বন্যা-পাহাড়ধসে ৭ জেলায় বিপর্যয়, পানিবন্দী লাখো মানুষ

টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল এবং একাধিক স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনায় দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি জেলার জনজীবন ভয়াবহভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বন্যার পানিতে ডুবে গেছে হাজার হাজার ঘরবাড়ি, সড়ক, কৃষিজমি ও জনপদ। কোথাও কোথাও পাহাড়ধসে প্রাণহানি ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে।
বিজ্ঞাপন
সর্বশেষ সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এ দুর্যোগে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫১ জনে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে পানিবন্দী হয়ে পড়েছে দুই লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮টি পরিবার এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জনে দাঁড়িয়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ১২ জুলাই দুপুর পর্যন্ত প্রকাশিত পরিস্থিতি প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের মোট ৫৯টি উপজেলা বন্যাকবলিত হয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা এবং খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে এসব এলাকার মানুষ চরম মানবিক দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
চট্টগ্রামের বাঁশখালীর বাহারছড়া ইউনিয়নের বাসিন্দা শেলী আক্তারের পরিবার দুর্যোগের ভয়াবহ বাস্তবতার একটি উদাহরণ। তার মাটির ঘরের ভেতর এখনো হাঁটুসমান পানি। টানা পাঁচ দিন ধরে স্বাভাবিকভাবে ঘুমানোর সুযোগ হয়নি। ছয় সন্তানকে নিয়ে প্লাস্টিকের ঝুড়ি, কাঠের তক্তা ও অস্থায়ী মাচার ওপর বসবাস করছেন তিনি। রান্না, বিশ্রাম কিংবা স্বাভাবিক জীবনযাপন—কোনোটিই সম্ভব হচ্ছে না। ভবিষ্যৎ নিয়েও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি, কারণ নতুন করে ঘর নির্মাণের মতো আর্থিক সামর্থ্যও নেই।
বিজ্ঞাপন
শুধু শেলী আক্তার নন, একই ধরনের অনিশ্চয়তা ও দুর্ভোগে দিন কাটছে চট্টগ্রাম বিভাগের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের লাখো মানুষের। দক্ষিণ চট্টগ্রামের বাঁশখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ, ফটিকছড়ি ও হাটহাজারীর বহু এলাকায় এখনো ঘরের ভেতরে পানি রয়েছে। কোথাও পানি কিছুটা কমলেও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা এখনো শুরু করা সম্ভব হয়নি।
বন্যার কারণে কাঁচা ঘরবাড়ির দেয়াল ধসে পড়েছে, খাদ্যশস্য নষ্ট হয়েছে, গবাদিপশু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অধিকাংশ নলকূপ ডুবে থাকায় বিশুদ্ধ খাবার পানির তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। অনেক পরিবার নিরাপদ পানির অভাবে স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়েছে। রান্নার জ্বালানি ও শুকনো খাবারের সংকটও ক্রমেই প্রকট হচ্ছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এ পর্যন্ত প্রাণ হারানো ৫১ জনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে কক্সবাজারে, যেখানে নিহতের সংখ্যা ২৮। এছাড়া চট্টগ্রামে ১৩ জন, বান্দরবানে ৬ জন, রাঙামাটিতে ৩ জন এবং মৌলভীবাজারে ১ জনের মৃত্যু হয়েছে। বন্যা, পাহাড়ি ঢল এবং পাহাড়ধস মিলিয়ে এসব প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।
বিজ্ঞাপন
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, মৌসুমি বায়ুর সক্রিয় প্রভাবে গত ৫ জুলাই থেকে চট্টগ্রাম অঞ্চলে ভারী বর্ষণ শুরু হয়। ওই সময় থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত চট্টগ্রামে মোট ১ হাজার ৩৫৪ দশমিক ৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। শুধু সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টাতেই বৃষ্টিপাত হয়েছে ১৫১ দশমিক ৭ মিলিমিটার। আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, আগামী দুই থেকে তিন দিনও দেশের বিভিন্ন স্থানে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে, ফলে নতুন করে জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
চট্টগ্রামের পর বন্যা পরিস্থিতি ছড়িয়ে পড়ে সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জে। অতিরিক্ত বৃষ্টি এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বহু মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অর্থাৎ চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিস্থিতি আগামী এক দিনের মধ্যে কিছুটা উন্নতির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সিলেট বিভাগের নিম্নাঞ্চলে বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিভিন্ন গ্রামে সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। অনেক স্থানে সড়ক ভেঙে গেছে, কোথাও আবার সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিছু এলাকায় পানি নামতে শুরু করলেও অন্যত্র নতুন করে পানি বাড়ছে। অনেক মানুষ এখনো নৌকাই একমাত্র যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছেন।
