আজ থেকে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত জুলাই স্মৃতি জাদুঘর

রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে প্রতিষ্ঠিত জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর আজ (৬ আগস্ট) থেকে সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত হচ্ছে। দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাস, জুলাই আন্দোলনের নানা স্মৃতি, শহীদদের ব্যক্তিগত ব্যবহৃত সামগ্রী, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র এবং ডিজিটাল প্রদর্শনীর সমন্বয়ে গড়ে তোলা এই জাদুঘর ঘিরে সাধারণ মানুষের আগ্রহ ইতোমধ্যেই তুঙ্গে পৌঁছেছে।
বিজ্ঞাপন
এর আগে বুধবার (৫ আগস্ট) সকালে জাদুঘরটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। উদ্বোধনের পরদিন দর্শনার্থীদের জন্য বরাদ্দ প্রথম দিনের ৯০০টি টিকিট বিকেল ৪টার আগেই শেষ হয়ে যায়, যা জাদুঘরটি নিয়ে মানুষের ব্যাপক আগ্রহেরই প্রতিফলন।
প্রতিদিন প্রবেশ করতে পারবেন ৯০০ দর্শনার্থী
জাদুঘর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৯০০ জন দর্শনার্থী মূল ভবনে প্রবেশের সুযোগ পাবেন। তিনটি নির্ধারিত সময়ে প্রতিবার ৩০০ জন করে প্রবেশ করতে পারবেন।
বিজ্ঞাপন
দর্শনার্থীদের জন্য সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে— সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা, দুপুর ১টা থেকে বিকেল ৩টা এবং বিকেল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, টিকিটে উল্লেখিত নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রবেশ করতে হবে। অনলাইনের পাশাপাশি জাদুঘরের কাউন্টার থেকেও টিকিট সংগ্রহের সুযোগ রয়েছে।
টিকিটের মূল্য
বিজ্ঞাপন
জাদুঘরে প্রবেশের জন্য প্রাপ্তবয়স্কদের টিকিটের মূল্য ৫০ টাকা এবং শিশুদের জন্য ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট সময়ের টিকিট শেষ হয়ে গেলে দর্শনার্থীদের পরবর্তী দিনের খালি স্লট নির্বাচন করতে হবে।
জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ইবনে ওয়াহাব জানিয়েছেন, দর্শনার্থীদের চাপ সামাল দেওয়া এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতেই শুরুতে সীমিত সংখ্যক প্রবেশের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
উদ্বোধনের দিন যা ঘটেছিল
বিজ্ঞাপন
উদ্বোধনের প্রথম দিনটি শুধুমাত্র জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের পরিবারের সদস্যদের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছিল বলে আগেই জানানো হয়েছিল।
তবে উদ্বোধনের দিন টানা বৃষ্টির মধ্যেও বিপুলসংখ্যক মানুষ জাদুঘরের সামনে জড়ো হন। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও প্রবেশের সুযোগ না পেয়ে একপর্যায়ে কিছু জুলাইযোদ্ধা, আহত আন্দোলনকারী এবং শহীদ পরিবারের সদস্যরা ফটকের তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। পরে আরও অনেকে সেখানে প্রবেশ করে বিভিন্ন স্লোগান দেন।
জাদুঘরে কী কী দেখবেন দর্শনার্থীরা?
বিজ্ঞাপন
একসময় দেশের প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন হিসেবে পরিচিত গণভবন এখন রূপ নিয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে। প্রায় ১৭ একর জায়গাজুড়ে নির্মিত এই জাদুঘরে জুলাই আন্দোলন, গণতান্ত্রিক সংগ্রাম এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের নানা নিদর্শন সংরক্ষণ করা হয়েছে।
প্রধান ফটক দিয়ে প্রবেশ করলেই লাল ইটের পথের দুই পাশে বিভিন্ন ফলজ গাছ দর্শনার্থীদের স্বাগত জানাবে। পথের পাশেই রয়েছে 'গণতন্ত্রের পথে দীর্ঘ যাত্রা' শীর্ষক প্রদর্শনী, যেখানে স্বাধীনতার পর থেকে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনাগুলো ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
জুলাই স্মৃতিসৌধ
বিজ্ঞাপন
জাদুঘরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ 'জুলাই স্মৃতিসৌধ'। সাদা মার্বেল পাথরে নির্মিত বৃত্তাকার এই স্মৃতিফলকে আন্দোলনে নিহতদের নাম সংরক্ষণ করা হয়েছে। ভেতরের অংশ প্রতীকী কবরস্থানের আদলে নির্মিত হয়েছে, যা দর্শনার্থীদের জন্য বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র।
আন্দোলনের নানা প্রতীকী ভাস্কর্য
জাদুঘরের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে রয়েছে আন্দোলনের বিভিন্ন ঘটনার প্রতীকী ভাস্কর্য। এর মধ্যে গুলিবিদ্ধ মানুষের প্রতিরূপ, সাঁজোয়া যানে ঝুলন্ত আন্দোলনকারী, সাইকেলে মিছিলে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী, পিলখানা হত্যাকাণ্ড, শাপলা চত্বরের ঘটনা, গুমের অভিযোগ এবং নারী আন্দোলনকারীদের স্মরণে নির্মিত শিল্পকর্ম বিশেষভাবে নজর কাড়বে।
বিজ্ঞাপন
প্রতীকী ‘আয়নাঘর’
জাদুঘরের দক্ষিণ পাশে তৈরি করা হয়েছে আলোচিত 'আয়নাঘর'-এর আদলে একটি প্রতীকী কক্ষ। এখানে গুমের অভিযোগে ব্যবহৃত বন্দিশালার পরিবেশ তুলে ধরা হয়েছে, যাতে দর্শনার্থীরা সেই সময়কার বাস্তবতা সম্পর্কে ধারণা নিতে পারেন।
সংরক্ষিত রয়েছে বৈঠককক্ষ
বিজ্ঞাপন
দোতলা ভবনের নিচতলায় রয়েছে বিভিন্ন আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, দলিল, নথি ও আন্দোলনভিত্তিক প্রদর্শনী। এছাড়া সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বৈঠককক্ষও আগের অবস্থায় সংরক্ষণ করা হয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের সময় কক্ষটির যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল, তা অক্ষত রাখতে পুরো মেঝে বিশেষ কাচ দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে।
শহীদদের ব্যক্তিগত স্মারক
দ্বিতীয় তলায় সংরক্ষণ করা হয়েছে জুলাই আন্দোলনের শহীদদের ব্যবহৃত পোশাক, বই, খাতা, খেলাধুলার সামগ্রীসহ বিভিন্ন ব্যক্তিগত স্মারক। সেখানে শহীদ আবু ইসাহাকের রক্তমাখা পোশাকও প্রদর্শনের জন্য রাখা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
এছাড়া দিনভিত্তিক আন্দোলনের ঘটনাপঞ্জি, ঐতিহাসিক আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, গুরুত্বপূর্ণ দলিল, শিল্পকর্ম এবং বিশাল ডিজিটাল স্ক্রিনে জুলাই আন্দোলনের বিভিন্ন দৃশ্য দেখার ব্যবস্থা রয়েছে। বিভিন্ন কক্ষে পোস্টার, সূচিকর্ম, ভাস্কর্য এবং নারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণসহ আন্দোলনের বিভিন্ন অধ্যায়ও তুলে ধরা হয়েছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস, স্মৃতি ও প্রামাণ্য উপকরণ একসঙ্গে দেখার সুযোগ তৈরি হওয়ায় নতুন এই জাদুঘরটি ইতিহাস-অনুরাগী, গবেষক, শিক্ষার্থী এবং সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণ হয়ে উঠবে বলে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা।








