Logo

রোহিঙ্গা সংকটের ৯ বছর : প্রত্যাবাসনেই সমাধান দেখছেন আশ্রিতরা

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
কক্সবাজার
২৪ আগস্ট, ২০২৬, ১৩:০৬
রোহিঙ্গা সংকটের ৯ বছর : প্রত্যাবাসনেই সমাধান দেখছেন আশ্রিতরা
ছবি: সংগৃহীত

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইনে সামরিক নিপীড়ন ও সহিংসতার মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ঢল শুরুর পর কেটে গেছে নয় বছর। দীর্ঘ এই সময়ে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের ক্যাম্পগুলোতে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের জীবন যেমন অনিশ্চয়তায় আটকে আছে, তেমনি প্রত্যাবাসন নিয়েও তৈরি হয়নি কার্যকর সমাধান। তবে নিজ দেশে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে ফিরে যাওয়াকেই এখনো একমাত্র সমাধান হিসেবে দেখছেন রোহিঙ্গারা।

বিজ্ঞাপন

নয় বছর আগে পরিবারের চার সদস্যকে নিয়ে পাহাড়ি দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে উখিয়ার কুতুপালংয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন রোহিঙ্গা যুবক মোহাম্মদ আরিফুল্লাহ (২৮)।

২০১৭ সালের সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা স্মরণ করে তিনি বলেন, “মিলিটারির (জান্তা) হাত থেকে প্রাণ বাঁচিয়ে ৮ দিন হাঁটার পর এদেশে এসেছিলাম। তখনের কথা মনে পড়লে কান্না পায় এখনো, কিন্তু সেটা আমার দেশ আমার ভূমি। সেখানে আবার ফিরে যেতে চাই।”

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখ ২ হাজার ৩৪ জন। এর মধ্যে ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত রাখাইনে নতুন করে সংঘাতের কারণে আরও প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২০২৩ সালের শেষ দিকে মিয়ানমারের জান্তা বাহিনী ও বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরকান আর্মির মধ্যে বড় ধরনের সশস্ত্র সংঘাত শুরু হয়। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই সংঘাতের কারণে রাখাইনে নিরাপত্তা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। ফলে প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা নিয়েও তৈরি হয়েছে নতুন অনিশ্চয়তা।

নিজেদের নেতৃত্বে সংগঠিত রোহিঙ্গারা

নিজ ভূমিতে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকেই রোহিঙ্গাদের সরাসরি মতামতের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গা (ইউসিআর)। শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয়ের অনুমতি নিয়ে ২০২৫ সালে কক্সবাজারের ৩৩টি ক্যাম্পে সংগঠনটির প্রতিনিধি নির্বাচন করা হয়।

বিজ্ঞাপন

ইমাম, মুহতামিম, ছাত্র, শিক্ষক, ওকতা (চেয়ারম্যান), নারী প্রতিনিধি, সোশ্যাল মিডিয়া কর্মী, হেড মাঝি, প্রবীণ নাগরিক, কমিউনিটি ডাক্তার, ব্যবসায়ী, যুবক, ক্যাম্পভিত্তিক সংগঠন ও প্রবাসী রোহিঙ্গাসহ ১৪টি শ্রেণি থেকে ভোটার নির্বাচন করা হয়।

ইউসিআরের সদস্যদের দাবি, আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয়ের পাশাপাশি ক্যাম্পে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং রোহিঙ্গাদের সম্মানজনক ও টেকসই প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে তারা কাজ করছেন।

রোহিঙ্গা তরুণ মোহাম্মদ ফুরকান মির্জা বলেন, “ইউসিআর প্রমাণ করেছে রোহিঙ্গারা শান্তিপূর্ণ, স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীলভাবে নিজেদের সংগঠিত করতে পারে। এই সংগঠন আমাদের ঐক্য, জবাবদিহিতা এবং মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যতের প্রতীক হয়ে উঠেছে।”

