কারাগারে দুর্ধর্ষ আসামিদের আলাদা রাখা যাচ্ছে না: কারা মহাপরিদর্শক

দেশের কারাগারগুলোতে ধারণক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি বন্দি অবস্থান করছেন। প্রায় ৪৫ হাজার বন্দির ধারণক্ষমতার বিপরীতে বর্তমানে কারাগারগুলোতে বন্দির সংখ্যা প্রায় ৯৮ হাজার। অতিরিক্ত বন্দির চাপের কারণে দুর্ধর্ষ আসামিদের অন্য বন্দিদের থেকে আলাদা করে রাখাও কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন।
বিজ্ঞাপন
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) কারা অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দেশের কারাগারগুলোর সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন কারা মহাপরিদর্শক।
তিনি জানান, দেশে বর্তমানে ৬০টি জেলা কারাগার ও ১৫টি কেন্দ্রীয় কারাগার রয়েছে। এসব কারাগারের মোট বন্দি ধারণক্ষমতা প্রায় ৪৫ হাজার। কিন্তু এর বিপরীতে বন্দির সংখ্যা প্রায় ৯৮ হাজার। ফলে স্বাভাবিক ব্যবস্থাপনার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।
দুর্ধর্ষ আসামিদের আলাদা রাখার সুযোগ সীমিত
বিজ্ঞাপন
কারা মহাপরিদর্শক বলেন, কারাগারগুলোর ধারণক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক দুর্ধর্ষ আসামিকে আলাদা করে রাখার সুযোগ হচ্ছে না। অতিরিক্ত বন্দির চাপের কারণে বিভিন্ন শ্রেণির বন্দিদের পৃথক রাখার ক্ষেত্রে বাস্তব সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
তিনি আরও জানান, কিছু দুর্বলতার কারণে সাধারণ বন্দিরা হয়তো কারাগারে জঙ্গিদের সংস্পর্শে এসেছে। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কারা কর্তৃপক্ষ কাজ করছে এবং এ ধরনের ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
কারাগারের ভেতরে বন্দিদের শ্রেণিবিন্যাস ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত জায়গার অভাব যে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে, তাঁর বক্তব্যে সেটিই উঠে আসে।
বিজ্ঞাপন
কারাগারে বন্দির মৃত্যু নিয়ে বক্তব্য
গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন কারাবন্দি অবস্থায় মারা গেছেন। এসব মৃত্যুর ঘটনায় মৃতদের স্বজন ও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে কারাগারে নির্যাতনের অভিযোগ তোলা হয়েছে।
এ বিষয়ে কারা মহাপরিদর্শক বলেন, কারা কর্তৃপক্ষের কোনো গাফিলতি নেই। বর্তমানে ১২২ জন বন্দি কারাগারের বাইরে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলেও জানান তিনি।
বিজ্ঞাপন
কারাগারে বন্দিদের চিকিৎসাসেবার বিষয়ে তিনি জানান, ২০২৫ সালে কারাগারে ১৮৭ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছর এখন পর্যন্ত ১২২ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে। একই সঙ্গে কারাগারগুলোতে চিকিৎসকের ঘাটতি রয়েছে বলেও স্বীকার করেন তিনি।
কারা কর্তৃপক্ষের সামনে বন্দিদের বিপুল চাপের পাশাপাশি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাও একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
কারাগারে মোবাইল ব্যবহারে ছাড় নেই
বিজ্ঞাপন
কারাগারে নিষিদ্ধ কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত কোনো বন্দি মোবাইল ফোন ব্যবহার করে বাইরে যোগাযোগ করছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে কারা মহাপরিদর্শক বলেন, বন্দিরা মোবাইল ফোন ব্যবহার করছে না—এমন শতভাগ নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব নয়। তবে মোবাইল ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হচ্ছে না।
তিনি জানান, গত এক বছরে দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে তিন হাজারের বেশি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়েছে। সময়ের সঙ্গে কারাগারে মোবাইল ব্যবহারের ঘটনা কমে আসছে বলেও দাবি করেন তিনি।
কারাগারে মোবাইল ফোনের অবৈধ ব্যবহার বন্ধে নজরদারি ও তল্লাশি কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে বলে জানান কারা কর্তৃপক্ষের এই শীর্ষ কর্মকর্তা।
বিজ্ঞাপন
কারাগারে ৩৭৯ বিদেশি বন্দি
দেশের বিভিন্ন কারাগারে বর্তমানে ৩৭৯ জন বিদেশি বন্দি রয়েছেন বলেও সংবাদ সম্মেলনে জানান কারা মহাপরিদর্শক। তাঁদের মধ্যে ১৭০ জনের সাজা শেষ হয়েছে। তবে নিজ নিজ দেশে ফেরার প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়ায় সাজা শেষ হওয়ার পরও তাঁরা কারাগারে অবস্থান করছেন।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
সাজা শেষ করা বিদেশি বন্দিদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে সংশ্লিষ্ট দূতাবাস ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে যোগাযোগ করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। তাঁদের দেশে ফেরানোর ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, পরিচয় নিশ্চিতকরণ এবং সংশ্লিষ্ট দেশের সহযোগিতার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।
বিদেশি বন্দিদের মরদেহ সংরক্ষণ
বিজ্ঞাপন
বিদেশি বন্দিদের মৃত্যুর পর মরদেহ নিজ দেশে পাঠানোর বিষয়েও কারা কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম তুলে ধরেন কারা মহাপরিদর্শক।
তিনি জানান, গত দুই বছরে বিদেশি বন্দিদের প্রায় ১৭টি মরদেহের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে দুটি মরদেহ ভারতে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়েছে।
বিদেশি বন্দিদের মরদেহ সর্বোচ্চ তিন মাস পর্যন্ত সংরক্ষণ করা হয়। বর্তমানে তিনটি মরদেহ হিমাগারে সংরক্ষিত রয়েছে বলেও জানান তিনি।
বিজ্ঞাপন
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো পরিবার বা সংশ্লিষ্ট বিদেশি প্রতিনিধি মরদেহ গ্রহণ করতে না এলে ডিএনএ নমুনা সংরক্ষণ করা হবে। এরপর প্রচলিত বিধি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান কারা মহাপরিদর্শক।
কারাগারে ধারণক্ষমতার তুলনায় দ্বিগুণের বেশি বন্দি থাকার কারণে নিরাপত্তা, পৃথকীকরণ, চিকিৎসা ও সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় যে চাপ তৈরি হয়েছে, সংবাদ সম্মেলনে কারা মহাপরিদর্শকের বক্তব্যে তার একটি সামগ্রিক চিত্র উঠে এসেছে।








