জাতিসংঘে প্রথম ভাষণে যে বার্তা দিয়েছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান

১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের একাদশ বিশেষ অধিবেশনে বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ভাষণ দেন। জাতিসংঘের সরকারি নথিতে ওই বক্তব্যের বিষয়বস্তু হিসেবে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা, উন্নয়ন এবং নতুন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রসঙ্গ উঠে এসেছে।
বিজ্ঞাপন
ভাষণে তিনি বাংলাদেশের জনসংখ্যার চাপ, বেকারত্ব, ভূমিহীনতা ও নিম্ন মাথাপিছু আয়ের মতো উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেন। একই সঙ্গে কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নের মাধ্যমে দেশকে আরও স্বনির্ভর করার পরিকল্পনার কথা জানান।
জিয়াউর রহমান বলেন, বিশ্বের স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশই বাংলাদেশের। দেশের জনসংখ্যার ঘনত্ব জাপান ও নেদারল্যান্ডসের তুলনায় দ্বিগুণ বলেও উল্লেখ করেন তিনি। বাংলাদেশের অর্ধেকের বেশি মানুষ বেকার অথবা ভূমিহীন কৃষক এবং তাদের অনেকেই মৌসুমি কাজের ওপর নির্ভরশীল বলেও ভাষণে তুলে ধরেন। প্রতি বছর নতুন করে প্রায় ২০ লাখ মানুষের খাদ্যের সংস্থান করতে হয় বলেও তিনি জানান।
এত প্রতিকূলতার মধ্যেও বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ের কথা জানিয়ে জিয়াউর রহমান বলেন, ‘তবুও আমরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাইনি এবং হবোও না।’
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
প্রায় পাঁচ বছরের মধ্যে খাদ্য উৎপাদন দ্বিগুণ করার পরিকল্পনার কথাও তিনি তুলে ধরেন। ১৯৮৫ সালের মধ্যে জন্মহার ২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ২ শতাংশে নামিয়ে আনা, বিদ্যালয় ও হাসপাতালের সংখ্যা বাড়ানো এবং ‘কোনো নারী, পুরুষ বা শিশু যাতে খাদ্য, আশ্রয় ও পোশাক থেকে বঞ্চিত না হয়’—এমন লক্ষ্যও তিনি তুলে ধরেন।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, ‘আমাদের অগ্রাধিকার কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন।’
দেশের প্রায় ৯ কোটি মানুষকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি সরকারের অঙ্গীকারের কথা জানিয়ে বলেন, ‘গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি আমাদের অঙ্গীকার কোনোমতেই নড়চড় হবে না।’
স্বনির্ভরতাকে দেশের মূলমন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করে জিয়াউর রহমান বলেন, ‘আমাদের সফল হতেই হবে, কারণ ব্যর্থ হওয়ার কোনো সুযোগ আমাদের নেই।’
বিজ্ঞাপন
জিয়ার ভাষণের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশজুড়ে ছিল দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতা। জাতীয় উন্নয়ন ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার সঙ্গে আঞ্চলিক শান্তির সম্পর্ক তুলে ধরে তিনি এ অঞ্চলে বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপের প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, ‘এ অঞ্চলের কাছে কিংবা দূরে বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপের কারণে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির অবনতি নতুন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে সম্পূর্ণ অসঙ্গতিপূর্ণ।’
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি জানান, বাংলাদেশ এরই মধ্যে এ অঞ্চলের দেশগুলোর একটি শীর্ষ সম্মেলনের প্রস্তাব দিয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে আঞ্চলিক সহযোগিতা গড়ে উঠলেও দক্ষিণ এশিয়ায় কার্যকর সহযোগিতামূলক উদ্যোগ তখনও সীমিত ছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বিজ্ঞাপন
জিয়াউর রহমান বলেন, ‘আমাদের প্রথম লক্ষ্য হবে একত্রিত হওয়া এবং এ অঞ্চলের দেশগুলোর পারস্পরিক কল্যাণের জন্য সহযোগিতার সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলো খুঁজে বের করা।’
অন্য অঞ্চলের অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘আঞ্চলিক সহযোগিতা উত্তেজনা কমাতে এবং অভিন্ন স্বার্থে পরস্পরের প্রতিপক্ষ দেশগুলোর অবস্থান নমনীয় করতে সহায়তা করেছে।’
এরপর দক্ষিণ এশিয়ার উদ্দেশে তার আহ্বান ছিল, ‘দক্ষিণ এশিয়ায় এখন আমাদেরও শুরু করার সময় এসেছে।’
বিজ্ঞাপন
উন্নত উত্তর ও উন্নয়নশীল দক্ষিণের মধ্যে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিষয়টিও ভাষণে গুরুত্ব পায়। বিশ্বের বড় একটি জনগোষ্ঠী দারিদ্র্য ও বঞ্চনার মধ্যে থাকলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয় বলে মত দেন তিনি।
জিয়াউর রহমান বলেন, ‘শান্তিকে যেমন খণ্ডিত করা যায় না, তেমনি বিশ্বকে ধনী ও দরিদ্র- এভাবে পৃথক অংশে বিভক্ত করেও রাখা যায় না। এটি করা হলে বিশ্বশান্তি মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।’
তিনি ব্রান্ডট কমিশনের সুপারিশের প্রতি সমর্থন জানান। একই সঙ্গে উন্নয়ন সহায়তা বৃদ্ধি, সম্পদ ও প্রযুক্তি হস্তান্তর বাড়ানো, ন্যায্য বাণিজ্য এবং স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য শক্তিশালী সহায়তার ভিত্তিতে নতুন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
উন্নত দেশগুলোকে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য সহায়তা দ্বিগুণ করার পাশাপাশি শর্তহীন অনুদানের পরিমাণ বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি। স্বল্পমূল্যে তেল সরবরাহ এবং স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জ্বালানি সম্পদ উন্নয়নে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ নেওয়ার প্রস্তাবও দেন।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশের প্রসঙ্গে জিয়াউর রহমান বলেন, তেলের মূল্যবৃদ্ধি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বড় চাপ তৈরি করেছে। এ অবস্থায় স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে সহায়তার ক্ষেত্রে তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ভাষণের শেষ পর্যায়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সাহসী ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ ও প্রযুক্তি বিশ্বে রয়েছে।
তার ভাষণের শেষ দিকের বক্তব্য ছিল, ‘আমি আন্তরিকভাবে আশা ও প্রার্থনা করি, আমরা যেন সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারি।’
বিজ্ঞাপন
জিয়াউর রহমানের ১৯৮০ সালের এই বক্তব্যের মূল নথি জাতিসংঘের ডিজিটাল লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত রয়েছে। সরকারি রেকর্ডে এটি ২৬ আগস্ট ১৯৮০ তারিখের একাদশ বিশেষ অধিবেশনের তৃতীয় প্লেনারি বৈঠকের বক্তব্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্ক ২২ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয়েছে এবং ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে। জাতিসংঘের সূচি অনুযায়ী, এ অধিবেশনে বিশ্বনেতারা শান্তি, নিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়নসহ বৈশ্বিক বিভিন্ন বিষয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছেন।








