রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কতটুকু, কি রয়েছে সংবিধানে?

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান এবং পদমর্যাদায় দেশের সর্বোচ্চ ব্যক্তি। আইন প্রণয়ন, বিচার বিভাগ, সংসদ, সশস্ত্র বাহিনী ও রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন কার্যক্রমে তার গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ভূমিকা রয়েছে। তবে সংসদীয় সরকারব্যবস্থার কারণে রাষ্ট্রপতি সরকারপ্রধান নন। সরকারের নির্বাহী ক্ষমতার মূল দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভার হাতে।
বিজ্ঞাপন
তাই রাষ্ট্রপতির পদমর্যাদা সর্বোচ্চ হলেও সরকারের দৈনন্দিন নির্বাহী সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্র রাষ্ট্রপতির কার্যালয় নয়। সংবিধানে রাষ্ট্রপতির জন্য যেসব ক্ষমতা ও দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে, সেগুলোর বড় অংশই নির্দিষ্ট সাংবিধানিক প্রক্রিয়া ও প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শের সঙ্গে যুক্ত।
কীভাবে নির্বাচিত হন রাষ্ট্রপতি?
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন না। জাতীয় সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। সংবিধান অনুযায়ী তার মেয়াদ পাঁচ বছর এবং একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
বিজ্ঞাপন
রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালনকালে অন্য কোনো লাভজনক সরকারি পদে অধিষ্ঠিত হতে পারেন না। রাষ্ট্রীয় প্রটোকল ও সাংবিধানিক কাঠামোয় রাষ্ট্রপতির অবস্থান সবার ওপরে হলেও বাস্তব নির্বাহী ক্ষমতার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা বেশি।
প্রধানমন্ত্রী নিয়োগে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা
রাষ্ট্রপতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ। সংসদ নির্বাচনের পর যে সংসদ সদস্যকে সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদ সদস্যের সমর্থন রয়েছে বলে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রতীয়মান হয়, তাকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করা হয়।
বিজ্ঞাপন
একক কোনো দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন না করলে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন কার রয়েছে, তা নির্ধারণে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির নিজস্ব সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে। তবে সরকারের অন্যান্য অধিকাংশ কার্যক্রমে রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে হয়।
মন্ত্রী নিয়োগসহ অন্যান্য দায়িত্ব
বিজ্ঞাপন
প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী নিয়োগসহ বিভিন্ন সাংবিধানিক কার্যক্রম সম্পন্ন করেন। ফলে অনেক সরকারি কার্যক্রম রাষ্ট্রপতির নামে সম্পাদিত হলেও এর নেপথ্যে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন সরকারের পরামর্শ থাকে।
অর্থাৎ রাষ্ট্রপতির নামে নির্বাহী কাজ সম্পন্ন হলেও সংসদীয় ব্যবস্থায় সরকারের প্রকৃত নির্বাহী কর্তৃত্ব প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভার কাছেই থাকে।
দণ্ড মওকুফের বিশেষ ক্ষমতা
বিজ্ঞাপন
রাষ্ট্রপতির অন্যতম আলোচিত ক্ষমতা হলো দণ্ড মার্জনা, স্থগিত, হ্রাস বা পরিবর্তনের ক্ষমতা। সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা অন্য কর্তৃপক্ষের দেওয়া দণ্ডের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি ক্ষমা প্রদর্শন, দণ্ড স্থগিত বা কমাতে পারেন।
এটি রাষ্ট্রপতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ সাংবিধানিক ক্ষমতা হিসেবে বিবেচিত হয়।
রাষ্ট্রপতির দায়মুক্তি
বিজ্ঞাপন
রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সংবিধানে বিশেষ দায়মুক্তির ব্যবস্থা রয়েছে। তার কার্যকাল চলাকালে তার বিরুদ্ধে কোনো আদালতে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা যায় না। তাকে গ্রেপ্তার বা কারাগারে পাঠানোর জন্য আদালতের পরোয়ানাও জারি করা যায় না।
তবে এর অর্থ এই নয় যে রাষ্ট্রপতি অপসারণের ঊর্ধ্বে। সংবিধান লঙ্ঘন বা গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগে সংসদীয় প্রক্রিয়ায় তাকে অভিশংসন করা সম্ভব। শারীরিক বা মানসিক অসামর্থ্যের কারণেও তাকে পদ থেকে সরানোর সাংবিধানিক ব্যবস্থা রয়েছে।
অভিশংসনের ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের স্বাক্ষরযুক্ত অভিযোগ স্পিকারের কাছে জমা দেওয়ার বিধান রয়েছে। রাষ্ট্রপতিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়ার পর সংসদের মোট সদস্যের কমপক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে প্রস্তাব পাস হলে তার পদ শূন্য হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে রাষ্ট্রপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর ঘটনা এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। ২০০২ সালে তার বিরুদ্ধে অভিশংসনের উদ্যোগ নেওয়ার প্রেক্ষাপটে তিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
