১৫০ গ্যাসকূপ খননের ‘মাস্টারপ্ল্যান’ ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর

দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করতে ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে নতুন ১৫০টি গ্যাসকূপ খননের মহাপরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। পাশাপাশি গভীর সমুদ্রে নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাব্যতাও যাচাই করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বিজ্ঞাপন
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে সংসদ সদস্যদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে সরকারের এসব পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
সংসদ সদস্য সুলতানা আহমেদ তাঁর প্রশ্নে জুলাই ২০২৬ সালে একটি এলএনজি টার্মিনাল সাময়িক বন্ধ থাকায় দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি এবং এর প্রভাবে শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন। ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিকল্প জ্বালানি উৎস, এলএনজি রিজার্ভ, শিল্পাঞ্চলভিত্তিক অগ্রাধিকার এবং জরুরি জ্বালানি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চান তিনি।
জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আকস্মিক গ্যাস সংকট মোকাবিলায় দেশীয় উৎস বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি নতুন গ্যাসকূপ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দেশীয় গ্যাসের সম্ভাবনা অনুসন্ধানে ৪ হাজার ৫০০ লাইন কিলোমিটার ২ডি এবং ৪ হাজার ২০০ বর্গকিলোমিটার ৩ডি সাইসমিক সার্ভে পরিচালনা করা হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
বাড়ছে এলএনজি অবকাঠামো
বর্তমানে দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে গড়ে দৈনিক প্রায় ৯৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
ভবিষ্যতে সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় মহেশখালীর কুতুবজোমে একটি নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ীতে একটি ল্যান্ড-বেইজড এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কাজ চলছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, কুতুবজোমের টার্মিনাল থেকে ২০২৮ সালে এবং মাতারবাড়ীর ল্যান্ড-বেইজড টার্মিনাল থেকে ২০৩০ সালের দিকে রি-গ্যাসিফাইড এলএনজি সরবরাহ শুরু হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
এ ছাড়া পায়রা বা মোংলা বন্দর এলাকা কিংবা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকায় সুবিধাজনক স্থান চিহ্নিত করে গভীর সমুদ্রে আরেকটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে বলেও জানান তিনি।
ভোলার গ্যাসে শিল্পায়নের পরিকল্পনা
ভোলা-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নূরুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে ভোলার গ্যাস জাতীয় স্বার্থে ব্যবহারের পরিকল্পনাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
বিজ্ঞাপন
তিনি জানান, ভোলার গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে মূল ভূখণ্ডে নিয়ে আসতে গেলে অন্তত সাত বছর সময় লাগতে পারে। তাই দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য বিকল্পের দিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ভোলায় গ্যাসনির্ভর শিল্পকারখানা স্থাপনের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়েই গ্যাস ব্যবহার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভোলায় একটি বড় সার কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। একই এলাকায় ৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় গ্যাসসম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও আঞ্চলিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
তিনি আরও জানান, ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০৩১ মেয়াদের জন্য একটি বিশেষ কৌশলগত উন্নয়ন কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। এতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সুষম অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ভোলার প্রাকৃতিক সম্পদ, উপকূলীয় জলবায়ু ঝুঁকি, স্থানীয় চাহিদা ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় নিয়ে অঞ্চলটির জন্য সমন্বিত ‘মাস্টারপ্ল্যান’ করা হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বড় লক্ষ্যমাত্রা
মেহেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য তাজউদ্দীন খান দেশের ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ চাহিদা ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির পরিকল্পনা জানতে চান।
জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে ২০২৬ থেকে ২০৩০ মেয়াদের ‘জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র’ প্রণয়ন করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
এই কৌশল অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্তত ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে অন্তত ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের জাতীয় লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে সৌরবিদ্যুৎকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, বাসাবাড়ি, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের মাধ্যমে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট এবং বড় ভূমিভিত্তিক সৌর প্রকল্প থেকে আরও ৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে।
এর বাইরে বায়ু বিদ্যুৎ, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ, পানিবিদ্যুৎ, ভাসমান সোলার ও কৃষিভিত্তিক অ্যাগ্রিভোলটেইক্স প্রযুক্তি ব্যবহার করে আরও ৪৫০ থেকে ৫৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
ছাদে সৌরবিদ্যুতে প্রণোদনা
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে আমদানি ও শুল্ক কাঠামোতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, বিশেষায়িত ব্যাটারি ও প্রয়োজনীয় স্ট্রাকচার আমদানিতে বিভিন্ন ধরনের শুল্ক ও কর ছাড় দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সালের বিশেষ মূল্য প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ব্যাটারিসহ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় প্রতি ইউনিটে সর্বোচ্চ ৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারি প্রণোদনা, ২০ শতাংশ মুনাফা এবং ১১ দশমিক ২৫ শতাংশ প্রিমিয়াম হিসাব করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা।
বিজ্ঞাপন
নেট মিটারিং নির্দেশিকা, ২০২৫ অনুসরণ করে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৭-এর মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনকারী গ্রাহকরা নিজস্ব ব্যবহারের পর উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ বিক্রি করে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০৩০ পর্যন্ত এই নির্ধারিত হার পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
প্রধানমন্ত্রী জানান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে সরকারি জমিতে পিপিপি প্রকল্পের নির্দেশিকা ২০২৬, বেসরকারি বিনিয়োগ নীতিমালা ২০২৫, নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা ২০২৫ এবং নেট মিটারিং গাইডলাইন ২০২৫ বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে।
পাশাপাশি জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি ২০২৫, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবসায়িক কাঠামো, অনশোর উইন্ড গাইডলাইন এবং কার্বন ক্রেডিট-সংক্রান্ত নির্দেশিকার মাধ্যমে দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা ও বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থাকে আরও টেকসই করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।








