Logo

পা কেটে বানানো হয় ‘ভিক্ষার মেশিন’, অবশেষে বাড়ি ফিরল নিখোঁজ রায়হান

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৯:৫০
পা কেটে বানানো হয় ‘ভিক্ষার মেশিন’, অবশেষে বাড়ি ফিরল নিখোঁজ রায়হান
ছবি: সংগৃহীত

চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় সাত মাস নিখোঁজ থাকার পর এক পা হারানো অবস্থায় পরিবারের কাছে ফিরেছে ১২ বছরের কিশোর মোহাম্মদ রায়হান। পরিবারের অভিযোগ, ঢাকার কমলাপুরে একটি চক্র তাকে আটকে রেখে ভিক্ষাবৃত্তিতে ব্যবহার করেছে এবং একপর্যায়ে তার ডান পা কেটে দেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

গত ১৩ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ১২টার দিকে লোহাগাড়ার চুনতি এলাকায় একটি সিরাত মাহফিলের পাশে এক পায়ে ভর করে ভিক্ষা করার সময় স্থানীয়রা রায়হানকে দেখতে পান। পরে তাঁর পরিবারের সদস্যদের খবর দেওয়া হলে বাবা নাজিম উদ্দীন গিয়ে ছেলেকে শনাক্ত করেন।

রায়হান চুনতি ইউনিয়নের সাতগড় নোয়াপাড়া এলাকার দিনমজুর নাজিম উদ্দীনের ছেলে। স্থানীয় একটি কোরআন হিফজখানায় পড়াশোনা করত সে।

পরিবারের সদস্যরা জানান, গত ৯ ফেব্রুয়ারি চুল কাটার জন্য বাবা রায়হানকে ১০০ টাকা দেন। পরে অভিমান করে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায় সে। একপর্যায়ে একটি নির্বাচনী প্রচারণার গাড়িতে করে কক্সবাজারে যায়। সেখানে প্রায় দুই মাস সৈকত এলাকায় পর্যটকদের কাছে টাকা চাইত এবং রাতেও সেখানেই থাকত বলে জানায় রায়হান।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

পরে এক ব্যক্তি বেশি টাকা আয়ের প্রলোভন দেখিয়ে তাকে বাসে করে ঢাকায় নিয়ে যায় বলে শিশুটির দাবি। এরপর কমলাপুর এলাকায় তাকে পানি ও শরবত বিক্রির কাজে ব্যবহার করা হতো।

বিজ্ঞাপন

রায়হানের ভাষ্য, কমলাপুর রেলস্টেশনের কাছাকাছি গাছপালা ঘেরা একটি টিনের ঘরে তাকে রাখা হতো। সেখানে আরও কয়েকজন শিশু ছিল। তাদের কারও হাত, কারও পা কাটা ছিল বলেও দাবি করেছে সে।

সালমা নামে এক নারীসহ কয়েকজন ওই শিশুদের দেখাশোনা করতেন বলে রায়হান জানায়। তার দাবি, পানি ও শরবত বিক্রি করে প্রত্যাশিত আয় না হওয়ায় পরে তাকে ভিক্ষা করানোর সিদ্ধান্ত নেয় চক্রটি।

রায়হানের অভিযোগ, এক রাতে পানি বা শরবতের সঙ্গে ঘুমের ওষুধজাতীয় কিছু খাওয়ানো হয়। এরপর অচেতন অবস্থায় থাকার পর সকালে ঘুম থেকে উঠে সে দেখতে পায় তার ডান পা নেই।

বিজ্ঞাপন

তার ভাষ্য অনুযায়ী, পরে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং পা কাটার বিষয়টি আড়াল করতে ট্রেন দুর্ঘটনায় পা হারিয়েছে—এমন কথা বলতে শেখানো হয়। চিকিৎসার পর হুইলচেয়ারে বসিয়ে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় তাকে ভিক্ষা করানো হতো বলেও দাবি করেছে রায়হান।

রায়হানের দাবি, পা অক্ষত থাকা অবস্থায় পানি ও শরবত বিক্রি করে প্রতিদিন ৬০০ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হতো। পা হারানোর পর ভিক্ষা করে দিনে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা পাওয়া যেত। সেই টাকা চক্রের সদস্যরা নিয়ে নিত বলে অভিযোগ তার।

রায়হানের দাবি, গত শনিবার রাতে চক্রের এক সদস্য তাকে ৩৫০ টাকা দিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে বলে। পরে তাকে একটি বাসে তুলে দেওয়া হয়। সেখান থেকে সে লোহাগাড়ার চুনতি এলাকায় পৌঁছায়।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয়রা তাকে মাহফিলের পাশে দেখতে পেয়ে পরিবারের সদস্যদের খবর দেন। খবর পেয়ে বাবা সেখানে গিয়ে ছেলেকে বাড়িতে নিয়ে আসেন।

সুস্থ অবস্থায় বাড়ি থেকে বের হওয়ার সাত মাস পর এক পা হারিয়ে ছেলেকে ফিরে পেয়ে পরিবারটি বিপাকে পড়েছে। রায়হানের বাবা নাজিম উদ্দীন বলেন, তাঁর ছেলেকে পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছে। শরীরের বিভিন্ন স্থানেও ক্ষতচিহ্ন রয়েছে। ঘটনার তদন্ত করে জড়িতদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।

পেটে থাকা কাটা দাগের কারণে মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) রায়হানকে লোহাগাড়া হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরিবারের ভাষ্য, পরীক্ষার পর চিকিৎসকরা তাঁর কিডনিতে কোনো সমস্যা নেই বলে জানিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

রায়হানের সৎ মা ফয়জুন্নেসা বলেন, চুল কাটতে যাওয়ার পর সাত মাস ছেলেটির কোনো খোঁজ ছিল না। ফিরে এলেও তার একটি পা নেই এবং পেটে বড় ক্ষতচিহ্ন রয়েছে। পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য সীমিত হওয়ায় তাঁর চিকিৎসা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তাঁরা।

রায়হানের চাচা মো. নুরুচ্ছফা বলেন, নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবারের পক্ষ থেকে অনেক খোঁজ করা হয়েছে। তবে এভাবে এক পা হারিয়ে তাকে ফিরে পাবেন, তা তাঁরা কখনো ভাবেননি। কীভাবে শিশুটিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং তার পা কীভাবে কাটা হলো, তা তদন্ত করে পুরো চক্রকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

চুনতি ইউনিয়নের স্থানীয় জনপ্রতিনিধি মো. ইনতেজারও ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাঁর মতে, সাত মাস নিখোঁজ থাকার পর একটি শিশু এক পা হারিয়ে ফিরে আসার বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

জাতীয় লিগ্যাল এইড অধিদপ্তরের প্যানেল আইনজীবী মো. নওশাদ আলীর ভাষ্য, অভিযোগ সত্য হলে মানবপাচার, অপহরণ, অঙ্গহানি ও শিশু নির্যাতনের মতো গুরুতর অপরাধের বিষয় জড়িত থাকতে পারে। শিশুটির শারীরিক অবস্থার যথাযথ মেডিকেল ও ফরেনসিক পরীক্ষা এবং তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

বিজ্ঞাপন

লোহাগাড়া থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) প্রশান্ত কুমার ভৌমিক জানান, রায়হানের বাবা থানায় এসেছিলেন। ঘটনাটি লোহাগাড়ায় ঘটেছে কি না নিশ্চিত না হওয়ায় তাঁকে ঢাকার মতিঝিল থানায় যোগাযোগের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, শিশুটির অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট থানা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তদন্ত করলে ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং জড়িতদের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

রায়হানের পরিবারের দাবি, তদন্তের মাধ্যমে শিশুটিকে কোথায় আটকে রাখা হয়েছিল, কারা তাকে ভিক্ষাবৃত্তিতে ব্যবহার করেছে এবং তার পা হারানোর প্রকৃত কারণ কী—তা দ্রুত উদঘাটন করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে রায়হানের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য সহযোগিতাও চেয়েছে পরিবার।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD