জুলাই কার, এই বিতর্ক করলে জুলাই কারও থাকবে না

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কৃতিত্ব নিয়ে বিভাজন তৈরি না করার আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, জুলাই কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর একক অর্জন নয়; দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রাম, গুম, খুন, নির্যাতন ও আত্মত্যাগের ধারাবাহিকতায় এ গণঅভ্যুত্থান সফল হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
বুধবার (৫ আগস্ট) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা’ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এসব কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, স্বৈরাচারী শাসনের কবল থেকে মুক্ত হওয়ার পর যদি ‘জুলাই কার’—এ নিয়ে বিতর্ক শুরু করা হয়, তাহলে শেষ পর্যন্ত জুলাই কারও থাকবে না। এ ধরনের বিভাজনের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
তিনি বলেন, বিশ্বের অনেক জাতি স্বাধীনতার জন্য শত বছর সংগ্রাম করেও সফল হয়নি। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে অল্প সময়ের মধ্যেই শতাব্দীর পরিবর্তন ঘটে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানও তেমনই একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তন। তাই এর অর্জনকে দলীয় পরিচয়ে সীমাবদ্ধ না করে মূল আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
নিজের গুম হওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিরোধী রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা গুম, হত্যা, হামলা ও মামলার শিকার হয়েছেন। তিনি জানান, মীর কাসেম আলী তাকে দেশে না ফিরলে তার ছেলেকে ধরে নেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি নিজেও গ্রেপ্তার হন এবং তার ছেলেকেও আটক করা হয়। এ ঘটনাকে তিনি স্বৈরাচারী শাসনের একটি ‘জ্বলন্ত ইতিহাস’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জুলাইয়ের আন্দোলনকে শুধু ৩৬ দিনের ঘটনাপ্রবাহ হিসেবে দেখলে এর পূর্ণ ইতিহাস জানা সম্ভব নয়। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের ধারাবাহিকতাও এর সঙ্গে যুক্ত।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পথ বন্ধ থাকায় আন্দোলন একপর্যায়ে রক্তাক্ত হয়ে ওঠে। বিএনপি, ছাত্রদল, যুবদলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী এবং অসংখ্য পরিবার এ সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইলিয়াস আলীর মতো অনেকে গুম হওয়ার পর আর ফিরে আসেননি। এসব ত্যাগকে বাদ দিয়ে শুধু জুলাইয়ের ৩৬ দিন বিবেচনা করলে আন্দোলনের প্রকৃত ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
আন্দোলন অহিংস না সহিংস হবে, তা সাধারণ মানুষ বা কোনো একক ব্যক্তি নির্ধারণ করে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিকভাবে আন্দোলনের সুযোগ বন্ধ করে দেওয়া হলে তা একপর্যায়ে সহিংস ও রক্তাক্ত রূপ নিতে পারে। বাংলাদেশেও দীর্ঘদিনের দমন-পীড়নের কারণে জুলাইয়ের আন্দোলন রক্তাক্ত হয়েছে।
বক্তব্যে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও ত্যাগের কথাও তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে খালেদা জিয়া ত্যাগ স্বীকার করেছেন এবং সন্তান হারিয়েও আপসহীন অবস্থানে ছিলেন।
বিজ্ঞাপন
জুলাই জাতীয় সনদের প্রতিটি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যকর করতে সংবিধান সংশোধন জরুরি। এ জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য প্রয়োজন এবং সংশোধন প্রক্রিয়ায় সবাইকে অংশগ্রহণ করতে হবে।
তিনি বলেন, সংস্কার পরিষদ বা জাতীয় সংস্কার পরিষদ—নাম যাই হোক, বাস্তবে সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হলে সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন। সংসদে সংশোধনী গ্রহণের মাধ্যমেই সংস্কার কার্যকর করা সম্ভব।
গুম প্রতিরোধে পৃথক আইন প্রণয়নের উদ্যোগের কথাও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, গুমসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হবে। একই সঙ্গে জুলাইয়ে আহতদের ক্ষতির মাত্রা অনুযায়ী শ্রেণিভিত্তিক সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি যারা এখনো তালিকাভুক্ত হননি, তাদেরও তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
বিজ্ঞাপন
আহতদের মধ্যে যারা কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে সক্ষম এবং যারা গুরুতর আহত হয়ে আর কাজ করতে পারবেন না, তাদের আলাদাভাবে বিবেচনার কথাও বলেন তিনি। শহীদ পরিবার ও আহতদের বাস্তব ক্ষতির মাত্রা বিবেচনায় ক, খ ও গ শ্রেণিতে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাব দেন।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
আওয়ামী লীগের বিচার প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, কোনো ব্যক্তি মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকলে যেমন বিচারের মুখোমুখি হতে পারেন, তেমনি কোনো রাজনৈতিক দলও আইনের আওতায় আসতে পারে। তবে নির্বাহী আদেশে কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার পক্ষে তিনি নন। এ বিষয়ে আদালতই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে আর কোনোভাবেই ফ্যাসিবাদের উত্থান হতে দেওয়া যাবে না। ভবিষ্যতে কোনো সরকার যাতে ফ্যাসিবাদী আচরণ করতে না পারে, সে জন্য জুলাই জাদুঘরকে ‘জীবন্ত ইতিহাস’ হিসেবে রাখা হয়েছে। সেখানে গিয়ে অতীতের ঘটনাগুলো থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বক্তব্যের শেষ দিকে তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অর্জন ও আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করাই এখন সবার দায়িত্ব। জুলাই কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর নয়; এটি বাংলাদেশের মানুষের সম্মিলিত অর্জন।








