বগুড়ায় বড় হচ্ছে ব্যাটারির বাজার, পুরোনো ব্যাটারিতে বাড়ছে ঝুঁকি

বগুড়ায় অটো-ইজি বাইক, রিকশা, সোলার ও আইপিএসের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাটারির বাজারও দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। নতুন ব্যাটারির চাহিদার পাশাপাশি তৈরি হয়েছে ব্যবহৃত ব্যাটারির বড় বাজার। তবে পুরোনো ব্যাটারি ভেঙে বা পুড়িয়ে সিসা সংগ্রহের কার্যক্রম পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে।
বিজ্ঞাপন
জেলার শিবগঞ্জে চার ফসলি কৃষিজমির পাশে অনুমোদনহীন একটি কারখানায় পুরোনো ব্যাটারি পোড়ানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, দিনের বেলায় কারখানাটি বন্ধ থাকলেও রাতে সেখানে চুল্লিতে আগুন জ্বালিয়ে ব্যাটারি পোড়ানো হয়। এতে কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের এলাকায়।
স্থানীয় কৃষক আরিম মন্ডল অভিযোগ করেন, কারখানার ধোঁয়ায় মাঠের ফসল ও গবাদিপশু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কয়েকজন বাসিন্দার দাবি, ধোঁয়ার কারণে চোখ, ত্বক ও শ্বাসতন্ত্রে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
সরেজমিনে কারখানাটি বন্ধ অবস্থায় পাওয়া যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাতের বেলায় সেখানে পুরোনো ব্যাটারি পোড়ানো হয়। কারখানার মালিক তারেক হোসেন ফোনে কারখানাটি বন্ধ থাকার কথা জানিয়ে বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতির জন্য আবেদন করা হয়েছে এবং তারা নিয়মের বাইরে কিছু করেন না।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
তবে পরিবেশ অধিদপ্তর জানিয়েছে, পুরোনো ব্যাটারি পুড়িয়ে সিসা সংগ্রহের মতো কার্যক্রমের কোনো অনুমতিপত্র তারা দেয় না। পরিবেশ অধিদপ্তর রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক নিলুফা ইয়াসমিন বলেন, ‘পুরোনো ব্যাটারি পুড়িয়ে সিসা সংগ্রহের মতো কোনো কারখানার অনুমতিপত্র পরিবেশ অধিদপ্তর দেয় না। এ ধরনের কার্যক্রম বেআইনি। পুরোনো ব্যাটারির সিসা পোড়ালে সৃষ্ট ধোঁয়ায় পরিবেশ দূষিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
বিজ্ঞাপন
বাড়ছে নতুন ব্যাটারির বাজার
ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অটো-ইজি বাইক ও রিকশার পাশাপাশি সোলার ও আইপিএস ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ায় বগুড়ায় বিভিন্ন ধরনের ব্যাটারির বিক্রি বেড়েছে। বর্তমানে বাজারে ১ লাখ ১০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত দামের লিথিয়াম ব্যাটারিও পাওয়া যাচ্ছে।
কে অ্যান্ড কে ট্রেড সেন্টারের মালিক আনোয়ার পারভেজ জানান, তার দোকানে প্রতি মাসে প্রায় ১৫০ সেট ব্যাটারি বিক্রি হয়। এর মধ্যে প্রায় ১০০ সেট ওয়েট বা তরলভিত্তিক লেড-অ্যাসিড ব্যাটারি ইজি বাইকের জন্য এবং প্রায় ৫০ সেট পাউডার বা শুষ্ক-কোষ/জেল ব্যাটারি রিকশার জন্য বিক্রি হয়।
বিজ্ঞাপন
তার তথ্য অনুযায়ী, ইজি বাইকের এক সেট ওয়েট ব্যাটারির দাম ৫৮ হাজার থেকে ৬৫ হাজার টাকা। পাউডার ব্যাটারির এক সেটের দাম ২৬ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা। কিং পাওয়ার, দোয়াদো ও ডিজেডডিসি ব্র্যান্ডের ব্যাটারির চাহিদাও রয়েছে।
বিসমিল্লাহ ব্যাটারি হাউসের জোবায়ের হোসেন ফাহাদ জানান, তার দোকানে প্রতি মাসে প্রায় ১১০ সেট ওয়েট ব্যাটারি এবং ৮০ সেট পাউডার ব্যাটারি বিক্রি হয়। অন্যদিকে দেশ পাওয়ারের এম.এ. সাঈদ জানান, তার দোকানে মাসে প্রায় ১০০ সেট ব্যাটারি বিক্রি হয়।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, কাঁচামাল, উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়ায় প্রায় সব ধরনের প্রচলিত ব্যাটারির দামও বেড়েছে। গত তিন বছরে বিভিন্ন ব্যাটারির দাম ২ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে বলে তাদের দাবি।
বিজ্ঞাপন
বর্তমানে সাধারণ লেড-অ্যাসিড ব্যাটারির দাম ১৩ হাজার ৫০০ থেকে ১৬ হাজার ৫০০ টাকা। আইপিএস ব্যাটারি সক্ষমতা ও ব্র্যান্ডভেদে ১২ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা এবং গাড়ির ব্যাটারি ১৭ হাজার ৫০০ থেকে ১৮ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সোলার ব্যাটারির চাহিদাও বাড়ছে। ছোট আকারের সোলার ব্যাটারি ৪ হাজার টাকা থেকে পাওয়া যায়। ৬০ অ্যাম্পিয়ারের একটি ব্যাটারির দাম প্রায় ৭ হাজার ৮০০ টাকা এবং ৮০ অ্যাম্পিয়ারের ব্যাটারি প্রায় ১০ হাজার ৫০০ টাকা।
পুরোনো ব্যাটারিরও বড় বাজার
বিজ্ঞাপন
নতুন ব্যাটারি কেনার সময় গ্রাহকের পুরোনো ব্যাটারি সাধারণত দোকানে জমা পড়ে। পরে সেগুলো ভাঙারি ব্যবসায়ীদের কাছে যায়। সেখান থেকে পুরোনো ব্যাটারির একটি অংশ বিভিন্ন কারখানায় পৌঁছে যায়, যেখানে ব্যাটারি ভেঙে বা পুড়িয়ে সিসা সংগ্রহ করা হয়।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
কে অ্যান্ড কে ট্রেড সেন্টারে পুরোনো ওয়াটার-টাইপ লেড-অ্যাসিড ব্যাটারি সর্বোচ্চ ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত দরে এবং পাউডার-টাইপ ব্যাটারি প্রতি কেজি ১৯৫ থেকে ২০০ টাকা দরে কেনা হয়। অন্য দোকানগুলোতেও ওজন ও ধরনভেদে পুরোনো ব্যাটারির আলাদা দাম রয়েছে।
ব্যবসায়িক এই চেইনে দোকান থেকে পুরোনো ব্যাটারি প্রথমে ভাঙারি ব্যবসায়ীর কাছে যায়। এরপর সেগুলো সিসা সংগ্রহের কাজে ব্যবহৃত কারখানায় পৌঁছায়। অনিরাপদ প্রক্রিয়ায় ব্যাটারি পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করার ফলে দূষণের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
সিসা দূষণ নিয়ে সতর্কতা
বিজ্ঞাপন
পুরোনো লেড-অ্যাসিড ব্যাটারি অনিরাপদভাবে পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করার পরিবেশ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছে জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক সংস্থা ইউএনইপি। সংস্থাটির এক মূল্যায়নে বাংলাদেশে ১ হাজার ১০০টির বেশি অনানুষ্ঠানিক ও অবৈধ ব্যাটারি পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব কার্যক্রমের আশপাশে উচ্চমাত্রার সিসা দূষণের প্রমাণ পাওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
ফলে বগুড়ার বাড়তে থাকা ব্যাটারির বাজার শুধু নতুন ব্যাটারি বিক্রির পরিসরেই সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যবহৃত ব্যাটারি সংগ্রহ, ভাঙারি ব্যবসা এবং সিসা আহরণের একটি বিস্তৃত চক্র। শিবগঞ্জে চার ফসলি জমির পাশে পুরোনো ব্যাটারি পোড়ানোর অভিযোগ সেই বাণিজ্যিক চক্রের পরিবেশগত ঝুঁকিকেই সামনে এনেছে।








