বিশ্বমঞ্চে নতুন বাংলাদেশের বার্তা দিবেন তারেক রহমান

এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বার্তা নিয়ে জাতিসংঘের বিশ্বমঞ্চে দাঁড়াতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর বাংলায় দেওয়া প্রথম ভাষণে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক নবযাত্রা, আইনের শাসন, জবাবদিহিতা, নাগরিক অধিকার এবং সরকারের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরবেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
একই সঙ্গে বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, জলবায়ু পরিবর্তন, তরুণ ও নারী ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, আধুনিক প্রযুক্তির ন্যায়সঙ্গত ব্যবহার এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী। সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে দীর্ঘদিনের রোহিঙ্গা সংকট। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, সম্মানজনক ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য কার্যকর আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আহ্বান জানাবেন তিনি।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়বেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর এই সফরকে বাংলাদেশের নতুন সরকারের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আত্মপ্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে দেখছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। জাতিসংঘের সাধারণ বিতর্কে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যের মূল সুর হবে বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং ভবিষ্যৎ পথচলা।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ভাষণে গণতান্ত্রিক নবযাত্রা, আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারের পাশাপাশি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী।
বিজ্ঞাপন
বিশ্বের সর্বোচ্চ বহুপাক্ষিক মঞ্চে প্রথমবার সরকারপ্রধান হিসেবে বক্তব্য দেওয়ার কারণে এই ভাষণকে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে বাংলাদেশ।
এ ব্যাপারে পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম বলেছেন, এই সফরের মাধ্যমে বিশ্বকে একটি ‘গণতান্ত্রিক, আত্মবিশ্বাসী, দায়িত্বশীল, শান্তিপ্রিয় ও সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ’-এর বার্তা দিতে চায় সরকার।
রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘস্থায়ী মানবিক ও আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। জাতিসংঘের এবারের অধিবেশনে বিষয়টি আরও জোরালোভাবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী। ২৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের আয়োজনে রোহিঙ্গা সংকটবিষয়ক বিশেষ সাইড ইভেন্টে অংশ নেবেন তিনি। সেখানে রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কামনা করবেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি এই সংকটের কারণে বাংলাদেশের ওপর যে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানবিক চাপ তৈরি হয়েছে, তার কথাও তুলে ধরবেন তিনি। বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অবস্থান রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, সম্মানজনক ও টেকসইভাবে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনই সংকটের স্থায়ী সমাধানের পথ এবারও আন্তর্জাতিক মঞ্চে গুরুত্ব পাবে।
বিজ্ঞাপন
প্রধানমন্ত্রীর সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার জলবায়ু পরিবর্তন। ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্যোগে আয়োজিত ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন অ্যান্ড দ্য জাস্ট ট্রানজিশন’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেবেন তিনি। পরদিন সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট অস্তিত্বগত ঝুঁকি মোকাবিলাবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে উদ্বোধনী বক্তব্য দেবেন প্রধানমন্ত্রী। এসব বৈঠকে জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, লস অ্যান্ড ড্যামেজ এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারের বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরা হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর পক্ষে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বানও জানাবেন প্রধানমন্ত্রী।
নতুন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণে তরুণ ও নারীদের ভূমিকার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। জাতিসংঘের ভাষণেও এই বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। তরুণদের জন্য শিক্ষা, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো এবং নারীর ক্ষমতায়নের মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সরকারের অগ্রাধিকার ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও তুলে ধরবেন তিনি। ২৪ সেপ্টেম্বর মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্য এবং মিডওয়াইফারি বিষয়ক বাংলাদেশের আয়োজিত সাইড ইভেন্টে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারের উদ্যোগ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরার পাশাপাশি দক্ষ ও প্রশিক্ষিত ধাত্রীসেবা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেবেন তিনি।
জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী। বর্তমান বিশ্বের নানা সংকট—সংঘাত, জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনৈতিক বৈষম্য, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তন—মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থ ও অংশগ্রহণ আরও কার্যকরভাবে নিশ্চিত করার বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরবেন তিনি। জাতিসংঘের কর্মসূচির পাশাপাশি নিউইয়র্কে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। কুয়েতের ক্রাউনপ্রিন্স এবং ক্রোয়েশিয়া, ভুটান, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান ও হাইতির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর বৈঠকের সম্ভাব্য কর্মসূচি রয়েছে। এসব বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগিতা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং রোহিঙ্গা সংকটসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
এ ছাড়া জাতিসংঘ মহাসচিব, ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট, জাতিসংঘের মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূত, জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার ও মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে তাঁর। প্রধানমন্ত্রীর সফরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও বিনিয়োগের সুযোগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সরকারের অর্থনৈতিক কূটনীতির অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী। এসব আলোচনায় বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। জাতিসংঘের বিশ্বমঞ্চে তারেক রহমানের আসন্ন ভাষণকে তাঁর পরিবার ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি ধারাবাহিক অধ্যায় হিসেবেও দেখছেন বিএনপি নেতারা।
এর আগে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান জাতিসংঘের বিশেষ অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াও প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে জাতিসংঘের বিভিন্ন অধিবেশনে বাংলাদেশের হয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। এবার তারেক রহমানের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে একই পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের একজন নেতা জাতিসংঘের বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছেন—যা তাঁর দলীয় নেতাকর্মীদের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
বিজ্ঞাপন
তবে এবারের সফরের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে সরকার তুলে ধরছে বাংলাদেশের নতুন সরকারের নীতি, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের স্বার্থ ও অগ্রাধিকারকে আরও স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করাকে। জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনের বৈশ্বিক আলোচনায় টেকসই উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন, বৈষম্য, ঋণ সংকট, প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মতো বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। এই বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের নিজস্ব অভিজ্ঞতা, সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ বিশ্বনেতাদের সামনে তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছে বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম জাতিসংঘ ভাষণে তাই শুধু বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থাই নয়, ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের একটি রূপরেখাও উঠে আসবে বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম বলেন, এই সফর বাংলাদেশের নতুন সরকারের নতুন যাত্রাকে বিশ্বপরিসরে তুলে ধরার পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। নিউইয়র্কের কর্মসূচি শেষে ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে দেশের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বার্তা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের দিকে এখন নজর রাখছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়।








