এলপিজির তীব্র সংকট, বেশি দামেও মিলছে না সিলিন্ডার

চট্টগ্রামে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। সরকারি নির্ধারিত দামের চেয়ে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা বেশি দিয়েও অনেক এলাকায় ১২ কেজির সিলিন্ডার মিলছে না। সরবরাহ সংকটের পাশাপাশি নতুন করে দাম বাড়ায় রান্নার গ্যাস নিয়ে ভোগান্তিতে পড়েছেন নগরবাসী।
বিজ্ঞাপন
দেশে এলপিজির আমদানি বাড়লেও চট্টগ্রামের বাজারে গত এক সপ্তাহ ধরে সরবরাহ সংকট চলছে। নগরের বিভিন্ন এলাকায় কোথাও সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না, আবার কোথাও অতিরিক্ত দাম দিয়ে গ্যাস কিনতে হচ্ছে। এর মধ্যে রোববার (৪ অক্টোবর) ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮১০ টাকা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। নতুন মূল্য ঘোষণার পর বাজারে দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশে প্রায় ১১ লাখ ২৮ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে আমদানি হয়েছিল প্রায় ৮ লাখ ৪৮ হাজার টন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আমদানি বেড়েছে প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার টন বা ৩৩ শতাংশ।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
এলপিজির প্রধান দুটি উপাদান বিউটেন ও প্রোপেনের আমদানিও বেড়েছে। ২০২৫ সালে বিউটেন আমদানি হয়েছিল প্রায় ৭ লাখ ৮ হাজার ৬৭২ টন। চলতি বছরে তা বেড়ে হয়েছে ৯ লাখ ৮২ হাজার ৫৮ টন, যা প্রায় ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। একই সময়ে প্রোপেন আমদানি ১ লাখ ৩৯ হাজার ৫২৬ টন থেকে বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৯৭৩ টন, অর্থাৎ প্রায় ৪ দশমিক ৬ শতাংশ বৃদ্ধি। আমদানি বাড়লেও চট্টগ্রামের বাজারে সরবরাহ সংকট কেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিজ্ঞাপন
নগরের বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, বাকলিয়া, চান্দগাঁও ও লালখান বাজারের বিভিন্ন বিক্রয়কেন্দ্রে এলপিজি সিলিন্ডার না পাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত মাসে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করা হলেও বিভিন্ন এলাকায় তা ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। কোথাও কোথাও বেশি দাম দিয়েও সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না।
রাহাত্তারপুল এলাকার বাসিন্দা মামুনুল ইসলাম বলেন, দুই সপ্তাহ আগে ১ হাজার ৭৫০ টাকায় ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনেছিলেন। এখন একই সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে ২ হাজার ২০০ টাকায়। তার অভিযোগ, সরকার দাম নির্ধারণ করলেও কার্যকর নজরদারির অভাবে বিক্রেতারা অতিরিক্ত দাম আদায় করছেন।
চকবাজার এলাকার বাসিন্দা সাদ্দাম হোসেন বলেন, বাজারে প্রকাশ্যে বেশি দামে গ্যাস বিক্রি হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর তদারকি চোখে পড়ছে না। নিয়মিত বাজার অভিযান ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না থাকায় বিক্রেতারা নিজেদের ইচ্ছামতো দাম আদায় করছেন।
বিজ্ঞাপন
চট্টগ্রামে এলপিজি সরবরাহকারী একটি প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার মুজিবুল হক বলেন, সকালে শুধু ফ্রেশ ব্র্যান্ডের ১২ কেজির সিলিন্ডার ছিল। পরে সেটিও শেষ হয়ে যায়। অনেক ক্রেতা বেশি দাম দিতেও রাজি ছিলেন। কিন্তু সরবরাহ না থাকায় কাউকে সিলিন্ডার দেওয়া সম্ভব হয়নি।
বহদ্দারহাট এলাকার সিলিন্ডার বিক্রেতা আব্দুল মুমিন বলেন, ডিলারদের কাছে গ্যাস চেয়েও পাচ্ছেন না। নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে কিনেও রশিদ ছাড়া লেনদেন করতে হচ্ছে। কম দামে কিনতে পারলে গ্রাহক পর্যায়েও কম দামে বিক্রি করা সম্ভব বলে জানান তিনি।
চট্টগ্রামে এলপিজির চাহিদা বাড়ার অন্যতম কারণ প্রাকৃতিক গ্যাসের ঘাটতি। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি)। এর বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় বাসাবাড়ি, শিল্পকারখানাসহ বিভিন্ন খাতে গ্যাস সংকট তৈরি হয়েছে। ফলে অনেক গ্রাহক বিকল্প জ্বালানি হিসেবে এলপিজির ওপর নির্ভর করছেন।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
তবে দেশে এলপিজির ঘাটতি নেই বলে দাবি করেছে বিইআরসি। সংস্থাটির উপপরিচালক (গ্যাস) ফিরোজ জামান জানান, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন কারণে এলপিজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। তবে চাহিদার বিপরীতে এলপিজির ঘাটতি নেই। এনবিআরের তথ্যের ভিত্তিতে আমদানি ব্যয়সহ অন্যান্য খরচ হিসাব করে এলপিজির দাম নির্ধারণ করা হয়।
বাজারে অতিরিক্ত দামে এলপিজি বিক্রির বিষয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম কার্যালয়ের উপপরিচালক ফয়েজ উল্যাহ বলেন, এলপিজি সরবরাহকারীদের ওপর তদারকি বাড়ানো হয়েছে। সরবরাহকারীদের দাবি, কোম্পানি পর্যায় থেকে তাদের বেশি দামে গ্যাস কিনতে হচ্ছে। কোম্পানিগুলো ভাউচার না দেওয়ায় ডিলাররা ভাউচার ছাড়া গ্যাস বিক্রি করছেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা ফাঁকফোকরগুলো চিহ্নিত করার চেষ্টা করছি। শিগগিরই বাজার তদারকির বিষয়টি আরও জোরদার করা হবে।’
বিজ্ঞাপন
আমদানি বাড়লেও চট্টগ্রামের বাজারে সরবরাহ সংকট, নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি অর্থ আদায় এবং নতুন মূল্যবৃদ্ধিতে এলপিজি নিয়ে অস্থিরতা বাড়ছে। প্রাকৃতিক গ্যাসের ঘাটতিতে বিকল্প জ্বালানির চাহিদা বাড়লেও সরবরাহ ও বাজার তদারকির সমস্যায় ভোক্তাদের ভোগান্তি অব্যাহত রয়েছে।








