Logo

জাতিসংঘের প্রথম ভাষণে যা বলেছিলেন খালেদা জিয়া

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৪৭
জাতিসংঘের প্রথম ভাষণে যা বলেছিলেন খালেদা জিয়া
ছবি: সংগৃহীত

১৯৯৩ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪৮তম অধিবেশনে দেওয়া প্রথম ভাষণে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা, উন্নয়ন, পানির ন্যায্য অধিকার, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেছিলেন। জাতিসংঘের সরকারি নথিতে ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবরের ওই বক্তব্যটি সংরক্ষিত রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

ভাষণে খালেদা জিয়া গণতন্ত্র ও উন্নয়নকে পরস্পর সম্পর্কযুক্ত হিসেবে তুলে ধরে বলেন, দারিদ্র্য মোকাবিলার সক্ষমতার ওপর বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার সাফল্য অনেকাংশে নির্ভরশীল। উন্নয়নশীল দেশগুলোর গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে সমর্থন করতে উন্নত দেশগুলোর সহযোগিতার আহ্বানও জানান তিনি।

তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্র ও উন্নয়ন পরস্পরকে শক্তিশালী করে।’ একই সঙ্গে বাংলাদেশের সীমিত সম্পদ, পুঁজি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার কথা তুলে ধরে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করেন।

খালেদা জিয়া বলেন, ‘সম্পদের সীমাবদ্ধতায় আমরা যখন প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি, তখন একা এই কঠিন কাজ সম্পন্ন করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়; আমাদের সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।’

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, মানবাধিকার ও গণতন্ত্রকে বাংলাদেশের উন্নয়ন-ভাবনার সঙ্গে যুক্ত করে তিনি বলেন, ‘জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, মানবাধিকার ও গণতন্ত্র সুসংহত করার মাধ্যমে একটি সমৃদ্ধ সমাজ ও অর্থনীতি গড়ে তোলাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।’

বৃহৎ ও ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং আন্তর্জাতিক আইনের শাসনের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। ক্ষুদ্র ও দুর্বল দেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক আইনকে কার্যকর করার আহ্বান জানান।

ভাষণের গুরুত্বপূর্ণ অংশজুড়ে ছিল অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন, সমুদ্র আইন ও পরিবেশ সুরক্ষা। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ৫৪টি অভিন্ন নদীর প্রসঙ্গ তুলে ধরে খালেদা জিয়া অভিন্ন নদীর পানিসম্পদের ওপর বাংলাদেশের ‘অন্তর্নিহিত ও আইনগত অধিকার’-এর কথা বলেন।

বিজ্ঞাপন

ফারাক্কা বাঁধ প্রসঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানি প্রত্যাহারের ফলে বাংলাদেশে খরা ও পানির সংকট তৈরি হয় এবং বর্ষায় অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দিলে বন্যার সৃষ্টি হয়। তিনি বলেন, ‘ফারাক্কা বাঁধ আমাদের জন্য জীবন-মরণ সমস্যায় পরিণত হয়েছে।’

নদীর পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ার সঙ্গে মরুকরণ, লবণাক্ততা, নৌচলাচল ব্যাহত হওয়া এবং কৃষি, শিল্প ও মানুষের জীবিকার ক্ষতির সম্পর্ক তুলে ধরে গঙ্গার পানির ন্যায্য বণ্টনের জন্য জরুরি ও স্থায়ী চুক্তির আহ্বান জানান তিনি।

পরিবেশ সুরক্ষার ক্ষেত্রে শিল্পোন্নত দেশগুলোর দায়বদ্ধতার বিষয়টিও ভাষণে উঠে আসে। খালেদা জিয়া যুক্তি দেন, পরিবেশদূষণে তুলনামূলকভাবে বেশি অবদান রাখা দেশগুলোরই পরিবেশগত ক্ষতি মোকাবিলার ব্যয় বহনের দায়িত্ব নেওয়া উচিত।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের পাটশিল্পের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, রাসায়নিক ও কৃত্রিম বিকল্পের তুলনায় পাটজাত পণ্য পরিবেশবান্ধব। কৃত্রিম তন্তুর বিস্তার পাটশিল্প ও এর ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবিকার জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে বলেও উল্লেখ করেন।

উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে প্রযুক্তিগত বৈষম্য কমাতে প্রযুক্তি ও তথ্যের অবাধ প্রবাহের আহ্বান জানান খালেদা জিয়া। তিনি বলেন, ‘আমরা প্রযুক্তির অবাধ প্রবাহ চাই।’

