জাতিসংঘে বাংলাদেশের পরবর্তী স্থায়ী প্রতিনিধি কে এই আইরিন খান?

বাংলাদেশের পরবর্তী স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে নিউইয়র্কে জাতিসংঘে দায়িত্ব পালন করতে যাচ্ছেন আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত মানবাধিকারকর্মী আইরিন খান। সরকার এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে। বর্তমান স্থায়ী প্রতিনিধি সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরীর স্থলাভিষিক্ত হবেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
জানা গেছে, আগামী সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের নতুন অধিবেশন শুরুর আগেই আইরিন খান তার নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারেন। তার নিয়োগকে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অঙ্গনে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার, আইনের শাসন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে দীর্ঘদিনের কাজের অভিজ্ঞতা এই দায়িত্ব পালনে বিশেষ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমানে আইরিন খান জাতিসংঘের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সুরক্ষাবিষয়ক বিশেষ র্যাপোর্টিয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০২০ সালের ১ আগস্ট থেকে তিনি এ দায়িত্বে রয়েছেন।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ১৯৯৩ সালে এই বিশেষ র্যাপোর্টিয়ারের পদ চালুর পর প্রথম নারী হিসেবে তিনি এই দায়িত্ব লাভ করেন। দায়িত্ব পালনের সময় তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, মানবাধিকার এবং নাগরিক অধিকারসংক্রান্ত নানা বিষয়ে কাজ করেছেন।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
এ ছাড়া তিনি বর্তমানে সুইজারল্যান্ডের জেনেভাভিত্তিক গ্র্যাজুয়েট ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজে শিক্ষকতা করছেন। মানবাধিকার ও দারিদ্র্য বিষয়ে তার গবেষণা ও লেখালেখিও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত। তিনি ‘দ্য আনহার্ড ট্রুথ: পভার্টি অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস’ গ্রন্থের সহলেখক। বইটি বিশ্বের সাতটি ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ইতিহাসেও আইরিন খানের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ২০০১ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত তিনি সংস্থাটির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং প্রথম নারী হিসেবে এই নেতৃত্বের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার সময়েই অ্যামনেস্টি রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকারের পাশাপাশি অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার রক্ষার বিষয়গুলোকে আরও গুরুত্ব দেয়। একই সময়ে নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে সংস্থাটির প্রথম বৈশ্বিক প্রচারণাও শুরু হয়েছিল তার নেতৃত্বে।
পরবর্তীতে ২০১২ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তিনি ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ল অর্গানাইজেশন (আইডিএলও)-এর মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং টেকসই উন্নয়নকে কেন্দ্র করে কাজ করা এই আন্তসরকারি সংস্থাটিতে দায়িত্ব পালনকালে তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলন ও উদ্যোগের নেতৃত্ব দিয়েছেন। বিশেষ করে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি)-১৬ বাস্তবায়ন, বিচারপ্রাপ্তির সুযোগ বৃদ্ধি এবং কার্যকর প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার বিষয়ে তার অবদান উল্লেখযোগ্য।
বিজ্ঞাপন
গণমাধ্যমের সঙ্গেও দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন আইরিন খান। ২০১০ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত তিনি ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার-এর কনসাল্টিং এডিটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় তিনি মানবাধিকার, গণতন্ত্র, নারী-পুরুষের সমতা এবং স্বাধীন সাংবাদিকতা বিষয়ে বিভিন্ন উদ্যোগে ভূমিকা রাখেন।
শিক্ষা ও গবেষণাক্ষেত্রেও রয়েছে তার সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা। তিনি স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক ল স্কুলে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের স্যালফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর ছিলেন।
তার পেশাজীবনের সূচনা হয়েছিল জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের মাধ্যমে। প্রায় ২১ বছর ধরে সংস্থাটির সদর দপ্তর ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এ সময় ভারতে ইউএনএইচসিআরের মিশনপ্রধান এবং আন্তর্জাতিক সুরক্ষাবিষয়ক বিভাগের উপপরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
বর্তমানে তিনি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন। কলাম্বিয়া গ্লোবাল ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশন প্রোগ্রামের গ্লোবাল ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশন অ্যাওয়ার্ডের জুরি বোর্ডের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অতীতে বিশ্বব্যাংকের জেন্ডার অ্যাডভাইজরি কাউন্সিল, ইউএনএইডসের মানবাধিকারবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের প্যানেল এবং ইউএন গ্লোবাল কমপ্যাক্ট অ্যাডভাইজরি কাউন্সিলেও তিনি সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি যুক্তরাজ্যের ওভারসিজ ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট (ওডিআই), বাংলাদেশের ব্র্যাক এবং উগান্ডার বেয়ারফুট ল-এর পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
মানবাধিকার রক্ষায় অসামান্য অবদানের জন্য তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বহু সম্মাননা অর্জন করেছেন। ২০০৬ সালে মর্যাদাপূর্ণ ‘সিডনি পিস প্রাইজ’সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি।
বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া আইরিন খান উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড ল স্কুলে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার, আইনের শাসন ও বৈশ্বিক কূটনীতিতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি এখন বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক দায়িত্ব পালনের অপেক্ষায় রয়েছেন। তার নিয়োগের মাধ্যমে জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব আরও শক্তিশালী হবে বলে কূটনৈতিক মহলের প্রত্যাশা।