ত্রাণ কার্যক্রমও সব জায়গায় সমানভাবে পৌঁছাতে পারেনি। কিছু এলাকায় প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ত্রাণ বিতরণ করলেও অনেক দুর্গম অঞ্চলের মানুষ এখনো পর্যাপ্ত সহায়তা পাননি। ফলে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ এবং শিশুখাদ্যের সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠছে।
কক্সবাজার জেলার চকরিয়া, পেকুয়া, রামু, মাতামুহুরী এলাকা এবং সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ অংশে এখনো পানি রয়েছে। কোথাও কোথাও বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় নতুন করে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করছে। অনেক পরিবার এখনো নৌকায় চলাচল করছে এবং ঘরে ফিরতে পারেনি।
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে তিন পার্বত্য জেলা বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। পানি নেমে যাওয়ার পর ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র সামনে আসছে। অনেক গ্রামীণ সড়ক ধসে গেছে, বিভিন্ন স্থানে সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জুমচাষ, আমন ও আউশের বীজতলা এবং সবজিক্ষেত ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বান্দরবানে পরিস্থিতি এখনো সবচেয়ে উদ্বেগজনক। যদিও সাঙ্গু নদীর পানি কিছুটা কমেছে, জেলা শহরের বহু এলাকা এখনো জলাবদ্ধ। বান্দরবান-চট্টগ্রাম এবং বান্দরবান-রাঙামাটি সড়কের বিভিন্ন অংশ এখনো পানির নিচে থাকায় যান চলাচল স্বাভাবিক হয়নি।
রাঙামাটির বাঘাইছড়ি, বিলাইছড়ি ও বরকলসহ কয়েকটি উপজেলার নিম্নাঞ্চল থেকে পানি কমতে শুরু করায় কিছু মানুষ আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে বাড়ি ফিরছেন। তবে অনেক পরিবার এখনো নিরাপদ আশ্রয়েই অবস্থান করছে, কারণ তাদের ঘরবাড়ি বসবাসের উপযোগী হয়নি।
বিজ্ঞাপন
খাগড়াছড়ির দীঘিনালা-লংগদু সড়কে পানি সরে যাওয়ায় যান চলাচল পুনরায় শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা অনেক পরিবার ধীরে ধীরে নিজ নিজ বাড়িতে ফিরছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি মেরামত এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রা শুরু করতে সময় লাগবে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
হবিগঞ্জে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার পরিবার এখনো পানিবন্দী। উঁচু এলাকার পানি কিছুটা কমলেও নিম্নাঞ্চলে দুই থেকে আড়াই ফুট পর্যন্ত পানি রয়েছে। মাঝেমধ্যে বৃষ্টি হওয়ায় মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়ছে। কৃষিজমির ফসল নষ্ট হওয়ায় কৃষকদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মৌলভীবাজারের সাত উপজেলার মধ্যে পাঁচটিতে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। সেখানে সাত হাজারের বেশি পরিবার পানিবন্দী। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জেলায় একজনের মৃত্যু হয়েছে।
এদিকে সুনামগঞ্জে টানা বর্ষণ ও উজানের ঢলে নদ-নদী এবং হাওরের পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই ধরনের পরিস্থিতির শঙ্কা তৈরি হয়েছে নেত্রকোনার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলেও, যেখানে নদ-নদীর পানি ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে উত্তরাঞ্চলের কুড়িগ্রামে ধরলা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও দুধকুমার নদে তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। নদীতীরবর্তী মানুষের মধ্যে বসতভিটা হারানোর আতঙ্ক বাড়ছে। অনেক পরিবার ইতোমধ্যে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যশোর জেলার কেশবপুর পৌর এলাকার দুই শতাধিক পরিবারও টানা বর্ষণে পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়ায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে এবং স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত পানি নিষ্কাশন ও প্রয়োজনীয় সহায়তার দাবি জানিয়েছেন।
সামগ্রিকভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক। কোথাও পানি কমলেও বহু এলাকা এখনো বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। আবহাওয়ার পূর্বাভাসে আরও ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকায় নতুন করে বন্যা, পাহাড়ধস ও নদীভাঙনের ঝুঁকি এড়াতে প্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদেরও সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।








