রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র দখলে পুরোনো তৎপরতার নতুন অভিযোগ

মিরপুর-১-এর ডি ব্লকে ১০ কাঠা জমির ওপর প্রায় পাঁচ দশক ধরে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার। ১৯৭৬ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি নারী ও শিশুদের বিনামূল্যে প্রাথমিক চিকিৎসা, প্রসূতি ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা দিয়ে আসছে। পাশাপাশি সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) কার্যক্রমও পরিচালিত হয়ে আসছে এখানে।
বিজ্ঞাপন
স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির ব্যবহৃত জমিটি গৃহায়ন ও গণপূর্ত কর্তৃপক্ষের। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অনাপত্তিপত্রের শর্তে ১৯৮৪ সালে রাড্ডাকে সেখানে স্বাস্থ্য ও টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হয়। এরপর থেকে প্রায় পাঁচ দশক ধরে ওই জমিতে সেবামূলক কার্যক্রম চালিয়ে আসছে প্রতিষ্ঠানটি।
জমিটি স্থায়ীভাবে পাওয়ার দাবিতে রাড্ডার পক্ষ থেকে উচ্চ আদালতে একটি রিট করা হয়েছে, যা এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। একই জমির মালিকানা ও বরাদ্দ নিয়ে আদালতে পাল্টাপাল্টি মামলাও চলমান রয়েছে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
এদিকে ২০০৫ সাল থেকে বরাদ্দের সূত্রে জমিটির মালিকানা দাবি করে আসছে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় মালিক সমিতি’। গত ২৯ সেপ্টেম্বর গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রীর কাছে জমিটি নিয়ে একটি আবেদনও করেছে সংগঠনটি। ওই আবেদনে সমিতির তৎকালীন সভানেত্রী ও বর্তমান সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য বিএনপি নেত্রী ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির স্বাক্ষর রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, রাড্ডার জমিটি দখলের চেষ্টা নতুন নয়। ২০০৯ ও ২০১৯ সালে অন্তত তিনটি পৃথক পক্ষ জমিটি দখলের উদ্যোগ নিয়েছিল। স্থানীয়দের বাধা এবং নিজেদের মধ্যে বিরোধের কারণে তাদের কেউ সফল হয়নি।
বিজ্ঞাপন
২০১৫ সালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার নির্বাচিত হওয়ার পর কাজী টিপু সুলতানও জমিটিকে পারিবারিক সম্পত্তি দাবি করে দখলের চেষ্টা করেছিলেন বলে স্থানীয়রা জানান। তবে জমিটি সরকারি খাস জমি হিসেবে রেকর্ডভুক্ত থাকায় তিনি তা দখলে নিতে পারেননি।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর টিপু সুলতান ও তার অনুসারীরা এলাকা ছাড়েন। এরপর জমিটি দখলকে কেন্দ্র করে বিএনপির দুটি পক্ষ সক্রিয় হয়ে ওঠে বলে স্থানীয়দের দাবি। একটি পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। অপর পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা জগলুর পাশা পাপেল, যিনি সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সানজিদা আক্তার তুলির অনুসারী হিসেবে পরিচিত। স্থানীয়দের ভাষ্য, দুই পক্ষই ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি’র ব্যানারে জমিটি দখলের চেষ্টা করছে।
রাড্ডার নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতার বলেন, জায়গাটি গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের। তারা ১৯৭৬ সাল থেকে সেখানে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। ১৯৮৪ সালে সরকারের সঙ্গে রাড্ডার একটি চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি যতদিন স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালনা করবে, ততদিন সেখানে সেবা দেওয়ার সুযোগ থাকার কথা।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, এরপর থেকে একদিনের জন্যও সেবাকেন্দ্রটি বন্ধ হয়নি। এখান থেকে সরকারের ইপিআই টিকাদান কর্মসূচির ৬০ শতাংশ কাভারেজ, পরিবার পরিকল্পনা এবং প্রসূতি নারীদের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হতো। এ কারণে দরিদ্র মানুষের কাছে প্রতিষ্ঠানটি ‘গরিবের হাসপাতাল’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। এর আগেও একাধিকবার এটি দখলের চেষ্টা হয়েছে বলে জানান তিনি। এ নিয়ে একটি মামলা এখনো চলমান রয়েছে।
সেবাকেন্দ্রে হামলার আগে সমমনা দোকানদার সমিতি বা সরকারের পক্ষ থেকে কোনো যোগাযোগ করা হয়েছিল কি না জানতে চাইলে ডা. নাসরিন আখতার বলেন, ‘না, এ বিষয়ে আমাদের সঙ্গে কেউ কখনো যোগাযোগ করেনি।’
স্থানীয় বাসিন্দা ও মুক্তিযোদ্ধা মার্কেটের ব্যবসায়ী মো. রেজাউল ইসলাম বলেন, রাড্ডা থেকে এলাকার ধনী-গরিব সবাই প্রাথমিক চিকিৎসা নেন। কারও জমির ওপর আইনি দাবি থাকলে আদালত ও প্রশাসনের মাধ্যমে তা নিষ্পত্তি করা উচিত। রাতের আঁধারে বুলডোজার দিয়ে একটি সেবাপ্রতিষ্ঠান গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় কাগজপত্র নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষ্য, ছোটবেলা থেকেই তারা জায়গাটিকে সরকারি সম্পত্তি হিসেবে জেনে আসছেন এবং বিভিন্ন সময় ক্ষমতাসীন দলের লোকজন জায়গাটি দখলের চেষ্টা করেছে।
