকে নির্ধারিত নিয়ম মেনে সুশৃঙ্খলভাবে ঘাটে ভিড়তে হবে। নিয়ম ভাঙলে যাত্রা বাতিলসহ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিজ্ঞাপন
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, ছাদে যাত্রী তোলা কিংবা সিরিয়াল ভঙ্গ করলে সংশ্লিষ্ট লঞ্চের লাইসেন্স বাতিল করা হবে। প্রতিটি যাত্রীবাহী লঞ্চে কমপক্ষে চারজন আনসার সদস্য মোতায়েন থাকবে এবং তাদের ভাতা লঞ্চমালিকদের বহন করতে হবে।
এ ছাড়া সরকার নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করলেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
ঈদযাত্রায় রাতের বেলা স্পিডবোট চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে। দিনের বেলায় চলাচলের সময় চালক ও যাত্রী সবার জন্য লাইফ জ্যাকেট পরা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাশাপাশি সদরঘাট এলাকায় ডিঙি নৌকা চলাচল এবং নৌচ্যানেলে মাছ ধরার জাল ফেলা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
ঈদের আগে-পরে নদীপথে চাপ কমাতে ২৩ মে থেকে ২ জুন পর্যন্ত বাল্কহেড ও বালুবাহী সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। একই সময়ে বালুমহাল থেকে বালু উত্তোলন বন্ধ রাখতে জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নদীপথে যাত্রীর চাপ কমাতে রাজধানীর বসিলা ব্রিজসংলগ্ন বসিলা ঘাট এবং পূর্বাচল কাঞ্চন ব্রিজসংলগ্ন শিমুলিয়া ঘাট থেকে নতুন লঞ্চ সার্ভিস চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এসব নতুন রুট সম্পর্কে যাত্রীদের জানাতে প্রচার কার্যক্রমও চালানো হবে।
বিজ্ঞাপন
টার্মিনাল এলাকায় পর্যাপ্ত ডাস্টবিন স্থাপন, মাইকিংয়ের মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নদী বা পন্টুনে আবর্জনা ফেলা ঠেকাতে স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিটি নৌযানে নিরাপত্তা বয়া ও শনাক্তকরণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।
এ ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ নৌচ্যানেলগুলো চিহ্নিত করে দৃশ্যমান মার্কিং স্থাপনেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সভায় নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, ঈদে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা যেন নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক ও শৃঙ্খলাপূর্ণ হয় সেটিই সরকারের মূল লক্ষ্য। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার আরও কঠোর ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
বিজ্ঞাপন
তিনি আরও বলেন, কোনো অবস্থাতেই ট্রলার বা নৌকা দিয়ে যাত্রী লঞ্চে ওঠানামা করতে পারবেন না এবং নদীর মাঝপথে বাল্কহেড রাখা যাবে না। এ বিষয়ে নৌপুলিশ ও কোস্টগার্ডকে কঠোর তদারকির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।