সংসদের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির সম্পর্ক
সংসদের অধিবেশন আহ্বান, স্থগিত এবং নির্দিষ্ট সাংবিধানিক পরিস্থিতিতে সংসদ ভেঙে দেওয়ার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা রয়েছে। তবে এসব ক্ষমতা সংবিধানের নির্ধারিত বিধান এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর লিখিত পরামর্শের অধীন।
বিজ্ঞাপন
রাষ্ট্রপতি সংসদে ভাষণ দিতে পারেন এবং সংসদের কাছে বার্তা পাঠানোরও সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে।
কোনো বিল সংসদে পাস হওয়ার পর তা আইনে পরিণত করতে রাষ্ট্রপতির সম্মতির প্রয়োজন হয়। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তিনি কোনো বিল পুনর্বিবেচনার জন্য সংসদে ফেরত পাঠাতে পারেন। সংসদ পুনরায় বিলটি পাস করলে সংবিধানের বিধান অনুযায়ী পরবর্তী প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
সংসদ না থাকলে অধ্যাদেশ জারি
বিজ্ঞাপন
সংসদ ভেঙে গেলে বা অধিবেশন না থাকলে এবং তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন হলে রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন। তবে এই ক্ষমতা সীমাহীন নয়। সংবিধানে অধ্যাদেশ জারির জন্য নির্দিষ্ট শর্ত ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
মূলত সংসদীয় আইন প্রণয়নের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া কার্যকর না থাকলে বিশেষ পরিস্থিতিতে সাময়িক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সাংবিধানিক সুযোগ হিসেবেই এই ক্ষমতা ব্যবহৃত হয়।
বিচার বিভাগের সঙ্গে সম্পর্ক
বিজ্ঞাপন
বিচার বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ রাষ্ট্রপতির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলোর একটি।
তবে রাষ্ট্রপতি আদালতের বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করেন না। বিচার বিভাগ নিজস্ব সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে স্বাধীনভাবে বিচারিক দায়িত্ব পালন করে। রাষ্ট্রপতির ভূমিকা মূলত সংবিধান ও আইনে নির্ধারিত নিয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট আনুষ্ঠানিক সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ।
সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি প্রতিরক্ষা বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর সাংবিধানিক সর্বাধিনায়ক হিসেবে রাষ্ট্রপতির অবস্থান রয়েছে।
তবে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা নীতির বাস্তব পরিচালনা সরকারের নির্বাহী কাঠামোর মধ্যেই সম্পন্ন হয়। ফলে সর্বাধিনায়ক হিসেবে রাষ্ট্রপতির অবস্থান সাংবিধানিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও দৈনন্দিন প্রতিরক্ষা প্রশাসনের নির্বাহী কর্তৃত্ব সরকারের কাছেই থাকে।
রাষ্ট্রপতির অনুপস্থিতিতে দায়িত্ব কে পালন করেন?
রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে অথবা কোনো কারণে তিনি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় সংসদের স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব নেওয়া কিংবা রাষ্ট্রপতি পুনরায় দায়িত্ব পালনে সক্ষম হওয়া পর্যন্ত এই ব্যবস্থা কার্যকর থাকে।
রাষ্ট্রপতির বেতন ও সুযোগ-সুবিধা
রাষ্ট্রপতির বেতন ও আর্থিক সুযোগ-সুবিধা সংশ্লিষ্ট আইন দ্বারা নির্ধারিত। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে রাষ্ট্রপতির মাসিক বেতন ১ লাখ ২০ হাজার টাকা এবং এই বেতন আয়করমুক্ত। রাষ্ট্রপতির আপ্যায়নসহ বিভিন্ন সরকারি সুযোগ-সুবিধারও বিধান রয়েছে।
তাহলে রাষ্ট্রপতির আসল ক্ষমতা কতটুকু?
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিকে শুধু আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দেখলে তার সাংবিধানিক ভূমিকার পুরোটা বোঝা যায় না। প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ, প্রধান বিচারপতি নিয়োগ, দণ্ড মওকুফ, আইন অনুমোদন, সংসদ-সংক্রান্ত বিভিন্ন সাংবিধানিক কার্যক্রম, অধ্যাদেশ জারি এবং সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে রাষ্ট্রপতির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে।
তবে একই সঙ্গে সংসদীয় সরকারব্যবস্থার মৌলিক কাঠামোটি মনে রাখা জরুরি। রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রপ্রধান, কিন্তু সরকারপ্রধান নন। সরকারের নির্বাহী ক্ষমতা মূলত প্রধানমন্ত্রী ও তার নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভা প্রয়োগ করে।
ফলে রাষ্ট্রপতির পদমর্যাদা দেশের সর্বোচ্চ হলেও তার বাস্তব নির্বাহী ক্ষমতা সংবিধান দ্বারা নির্ধারিত এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শনির্ভর। তবে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগের মতো কিছু ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির নিজস্ব সাংবিধানিক ক্ষমতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।