বিজ্ঞাপন
হামলার পর সেবাকেন্দ্র থেকে লুট হওয়া মালামালের বিষয়ে ডা. নাসরিন আখতার বলেন, আনুমানিক দেড় কোটি টাকার সম্পদ লুট হয়েছে। এর মধ্যে ইপিআই টিকা, সরকারি টিকাদান রেজিস্টার ও নথি, পরিবার পরিকল্পনার বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও উপকরণ, ওষুধ ও ভ্যাকসিন, দুটি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন, একটি জেনারেটর, দুটি কম্পিউটার, প্রিন্টার, তিনটি ফ্রিজ, তিনটি এসি, তিনটি স্টিলের আলমারি, সিসিটিভি ক্যামেরা, চেয়ার-টেবিলসহ বিভিন্ন আসবাব রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সবচেয়ে বড় ক্ষতির একটি দিক হলো শিশুদের টিকাদানের প্রয়োজনীয় নথিপত্র নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে সেবাকেন্দ্রে আসা শিশুদের পরবর্তী টিকার জন্য ফোন করা হতো। এখন নথিগুলো না থাকায় অনেক শিশু টিকাদান থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
হামলার অভিযোগের বিষয়ে সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি ও মোস্তফা জগলুর পাশা পাপেলের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা ফোন ধরেননি।
বিজ্ঞাপন
রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ধ্বংসস্তূপ পরিদর্শন করেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। তিনি বলেন, এত বড় ধ্বংসযজ্ঞ দেখে তিনি অত্যন্ত মর্মাহত হয়েছেন। একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানকে রাতের অন্ধকারে বুলডোজার এনে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা ধরে গুঁড়িয়ে দেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। এ ধরনের কর্মকাণ্ড সরকার প্রশ্রয় দেয় না বলেও জানান তিনি।
আমিনুল হক বলেন, ঘটনায় পুলিশ প্রশাসন ব্যবস্থা নিয়েছে। দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে শাহ আলী থানার ওসিকে ক্লোজ করা হয়েছে এবং জড়িতদের শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে। প্রায় ৫০ বছর ধরে অসহায় ও দরিদ্র মানুষকে সেবা দেওয়া প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম কোনোভাবেই ব্যাহত হতে দেওয়া হবে না।

জমিটির মালিকানা প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এটি গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের জায়গা। এ বিষয়ে তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন। কারও আইনি দাবি থাকলে আদালত ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা উপস্থাপন করতে হবে। রাতের আঁধারে বুলডোজার দিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভেঙে ফেলার অধিকার কারও নেই।
বিজ্ঞাপন
হামলার সময় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
রাত সাড়ে ১২টা থেকে প্রায় ৩টা পর্যন্ত রাড্ডা সেবাকেন্দ্রে ভাঙচুর ও ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে এই ঘটনা চললেও পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে হামলাকারীদের ঠেকানোর চেষ্টা করেনি—এমন অভিযোগের পর পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
রাড্ডার প্রশাসক ও কোষাধ্যক্ষ মো. আহসান হাবিব বলেন, হামলার সময় প্রতিষ্ঠানের দুই নিরাপত্তাকর্মী অনিন্দ্র সরকার ও আব্দুল হাইকে মারধর করে বেঁধে রাখা হয়েছিল। তাদের উদ্ধারের জন্য প্রথমে তিনি ওসিকে ফোন করেন। পরে থানায় গিয়ে ব্যক্তিগতভাবেও অনুরোধ জানান। কিন্তু পুলিশের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। পুলিশ শুধু বলেছে, ‘ওদের কিছু হবে না।’
বিজ্ঞাপন
জামাল নামে স্থানীয় এক বাসিন্দার দাবি, সেবাকেন্দ্র থেকে থানার দূরত্ব এক কিলোমিটারেরও কম। অথচ টানা প্রায় চার ঘণ্টা হামলা ও লুটপাট চললেও পুলিশের তৎপরতা দেখা যায়নি। বিষয়টি তার কাছে সন্দেহজনক বলে মনে হয়েছে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
তবে পুলিশের গাফিলতির অভিযোগ তদন্তে উঠে এসেছে বলে জানিয়েছেন মিরপুর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার। রবিবার তিনি জানান, তদন্ত কমিটি পুলিশের গাফিলতির প্রমাণ পেয়েছে এবং সেদিনই প্রতিবেদনটি ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারের কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকও পুলিশের গাফিলতির বিষয়টি সামনে আসার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, দায়িত্বে অবহেলার কারণে শাহ আলী থানার ওসিকে ক্লোজ করা হয়েছে। তদন্তে আরও কেউ জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গ্রেপ্তার ছয় আসামি কারাগারে
বিজ্ঞাপন
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় শাহ আলী থানায় করা মামলায় ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আদালত তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—মো. শাহাদাত হোসেন (৩৩), কাজী মকবুল হোসেন (৫৮), মো. শাহআলম (৫৩), মো. আতিকুর রহমান (৩৩), মো. কামরুল ইসলাম (৫২) ও মো. শাকিল (২০)।








