চীনের ‘বিশেষ কূটনৈতিক অগ্রাধিকার’ পাচ্ছেন তারেক রহমান!

বাংলাদেশের নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর ঢাকা ও বেইজিংয়ের মধ্যকার রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত কয়েক মাসে দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের একাধিক সফর অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় চলতি জুন মাসের শেষ সপ্তাহে চীন সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, যা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
সফরসূচি অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২১ ও ২২ জুন মালয়েশিয়া সফর করবেন। এরপর ২৩ জুন কুয়ালালামপুর থেকে সরাসরি বেইজিংয়ে পৌঁছে ২৬ জুন পর্যন্ত চীন সফর করবেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই তার দ্বিতীয় বিদেশ সফর এবং চীনের সঙ্গে নতুন সরকারের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নির্ধারণে এটি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, সফরের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো— প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে পৃথক আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেবেন। সাধারণত বিদেশি সরকারপ্রধানদের ক্ষেত্রে চীনের একজন শীর্ষ নেতার সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক এবং অন্যজনের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ঘটছে। দুই শীর্ষ নেতার সঙ্গেই পূর্ণাঙ্গ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সুযোগ পাওয়া কূটনৈতিক অঙ্গনে বিশেষ গুরুত্বের বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, এই সফরে ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা, অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নানা বিষয়ে আলোচনা হবে। ইতোমধ্যে সফরের প্রস্তুতি হিসেবে বেইজিং সফর করেছেন পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম। তিনি চীনের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী হুয়া চুনইংয়ের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তি, সমঝোতা স্মারক এবং সফরের কর্মসূচি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
কূটনৈতিক মহলের তথ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে একাধিক সমঝোতা স্মারক ও গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে। সফরের ঠিক আগে দুই দেশের আলোচনার মাধ্যমে এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, চীন বাংলাদেশের নতুন সরকারকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। কারণ, শুধু রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সম্পর্ক নয়, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতির ক্ষেত্রেও বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখছে বেইজিং।
বিজ্ঞাপন
সফরের আলোচ্যসূচিতে রাজনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়গুলো সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি, জ্বালানি খাতে সহযোগিতা, চীনা শিল্পকারখানা বাংলাদেশে স্থানান্তর, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল সক্রিয় করা, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন, মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন এবং চট্টগ্রামের সঙ্গে চীনের বিভিন্ন শহরের সরাসরি বিমান যোগাযোগ চালুর প্রস্তাব উত্থাপন করা হতে পারে।
এছাড়া বিশ্বের বৃহত্তম আঞ্চলিক বাণিজ্য জোট আরসিইপি, ব্রিকস এবং সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও)-এ বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ নিয়েও চীনের সমর্থন চাইবে ঢাকা। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক কাঠামোতে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করার লক্ষ্যে এসব বিষয়ে আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
সফরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ঘোষিত বিভিন্ন বৈশ্বিক উদ্যোগ নিয়েও আলোচনা হতে পারে। গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ, গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভ, গ্লোবাল সিভিলাইজেশন ইনিশিয়েটিভ এবং গ্লোবাল গভর্নেন্স ইনিশিয়েটিভ— এই চার উদ্যোগের মধ্যে অন্তত একটি বা একাধিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। সফর চলাকালে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক অগ্রগতির ঘোষণা আসতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
পাশাপাশি প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়ও আলোচনায় আসতে পারে। বিশেষ করে পূর্ববর্তী সরকারের সময় চীনের তৈরি যুদ্ধবিমান কেনার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেটিও দুই পক্ষের আলোচনায় স্থান পেতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফর শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি বৃহত্তর আঞ্চলিক ভূরাজনীতির সঙ্গেও জড়িত। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত-চীন প্রতিযোগিতা, যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের পরিবর্তিত বাস্তবতা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পুনর্বিন্যাসের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থানও গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
সাবেক রাষ্ট্রদূত মাশফি বিনতে শামসের মতে, বর্তমান বিশ্বরাজনীতিতে চীনের প্রভাব ক্রমাগত বাড়ছে। ফলে বাংলাদেশের জন্য চীনা বিনিয়োগ, বাজার এবং সরবরাহ ব্যবস্থা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, যেকোনো আন্তর্জাতিক উদ্যোগে অংশগ্রহণের আগে জাতীয় স্বার্থ ও সম্ভাব্য লাভ-ক্ষতির বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফর ভারত, যুক্তরাষ্ট্রসহ বাংলাদেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার দেশগুলোরও নজরে থাকবে। তবে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়া উচিত বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থ রক্ষা। সে লক্ষ্যেই ঢাকাকে ভারসাম্যপূর্ণ ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের দুই শীর্ষ নেতার সঙ্গে পৃথক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সুযোগ পাওয়ার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়েছে যে বেইজিং বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে আগ্রহী। ফলে জুনের শেষ সপ্তাহের এই সফর শুধু কূটনৈতিক সৌজন্য বিনিময়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং আগামী কয়েক বছরের বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের ভিত্তি রচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।








