নতুন পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন চলতি সপ্তাহেই: মন্ত্রিপরিষদ সচিব

জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ অনুমোদনের পর চলতি সপ্তাহের মধ্যেই এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি। তিনি জানান, এ জন্য একটি নয়, একাধিক প্রজ্ঞাপন জারি হবে। পাশাপাশি আইনগত ভেটিং শেষে কিছু বিষয় এসআরও আকারেও প্রকাশ করা হবে।
বিজ্ঞাপন
সোমবার (৩১ আগস্ট) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
নতুন পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন কবে জারি হতে পারে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, চলতি সপ্তাহেই এটি হয়ে যাবে। তিনি জানান, এ-সংক্রান্ত একাধিক গেজেট প্রকাশ করা হবে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, সর্বশেষ ২০১৫ সালে জাতীয় বেতন স্কেল কার্যকর হয়েছিল। এরপর প্রায় ১২ বছর ধরে সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন কোনো বেতন স্কেল হয়নি। মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কাঠামো সময়োপযোগী করতে জাতীয় বেতন কমিশন ২০২৫ গঠন করা হয়। কমিশনের প্রতিবেদন পাওয়ার পর সরকার এ বিষয়ে আরও আটটি বৈঠক করেছে।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় বেতন বৃদ্ধি না হওয়ায় সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মানে প্রভাব পড়েছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সরকারি কর্মচারী ও সরকারের আর্থিক সক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য রেখে নতুন বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে।
তিন ধাপে মূল বেতন, ভাতা কার্যকর ২০২৮ সালে
জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ আগামী ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে। সরকারের আর্থিক সক্ষমতা এবং মূল্যস্ফীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে এটি কার্যকর করা হবে।
বিজ্ঞাপন
মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ১ জুলাইয়ের মধ্যে মূল বেতন তিন ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। এরপর ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে বিভিন্ন ভাতা একযোগে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিন ধাপে বেতন কার্যকরের সময়সূচি সম্পর্কে তিনি জানান, প্রথম ধাপ জুলাই থেকে শুরু হবে। এরপর ছয় মাস পর দ্বিতীয় ধাপ এবং পরবর্তী সময়ে তৃতীয় ধাপ কার্যকর হবে। ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ মূল বেতন তিন ধাপে বাস্তবায়ন সম্পন্ন হবে। ২০২৮ সাল থেকে বেতন-ভাতাসহ পূর্ণ সুবিধা কার্যকর হবে।
নিম্ন গ্রেডে তুলনামূলক বেশি বেতন বৃদ্ধি
বিজ্ঞাপন
নতুন বেতন স্কেলে ২০টি গ্রেডের মধ্যে প্রথম থেকে ১১তম গ্রেড পর্যন্ত প্রারম্ভিক মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। প্রথম গ্রেডের নির্ধারিত মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হয়েছে।
অন্যদিকে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের ক্ষেত্রে বেতন বৃদ্ধির হার তুলনামূলক বেশি রাখা হয়েছে। ১২তম গ্রেডে ১১৫ শতাংশ, ১৩তম গ্রেডে ১১৮ শতাংশ, ১৪তম গ্রেডে ১৩০ শতাংশ, ১৫তম গ্রেডে ১৩৫ শতাংশ, ১৬তম গ্রেডে ১৩৫ শতাংশ, ১৭তম গ্রেডে ১৩৮ শতাংশ, ১৮তম গ্রেডে ১৩৯ শতাংশ, ১৯তম গ্রেডে ১৪১ শতাংশ এবং ২০তম গ্রেডে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বাড়ানো হয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের তুলনামূলক বেশি হারে বেতন বৃদ্ধির সিদ্ধান্তটি পরিকল্পিতভাবেই নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে কম আয়ের কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় ও প্রকৃত আয় কমে যাওয়ার বিষয়টি কিছুটা সমন্বয়ের চেষ্টা করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
নতুন কাঠামোয় সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতনের অনুপাত ১:১.৯৪৫ থেকে কমিয়ে ১:১.৭৮ করা হয়েছে।
পেনশনেও পরিবর্তন