প্রযুক্তি হস্তান্তর ও তথ্যপ্রবাহে বিধিনিষেধকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অগ্রগতির অন্যতম বাধা হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে শুধু বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভর না করে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দেন। বৈষম্যমূলক বাণিজ্যব্যবস্থা দূর করা, উত্তর-দক্ষিণ বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার এবং উরুগুয়ে রাউন্ডের আলোচনা দ্রুত শেষ করার আহ্বান জানান তিনি।

খালেদা জিয়া বলেন, ‘বাংলাদেশে আমরা বৈদেশিক বিনিয়োগের জন্য অত্যন্ত অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করেছি।’

দেশের অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন প্রসঙ্গে অর্থনৈতিক সংস্কার, কৃষি, শিল্প ও শিক্ষা খাতে অগ্রগতির কথা তুলে ধরেন তিনি। ‘শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য’ কর্মসূচি, ২০০০ সালের মধ্যে সাক্ষরতার হার ৬০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য, খাদ্যশস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার প্রচেষ্টা এবং দরিদ্র মানুষের পুষ্টি নিশ্চিত করতে ‘ডাল-ভাত’ কর্মসূচির কথাও উল্লেখ করেন।

বিজ্ঞাপন

স্যানিটেশন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

তৎকালীন সার্ক চেয়ারপারসন হিসেবে খালেদা জিয়া দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরেন। ১৯৯৩ সালের এপ্রিলে ঢাকায় অনুষ্ঠিত সপ্তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে দারিদ্র্য বিমোচন, বাণিজ্য, শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

ভারতের সঙ্গে পানিবণ্টন সমস্যার পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বিরোধ শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাস্তুচ্যুত শরণার্থীদের প্রত্যাবাসন এবং মিয়ানমার থেকে আসা প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়ার বিষয়ও ভাষণে উঠে আসে। নিরাপদ ও স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরিতে মিয়ানমার ও ইউএনএইচসিআরের সঙ্গে বাংলাদেশের কাজের কথা জানান তিনি।

আন্তর্জাতিক সংঘাতের প্রসঙ্গে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনায় সহিংসতা ও জাতিগত নিপীড়নের নিন্দা জানান খালেদা জিয়া। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ হিসেবে নামিবিয়া, উপসাগরীয় অঞ্চল, কুয়েত, কম্বোডিয়া, সোমালিয়া ও মোজাম্বিকে দেশের অবদানের কথাও তুলে ধরেন।

জাতিসংঘের আর্থিক সংকট মোকাবিলা এবং শান্তিরক্ষা সক্ষমতা জোরদারে ধনী সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতা চান তিনি। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকারের প্রতি সমর্থন এবং দক্ষিণ আফ্রিকার জনগণের সমঅধিকার ও সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসনের সংগ্রামের প্রতিও বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

ভাষণের শেষ দিকে খালেদা জিয়া ১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের একাদশ বিশেষ অধিবেশনে তার স্বামী তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দেওয়া ভাষণের কথা স্মরণ করেন।

মানবজাতির উন্নত জীবনের জন্য ‘সাহসী ও সৃজনশীল পদক্ষেপ’ এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘বিশ্বশান্তি ও স্থিতিশীলতার অগ্রযাত্রায় আমরা একটি সংকটপূর্ণ সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছি।’

আইনের শাসন জোরদার, শান্তিপূর্ণ উপায়ে সংঘাত নিরসন এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নের আহ্বান জানিয়ে খালেদা জিয়া এমন একটি বিশ্বব্যবস্থার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন, যেখানে ‘গণতন্ত্র, শান্তি, উন্নয়ন ও মানবকল্যাণ’ সবার জন্য নিশ্চিত হবে।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ছেড়েছেন এবং ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে তাঁর প্রথম ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে। পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম জানিয়েছেন, ভাষণে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক নবযাত্রা, আইনের শাসন ও জবাবদিহি, বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, রোহিঙ্গা সংকট, যুব ও নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা-স্বাস্থ্য, আধুনিক প্রযুক্তির ন্যায়সঙ্গত ব্যবহার এবং বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার সংস্কারের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে ৮১তম অধিবেশন শুরু হয়েছে এবং এর সভাপতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খালিলুর রহমান। অধিবেশনের এবারের প্রতিপাদ্য ‘Restoring Trust, Managing Transformation: A United Nations That Delivers for All’।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD