Logo

নানা জটিলতায় ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার, শীর্ষ ৬ নেতার পদত্যাগ

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৩ জুলাই, ২০২৬, ১৫:৫৩
নানা জটিলতায় ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার, শীর্ষ ৬ নেতার পদত্যাগ
ছবি: সংগৃহীত

শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদির প্রতিষ্ঠিত সাংস্কৃতিক সংগঠন ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারকে ঘিরে আর্থিক স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক দায়িত্ব এবং উত্তরাধিকার (ওয়ারিশ) সংক্রান্ত জটিলতা প্রকাশ্যে এসেছে। এই পরিস্থিতিতে সংগঠনটির চেয়ারম্যান, সভাপতি, সহ-সভাপতিসহ শীর্ষ ছয় দায়িত্বশীল একযোগে দায়িত্ব ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় দলিল-দস্তাবেজ যাচাই শেষে সেন্টারের দায়িত্ব দাবিদারদের কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তারা।

বিজ্ঞাপন

তবে প্রতিষ্ঠাতার পরিবারের পক্ষ থেকে ‘ওয়ারিশ সূত্রে সেন্টারের মালিকানা বা দায়িত্ব দাবি’ করার অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করা হয়েছে। পরিবারের সদস্যরা বলছেন, তাদের বিরুদ্ধে ভুল বার্তা ছড়িয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করা হচ্ছে।

ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের বর্তমান পরিস্থিতি এবং উদ্ভূত সংকট সম্পর্কে জানতে প্রতিষ্ঠাতা শরীফ ওসমান বিন হাদির বড় ভাই ওমর বিন হাদির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করতে রাজি হননি। পরিবর্তে তিনি তার বোন মাছুমা হাদির একটি লিখিত বক্তব্য পাঠান।

সেই বক্তব্যে মাছুমা হাদি প্রশ্ন তোলেন, বাংলাদেশের প্রচলিত আইন এবং ইসলামী উত্তরাধিকার বিধান অনুযায়ী তার ভাইয়ের সম্পদের উত্তরাধিকারী হচ্ছেন মা, স্ত্রী ও সন্তান। তাদের মধ্যে কেউই যদি সেন্টারের দায়িত্ব দাবি না করে থাকেন, তাহলে ‘পরিবার ওয়ারিশ হিসেবে সেন্টারের মালিকানা চাইছে’—এমন বক্তব্য কীভাবে সামনে এলো, সে প্রশ্নও তিনি তুলেছেন।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পৃথক ঘোষণার মাধ্যমে দায়িত্ব ছাড়ার সিদ্ধান্ত জানান ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল জাবের, সহ-সভাপতি ফাতিমা তাসনিম জুমা, সভাপতি সালাউদ্দিন শুভ, ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক ফাহিম আব্দুল্লাহ, অর্থ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রায়হান এবং উপ-নির্বাহী পরিচালক হাবিবুল্লাহ মিসবাহ।

সংগঠনের কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে কি না, তা জানতে রাজধানীর বাংলামোটরে অবস্থিত সেন্টারটিতে গিয়ে দেখা যায়, নির্ধারিত সাপ্তাহিক ছুটির দিন ছাড়া নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। লিংক রোডের খোদেজা খাতুন স্কুল গলির একটি ভবনের তৃতীয় তলায় অবস্থিত সেন্টারের প্রবেশপথে নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে। ভেতরে প্রবেশ করলে চোখে পড়ে বইয়ের সংগ্রহ, দেয়ালজুড়ে ক্যালিগ্রাফি, শিল্পকর্ম, প্রতিবাদধর্মী চিত্র এবং জুলাই আন্দোলন ও সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক পোস্টার।

সেন্টারের দায়িত্বে থাকা রাফসান রাকিব জানান, বর্তমানে সব কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে এবং দায়িত্বশীলরাই দায়িত্ব পালন করছেন। ভবিষ্যতে দায়িত্ব কারা গ্রহণ করবেন, সে বিষয়ে এখনই কিছু বলার সুযোগ নেই বলে উল্লেখ করেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

এদিকে চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল জাবের জানান, তিনি বর্তমানে চট্টগ্রামের বন্যাকবলিত এলাকায় অবস্থান করছেন। ঢাকায় ফিরে বিস্তারিত সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সব বিষয়ে ব্যাখ্যা দেওয়া হবে। তিনি বলেন, আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব এখনো তাদের কাছেই রয়েছে।

দায়িত্ব ছাড়ার ঘোষণা দিয়ে দেওয়া নিজের বক্তব্যে আব্দুল্লাহ আল জাবের উল্লেখ করেন, শহীদ ওসমান হাদি জীবিত অবস্থায় ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারকে একটি ট্রাস্টের আওতায় আনার উদ্যোগ নিলেও তা সম্পন্ন করে যেতে পারেননি। তিনি দাবি করেন, শুরু থেকেই প্রতিষ্ঠানটি জনতার আমানত হিসেবে পরিচালনার পরিকল্পনা ছিল। প্রতিষ্ঠাতার মৃত্যুর পর গত ছয় মাস ধরে উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত জটিলতা সমাধানের চেষ্টা করা হলেও পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে ওঠে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠাতার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের স্বার্থে এবং উত্থাপিত দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করে সেন্টারের দায়িত্ব হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

উল্লেখ্য, আব্দুল্লাহ আল জাবের ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিবও। তিনি শরীফ ওসমান হাদির ওপর হামলার ঘটনায় প্রথমে হত্যাচেষ্টা এবং পরে মৃত্যুর পর হত্যা মামলার বাদী ছিলেন।

সংগঠনের সভাপতি সালাউদ্দিন শুভও দায়িত্ব ছাড়ার কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, প্রতিষ্ঠাতার অসমাপ্ত সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। দায়িত্ব পালনের সময় সাংস্কৃতিক কার্যক্রম সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও অভ্যন্তরীণ নানা জটিলতা এবং দীর্ঘদিনের মানসিক চাপের কারণে দায়িত্ব পালন কঠিন হয়ে পড়ে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারকে জনতার সম্পদ হিসেবে পরিচালনার লক্ষ্য থেকেই বিভিন্ন সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায়, যেখানে কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া আর সম্ভব হচ্ছিল না।

বিজ্ঞাপন

সংগঠন-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, মূল বিরোধের সূত্রপাত হয় আর্থিক হিসাব-নিকাশের স্বচ্ছতা নিয়ে। প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়, অনুদান, বিভিন্ন খাতে ব্যয় এবং আর্থিক লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ জানতে চাওয়ার পর থেকেই মতবিরোধ বাড়তে থাকে। বিশেষ করে প্রতিষ্ঠাতার পরিবারের পক্ষ থেকে আর্থিক তথ্য জানতে আগ্রহ প্রকাশের পর দুই পক্ষের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

সহ-সভাপতি ফাতিমা তাসনিম জুমাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে উল্লেখ করেন, প্রতিষ্ঠাতার মৃত্যুর পর থেকেই উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত জটিলতা সামনে আসে এবং সেই পরিস্থিতি সংগঠনের কার্যক্রমকে প্রভাবিত করে।

অন্যদিকে প্রতিষ্ঠাতার বোন মাছুমা হাদি এসব বক্তব্যের কঠোর প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, দায়িত্বশীলরা পদত্যাগ করবেন কি না, সেটি তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের দায় পরিবারের ওপর চাপিয়ে ‘ওয়ারিশের দাবি’ প্রসঙ্গ সামনে আনা সত্যের অপব্যাখ্যা।

বিজ্ঞাপন

তার দাবি, পরিবারের কেউ কখনো ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার দাবি করেননি। বরং তিনি নিজে চেয়েছিলেন তার ভাইয়ের স্মৃতি সংরক্ষণ, কবর স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ, নামফলক স্থাপন এবং তাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে শহীদের স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগে সহযোগিতা করতে। কিন্তু এ বিষয়ে সেন্টারের দায়িত্বশীলদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাননি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

মাছুমা হাদি আরও জানান, তিনি কখনো সংগঠনের কোনো পদ বা দায়িত্ব চাননি। তার একমাত্র ইচ্ছা ছিল প্রতিষ্ঠাতার আদর্শ ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থেকে কাজ করা। কিন্তু দায়িত্বশীলদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তিনি সাড়া পাননি বলে দাবি করেন।

তিনি বলেন, কোরবানির ঈদের সময় সেন্টারের কয়েকজন সদস্য তার সঙ্গে দেখা করে পুনরায় সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তখন তিনি তাদের বলেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে কোনো দায়িত্ব চান না; শুধু চান প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠাতার আদর্শ অনুযায়ী পরিচালিত হোক। এরপরও হঠাৎ পরিবারের ওপর দায় চাপিয়ে পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়ায় তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন।

বিজ্ঞাপন

মাছুমা হাদি আরও দাবি করেন, প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই ওমর বিন হাদি সেন্টারের দায়িত্বশীলদের একজন ছিলেন। সেই সূত্রে ব্যাংক হিসাবের নমিনি হিসেবেও তার নাম রয়েছে। প্রয়োজন হলে তার সঙ্গে আলোচনা করেই প্রশাসনিক জটিলতার সমাধান করা যেত। কিন্তু তা না করে পরিবারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলার যৌক্তিকতা তিনি খুঁজে পাচ্ছেন না।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে প্রতিষ্ঠিত ইনকিলাব মঞ্চের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন শরীফ ওসমান বিন হাদি। তার উদ্যোগেই গড়ে ওঠে ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার, যা ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন, সাংস্কৃতিক চর্চা, বই প্রকাশনা, শিল্পকর্ম এবং নতুন বাংলাদেশ গঠনের ভাবনা নিয়ে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে দ্রুত পরিচিতি লাভ করে।

তবে প্রতিষ্ঠাতার মৃত্যুর পর প্রতিষ্ঠানটির সাংগঠনিক কাঠামো, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে, তা এখন প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। ফলে ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের ভবিষ্যৎ পরিচালনা এবং নেতৃত্বের প্রশ্নে কী সিদ্ধান্ত আসে, সেদিকেই এখন নজর সংশ্লিষ্টদের।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD