ধোলাইখালে ময়লার স্তূপ ঠেকাতে তরুণদের ‘সবুজ লড়াই’

পুরান ঢাকার ধোলাইখালের সংস্কার করা সড়ক এখন আগের তুলনায় অনেক পরিচ্ছন্ন ও নান্দনিক। সড়কের দুই পাশে নতুন টাইলস বসানো হয়েছে, সংস্কারের পর ফিরেছে সৌন্দর্য। তবে দীর্ঘদিন ধরে সড়ক বিভাজকে জমে থাকা ময়লা-আবর্জনা সেই সৌন্দর্যে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। দুর্গন্ধ, পলিথিন, বাসাবাড়ির বর্জ্য ও দোকানের আবর্জনায় বিভাজকটি অনেকটা ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছিল।
বিজ্ঞাপন
এমন পরিস্থিতিতে সরকারি কোনো বড় প্রকল্পের অপেক্ষায় না থেকে স্থানীয় কয়েকজন তরুণ নিজেরাই উদ্যোগ নেন। নিজেদের অর্থে ফুল ও ফলের গাছ কিনে প্রায় ৬৫০ ফুট দীর্ঘ সড়ক বিভাজকের বিভিন্ন স্থানে তা লাগানো হয়। গাছ রক্ষায় তৈরি করা হয় অস্থায়ী বেষ্টনী। পাশাপাশি স্থানীয়দের সচেতন করতে মাইকিং, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও প্রকাশ এবং সরাসরি প্রচারণাও চালানো হচ্ছে।
এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্যোক্তা স্থানীয় ব্যবসায়ী ইসমাইল হোসেন সজল। তিনি জানান, শুরুটা হয়েছিল ময়লা নিয়ে, গাছ দিয়ে নয়। সড়ক ও বিভাজক ভাঙাচোরা থাকা অবস্থায় সেখানে ময়লা জমে থাকত। বিষয়টি নিয়ে ভিডিও তৈরি ও মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা করতেন তিনি। পরে সড়ক সংস্কার, বিভাজক মেরামত ও ফুটপাতে টাইলস বসানোর পরও ময়লা ফেলার অভ্যাস না বদলানোয় কয়েকজন বন্ধু মিলে বিভাজকে গাছ লাগানোর পরিকল্পনা করেন।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
প্রথমে নিজেদের বাসার সামনে কয়েকটি গাছ লাগানো হয়। পরে স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশংসা পাওয়ায় উদ্যোগটি বড় হয়। সজলের দেওয়া হিসাবে, নিজেদের অর্থায়নে তারা ৮০ থেকে ৮৫টি গাছ লাগিয়েছেন। স্থানীয় মানুষ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে পাওয়া গাছসহ সব মিলিয়ে সংখ্যাটি শতাধিক।
উদ্যোক্তাদের দাবি, গাছ লাগানোর পর বিভাজকে বর্জ্য ফেলার প্রবণতা অনেকটাই কমেছে। সজল বলেন, প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকায় তারা ময়লা ফেলা ঠেকাতে পেরেছেন। বাকি অংশেও কাজ চলছে।
বিজ্ঞাপন
তবে শুধু গাছ লাগিয়েই সমস্যার সমাধান হয়নি। কিছু মানুষ এরপরও গাছের আশপাশে ময়লা ফেলতে থাকেন। তাই নির্দিষ্ট কিছু অংশে বেষ্টনী দেওয়া হয়। বিশেষ করে পথচারীরা যেসব জায়গা দিয়ে রাস্তা পার হন, সেসব স্থানের দুই পাশে প্রায় ১০ ফুট করে জায়গা ঘিরে দেওয়া হয়েছে। উদ্দেশ্য, বাইরে থেকে যেন সহজে কেউ ময়লার ব্যাগ ছুড়ে দিতে না পারেন।
এরপরও কেউ কেউ বেষ্টনীর ফাঁক দিয়ে কিংবা ওপর দিয়ে ময়লা ফেলার চেষ্টা করছেন। এমন পরিস্থিতিতে উদ্যোক্তারা আরও একটি কৌশল নেন। বিভাজকের কিছু অংশে আশপাশের মসজিদের ছবি ও ব্যানার ব্যবহার করা হয়। তাদের ধারণা, ধর্মীয় স্থাপনার ছবি সামনে থাকলে মানুষের মধ্যে ময়লা ফেলার বিষয়ে নৈতিক সংকোচ তৈরি হতে পারে।
স্থানীয় সামাজিক উদ্যোক্তা মো. সাদ্দাম উল করিম জানান, তারা প্রতিদিন সন্ধ্যার দিকে গাছগুলোতে পানি দেন। বৃষ্টির দিনে কখনো বিরতি পড়লেও নিয়মিত পরিচর্যার কারণে গাছগুলো ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে। তবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার স্থায়ী সমাধান না হলে তাদের পক্ষে একা পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন।
বিজ্ঞাপন
এখানেই সামনে আসছে নগরের পুরোনো একটি প্রশ্ন—বাসাবাড়ির ময়লা মানুষ ফেলবে কোথায়?
উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, অনেক বাসাবাড়ি থেকে নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ করা হয় না। ফলে বাসিন্দাদের কেউ কেউ ময়লা সরিয়ে নেওয়ার পরিবর্তে রাস্তা বা বিভাজকে ফেলে দেন। সাদ্দাম উল করিমের মতে, নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ নিশ্চিত করা গেলে রাস্তায় ময়লা ফেলার প্রবণতা আরও কমবে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. নাদিম মাসুদও মনে করেন, শুধু সচেতনতা দিয়ে সমস্যার পুরোপুরি সমাধান সম্ভব নয়। তিনি জানান, বেষ্টনী দেওয়ার পরও কেউ কেউ তার ভেতরে বা ওপর দিয়ে ময়লা ফেলছেন। তরুণদের পক্ষে ২৪ ঘণ্টা সেখানে পাহারা দেওয়া সম্ভব নয়, কারণ তাদের নিজেদের ব্যবসা ও কাজ রয়েছে। তার দাবি, উদ্যোগের ফলে ময়লা ফেলার পরিমাণ আগের তুলনায় প্রায় ৯০ শতাংশ কমেছে। পাশাপাশি তারা মাঝেমধ্যে মাইকিং করেও মানুষকে সচেতন করেন।
বিজ্ঞাপন
ময়লা কারা ফেলছেন, তা নিয়েও স্থানীয়দের বক্তব্য এক নয়। নাদিম মাসুদের দাবি, স্থানীয় ব্যবসায়ী ও স্থায়ী বাসিন্দারা তুলনামূলক কম ময়লা ফেলেন। আশপাশের ভাড়াবাড়ির কিছু বাসিন্দা কিংবা তাদের গৃহকর্মীরা রাস্তার পাশে বর্জ্যের ব্যাগ রেখে যান বলে তিনি অভিযোগ করেন। তবে এ বক্তব্যকে এলাকার সব বাসিন্দার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বলা যায় না। অন্যদিকে স্থানীয় বাসিন্দাদের কেউ কেউ বর্জ্য সংগ্রহের অনিয়মকেও বড় কারণ হিসেবে দেখছেন।
রায়সাহেব বাজার এলাকার বাসিন্দা মশিউর রহমান বলেন, সড়কে ময়লা পড়ে থাকা কেউই চান না। কিন্তু সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত বর্জ্য সংগ্রহকারীরা কখনো নিয়মিত না এলে বাসাবাড়িতে ময়লা জমে যায়। তখন কেউ কেউ রাস্তার দিকে বর্জ্য ফেলে আসেন। তবে তিনি নিজে যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলার পক্ষে নন এবং কাউকে এমন করতে দেখলে নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা ফেলার পরামর্শ দেন।
সড়ক বিভাজকে ময়লা জমে থাকায় পথচারীদেরও ভোগান্তি হতো। কবি নজরুল সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী রোকেয়া পারভীন জানান, রাস্তা পার হওয়ার সময় ময়লার দুর্গন্ধে অনেক সময় ঘুরে যেতে হতো। এখন ময়লা কমে যাওয়ায় পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে বলে তিনি জানান। স্থানীয় তরুণদের উদ্যোগকে প্রশংসনীয় উল্লেখ করে অন্যদেরও এমন কাজে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বিজ্ঞাপন
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মশিউর রহমানের মতে, সড়ক বিভাজক কেবল রাস্তা আলাদা করার কাঠামো নয়; নগরের নিরাপত্তা, সৌন্দর্য ও নাগরিক পরিবেশের সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে। তার অভিযোগ, কিছু ক্ষেত্রে বিভাজকের ওপর ব্যবসায়িক সামগ্রী রাখার কারণেও এর মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়।
স্থানীয় সামাজিক উদ্যোক্তাদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাইয়ের শুরুতে ধোলাইখালের ওই অংশে গাছ লাগানোর কাজ শুরু হয়। প্রথমে কয়েকজন বন্ধু উদ্যোগ নিলেও পরে স্থানীয় অন্যরাও যুক্ত হন। কেউ গাছ দিয়েছেন, কেউ অর্থ দিয়ে সহায়তা করেছেন, আবার কেউ পরিচর্যায় অংশ নিয়েছেন। এভাবেই প্রায় ৬৫০ ফুট সড়ক বিভাজকের বড় একটি অংশ গাছ ও বেষ্টনীতে রূপ পেয়েছে।
তবে উদ্যোগটির সামনে রয়েছে কিছু বাস্তব প্রশ্ন। সরকারি সড়ক বিভাজকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে গাছ লাগানো ও বেষ্টনী দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন কি না, গাছগুলোর দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা কে করবে এবং নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ নিশ্চিত না হলে বাসাবাড়ির বর্জ্য কোথায় যাবে—এসব প্রশ্নের স্থায়ী সমাধান জরুরি।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-৫-এর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা আক্তার উননেছা শিউলী স্থানীয় তরুণদের উদ্যোগকে ভালো কাজ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি জানান, ধোলাইখালের অংশবিশেষ তাদের আওতাধীন। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, গাছ লাগানো ও বেষ্টনী দেওয়ার বিষয়ে বিস্তারিত খোঁজ নিয়ে বক্তব্য জানাবেন বলেও জানান তিনি। তবে পরে লিখিত প্রশ্ন পাঠানো হলেও তার কাছ থেকে আর কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
বিজ্ঞাপন
অঞ্চল-৪-এর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ মিজানুর রহমান মিয়ার বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোনকল রিসিভ করেননি।
আইনজীবী মাহিয়া বিনতে মাহাবুবের মতে, ধোলাইখালের ঘটনাটি শুধু গাছ লাগানোর উদ্যোগ নয়; এর সঙ্গে নাগরিক আচরণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং সরকারি সেবার বিষয়ও জড়িত। একজন নাগরিকের পক্ষে সারাদিন রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে নজরদারি করা যেমন সম্ভব নয়, তেমনি কয়েকজন তরুণের পক্ষেও ২৪ ঘণ্টা বেষ্টনী পাহারা দেওয়া সম্ভব নয়। তাই নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহের পাশাপাশি নাগরিক সচেতনতা ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।
ধোলাইখালের বিভাজকে এখন যে ছোট ছোট গাছগুলো বেড়ে উঠছে, সেগুলো তাই শুধু সৌন্দর্যবর্ধনের উপকরণ নয়। ময়লার জায়গাকে সবুজ করে তোলার মাধ্যমে স্থানীয় তরুণরা নাগরিকদের কাছে একটি বার্তাই পৌঁছে দিতে চাইছেন—সড়ক ও এর বিভাজক ময়লা ফেলার জায়গা নয়, এটি সবার শহরের অংশ।