নতুন বেতন স্কেলে পুরোনো পেনশনভোগীদের জন্য স্ল্যাবভিত্তিক নিট পেনশন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। মাসে ৯ হাজার টাকা বা এর কম নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের পেনশন ১০০ শতাংশ বাড়িয়ে ১৮ হাজার টাকা করা হবে।
বিজ্ঞাপন
৯ হাজার ১ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ৭৫ শতাংশ, ২০ হাজার ১ টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত পাওয়া ব্যক্তিদের ৬৫ শতাংশ, ৩০ হাজার ১ টাকা থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত পাওয়া ব্যক্তিদের ৬০ শতাংশ এবং ৪০ হাজার টাকা বা তার বেশি পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ৫৫ শতাংশ হারে পেনশন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, ধীরে ধীরে ‘ওয়ান র্যাঙ্ক, ওয়ান পেনশন’ ব্যবস্থার দিকে যাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এ ব্যবস্থা পুরোপুরি বাস্তবায়নের আশা করা হচ্ছে।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য ভাতা
বিজ্ঞাপন
নতুন পে-স্কেলে সরকারি কর্মচারীদের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য প্রথমবারের মতো ভাতা চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রতি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য মাসে ৩ হাজার টাকা করে ভাতা দেওয়া হবে।
এ ছাড়া আগে নির্দিষ্ট কিছু গ্রেডের কর্মচারীরা মোবাইল ভাতা পেলেও নতুন বেতন কাঠামোয় সব গ্রেডের সরকারি কর্মচারীকে মোবাইল ভাতার আওতায় আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
উপকৃত হবেন প্রায় ৩৩ লাখ মানুষ
বিজ্ঞাপন
নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নের ফলে প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীসহ অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী উপকৃত হবেন।
পুরো বেতন স্কেল বাস্তবায়িত হলে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় হবে আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। তবে এ অর্থ একসঙ্গে ব্যয় করতে হবে না। ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের কারণে আগামী দুই বছরে পুরো অর্থের প্রয়োজন হবে না বলে জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
মূল্যস্ফীতির প্রভাবও বিবেচনায়
বিজ্ঞাপন
বেতন বাড়ানোর ফলে বাজার ও মূল্যস্ফীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাবের বিষয়টিও সরকার বিবেচনায় নিয়েছে বলে জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
তিনি বলেন, সরকারি কর্মচারীদের হাতে অতিরিক্ত অর্থ গেলে পণ্য ও সেবার চাহিদা বাড়তে পারে। এ কারণে বেতন বৃদ্ধির প্রভাব বিবেচনা করেই ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এমপিওভুক্ত শিক্ষক নিয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি
বিজ্ঞাপন
নতুন বেতন স্কেলে প্রায় পাঁচ লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী অন্তর্ভুক্ত হবেন কি না, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব। এ বিষয়ে পরবর্তী সময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সরকারি চাকরিজীবীদের টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড নিয়েও এখনই বিস্তারিত জানানো হয়নি। সংশ্লিষ্ট এসআরও জারি হলে এসব বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে বলে জানান তিনি।
ওয়েজ বোর্ড নিয়েও আলোচনা
সাংবাদিকদের ওয়েজ বোর্ড নিয়ে দীর্ঘদিনের দাবির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, নতুন পে-স্কেল কার্যকর হওয়ার পর এ বিষয়েও কার্যক্রমের গতি বাড়বে।
তিনি বলেন, বেসরকারি খাতের কর্মীদের বেতন-ভাতা ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের বিষয়টিও সরকারের আলোচনায় এসেছে। যারা বেতন স্কেলের ওপর নির্ভরশীল, তাদের বেতন বাড়ানো প্রয়োজন—এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই জাতীয় বেতন স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।








