কারাগার-আন্দোলন পেরিয়ে রাষ্ট্রপতির মসনদে মির্জা ফখরুল

ঠাকুরগাঁওয়ের পৌর চেয়ারম্যান থেকে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ রাষ্ট্রপতি—দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পাড়ি দিয়ে এবার সেই দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। চার দশকের বেশি সময়ের রাজনৈতিক জীবনে আন্দোলন, কারাবরণ, নির্যাতন ও নানা সংকট মোকাবিলা করেও দলের নেতৃত্বে সক্রিয় থেকেছেন এই বর্ষীয়ান রাজনীতিক।
বিজ্ঞাপন
উত্তরাঞ্চলের ঠাকুরগাঁওয়ের মির্জা পরিবারের সন্তান মির্জা ফখরুল কর্মজীবন শুরু করেন শিক্ষকতা দিয়ে। পরে রাজনীতিতে যুক্ত হন তিনি। আশির দশকে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পাশাপাশি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। ১৯৯০ সালে বিএনপিতে যোগ দেওয়ার পর স্থানীয় রাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে নিজের অবস্থান তৈরি করেন।
পাঁচবারের সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী মির্জা ফখরুল বিএনপির বিভিন্ন সংকটময় সময়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১১ সালে বিএনপির মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান। পরে ২০১৬ সালে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে একাধিকবার কারাবরণ ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন মির্জা ফখরুল। তিনি নিজেই ১১ বার কারাবরণের কথা জানিয়েছেন। তবে এসব প্রতিকূলতা তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে থামাতে পারেনি। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারাবন্দিত্ব এবং দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশের বাইরে থাকার সময়ও দলকে সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি।
গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে বিএনপির বিভিন্ন আন্দোলনেও সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন মির্জা ফখরুল। রাজনৈতিক সংকট ও প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও নেতাকর্মীদের সংগঠিত রাখার চেষ্টা করেছেন তিনি।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রক্রিয়াতেও মির্জা ফখরুল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পরবর্তী সময়ে ২০২৬ সালের নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করলে তাকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) মন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়।
বিজ্ঞাপন
দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার পর এবার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন মির্জা ফখরুল। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে তিনি ২৫৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিরোধী জোটের প্রার্থী ও এলডিপির সভাপতি অলি আহমদ, যিনি পেয়েছেন ৮৮ ভোট।
প্রায় সাড়ে তিন দশক পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বৃহস্পতিবার দুপুর ২টায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। শুরুতে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনরত স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল ভোট দেন। পরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, রাষ্ট্রপতি প্রার্থী মির্জা ফখরুল, বিরোধীদলীয় নেতাসহ সংসদ সদস্যরা ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন।
বিকেল ৫টায় ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর শুরু হয় গণনা। জাতীয় সংসদের ৩৪৯ জন ভোটারের মধ্যে ৩৪৩টি বৈধ ভোট পড়ে। এর মধ্যে মির্জা ফখরুল ২৫৫ ভোট এবং অলি আহমদ ৮৮ ভোট পান। ছয়টি ব্যালট অব্যবহৃত ছিল। বিভিন্ন ত্রুটির কারণে চারটি ব্যালট নিয়ম অনুযায়ী প্রতিস্থাপন করা হয়।
বিজ্ঞাপন
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ সদস্যরা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভোট দিতে পারেন না। সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় মির্জা ফখরুলের জয় অনেকটাই প্রত্যাশিত ছিল। ভোটের ফলেও তার প্রতিফলন দেখা যায়।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
ফলাফল ঘোষণার পর প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত ঘোষণা করেন। পরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান লাল গোলাপ দিয়ে নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে অভিনন্দন জানান। বিরোধীদলীয় নেতাসহ অন্য সংসদ সদস্যরাও তাকে শুভেচ্ছা জানান।
বিজ্ঞাপন
শুক্রবার (২১ আগস্ট) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বঙ্গভবনে দেশের নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের শপথ নেওয়ার কথা রয়েছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, নেতৃত্বগুণ ও প্রজ্ঞাকে কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে তিনি কীভাবে দায়িত্ব পালন করেন, এখন সেদিকেই তাকিয়ে দেশের মানুষ।