বিজ্ঞাপন

ইউসিআরের প্রেসিডেন্সিয়াল প্যানেলের সদস্য রোহিঙ্গা অধিকারকর্মী সৈয়দ উল্লাহ বলেন, “বাংলাদেশের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ, তারা আমাদের আশ্রয় দিয়েছে এবং জীবন বাঁচিয়েছে। একই সাথে আন্তর্জাতিক দাতাগোষ্ঠীগুলো আমাদের সহায়তা করছে। আমরা এখানে স্থায়ী নই, আমাদের ঠিক একদিন ফিরতে হবে আমাদের নিজ দেশে। রোহিঙ্গাদের কাছে একমাত্র সমাধান প্রত্যাবাসন। সে লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।”

স্থানীয়দের ওপরও বাড়ছে চাপ

দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার উপস্থিতির কারণে উখিয়া-টেকনাফের স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেও নানা সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। স্থানীয়দের অনেকেই চান, রোহিঙ্গারা যেন নিরাপদ ও সম্মানজনক পরিবেশে দ্রুত নিজ দেশে ফিরে যেতে পারেন।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয় তরুণ আইনজীবী ব্যারিস্টার সাফফাত ফারদিন চৌধুরী বলেন, “রোহিঙ্গারা আমাদের অতিথি আমরা তাদের মানবিক আশ্রয় দিয়েছি৷ কিন্তু বর্তমানে বিপুল এই জনগোষ্ঠীর চাপে আমাদের নানা সমস্যা পোহাতে হচ্ছে৷ বর্তমান সরকারের কূটনৈতিকভাবে বিভিন্ন তৎপরতা দৃশ্যমান, আমরা চাই অচিরেই রোহিঙ্গারা ফিরে যাক তথা সুন্দর প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার পরিবেশ তৈরি হোক।”

কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বলেন, “১২ লাখের বেশি মানুষকে যদি ধাপে ধাপে ফেরত পাঠাতে হয়, তাহলে কাজটি কত দীর্ঘ হতে পারে তা সহজেই বোঝা যায়। শুধু মানুষকে সীমান্তের ওপারে পাঠিয়ে দেওয়াই প্রত্যাবাসন নয়। মর্যাদার সঙ্গে ফেরার নিশ্চয়তা থাকতে হবে।”

সংঘাত বন্ধ না হলে প্রত্যাবাসন কঠিন

বিজ্ঞাপন

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আরকান আর্মি বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন মিয়ানমারের ২৭১ কিলোমিটার এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি করে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাখাইনের ১৭টি টাউনশিপের মধ্যে ১৪টিতে সংগঠনটি শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। অন্যদিকে জান্তা বাহিনীও নিজেদের নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে রাখাইনে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিকে প্রত্যাবাসনের প্রথম বাধা হিসেবে দেখছে ইউএনএইচসিআর। সংস্থাটির কক্সবাজার সাব-অফিসের প্রধান মার্সেল কলুন বলেন, “রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা রয়েছে, কিন্তু কীভাবে সেই প্রত্যাবাসন বাস্তবায়ন হবে তার একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা তৈরি চলমান সংঘাতের কারণে হয়ে উঠছে না তাই আগে সংঘাত শেষ হতে হবে। এরপর রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, নিজ ভূমিতে ফেরার সুযোগ, জমি-বাড়ির অধিকার এবং নাগরিকত্ব বা মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।”

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

তিনি আরও বলেন, “এসব শর্ত তৈরি করতে আরও কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। তাই প্রত্যাবাসনের পাশাপাশি বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও প্রয়োজন। বাংলাদেশের জন্য একটি জাতীয় শরণার্থী নীতিমালা বা কাঠামো তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।”

বিজ্ঞাপন

শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা সংকট এখন আর শুধু বাংলাদেশের বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। প্রত্যাবাসনের রূপরেখা প্রণয়নসহ সংকটের সমাধানে সরকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে বলেও জানান তিনি।

এদিকে ২৫ আগস্ট নবমবারের মতো রোহিঙ্গা গণহত্যা স্মরণ দিবস পালিত হবে। নয় বছর ধরে আশ্রয় নেওয়া এই জনগোষ্ঠীর প্রত্যাশা—নিজেদের নিরাপত্তা, অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করে একদিন যেন তারা ফিরে যেতে পারেন নিজ জন্মভূমিতে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD