শাহজালাল বিমানবন্দরে উড়োজাহাজ দুর্ঘটনা মোকাবিলায় মহড়া

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উড়োজাহাজ দুর্ঘটনার পর অগ্নিনির্বাপণ, যাত্রী উদ্ধার ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা যাচাইয়ে ‘এয়ারপোর্ট ইমার্জেন্সি এক্সারসাইজ (ফায়ার)-২০২৬’ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
সোমবার (৫ অক্টোবর) বিমানবন্দরে এ পূর্ণাঙ্গ জরুরি মহড়া অনুষ্ঠিত হয়। কোনো উড়োজাহাজ দুর্ঘটনার পর আগুন নিয়ন্ত্রণ, যাত্রীদের নিরাপদে উদ্ধার ও সরিয়ে নেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত কার্যক্রম বাস্তবসম্মতভাবে অনুশীলন করাই ছিল মহড়ার মূল উদ্দেশ্য।
এর পাশাপাশি বিমানবন্দরে কর্মরত অগ্নিনির্বাপণকর্মীদের দক্ষতা ও পেশাগত জ্ঞান বৃদ্ধি, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জামের কার্যকারিতা যাচাই এবং জরুরি পরিস্থিতিতে বিভিন্ন সংস্থার দ্রুত ও সমন্বিত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতাও মহড়ার মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হয়।
আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার নির্দেশনা এবং জাতীয় বেসামরিক বিমান চলাচল নিরাপত্তা কর্মসূচির ১৬.২.৫.২ ধারার আওতায় নির্ধারিত সময় পরপর বিমানবন্দরে এ ধরনের পূর্ণাঙ্গ জরুরি মহড়া আয়োজন করা হয়। এর মাধ্যমে জরুরি পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর প্রস্তুতি, সমন্বয় ও কার্যকারিতা যাচাই করা সম্ভব হয়।
বিজ্ঞাপন
মহড়ায় বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ ও হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশাপাশি বাংলাদেশ বিমানবাহিনী, এপিবিএন, ট্রাফিক উত্তরা বিভাগ, আনসার, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, কুর্মিটোলা মাল্টিকেয়ার স্পেশালাইজড হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ ফর উইমেন, জাহানারা ক্লিনিক লিমিটেড, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থা অংশ নেয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে মহড়ার পুরো কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত, এমপি। অনুষ্ঠানে ঢাকা-১৮ আসনের সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনও উপস্থিত ছিলেন।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক।
এ ছাড়া বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর বিমানঘাঁটি একে খন্দকার ও বাশারের ঘাঁটি অধিনায়ক, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সদস্য, বিমান, সেনা ও নৌবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিমানবন্দরে কর্মরত বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধি, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা মহড়াটি প্রত্যক্ষ করেন।
মহড়ায় দেখানো হয় উড়োজাহাজে আগুনের ভয়াবহ দৃশ্য
বিজ্ঞাপন
মহড়ায় একটি কাল্পনিক দুর্ঘটনার দৃশ্যপট উপস্থাপন করা হয়। এতে দেখানো হয়, ব্যাংকক থেকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্দেশে আসা ৯৮ যাত্রী ও পাঁচজন ক্রুবাহী একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ অবতরণের ঠিক আগে ডান পাশের ইঞ্জিনে আগুন লাগার বিষয়টি বিমানবন্দরের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল টাওয়ারকে জানায়।
খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে। একই সঙ্গে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক ও সংশ্লিষ্ট সব জরুরি সেবা সংস্থাকে বিষয়টি জানানো হয়। এরপর বিমানবন্দরের জরুরি পরিকল্পনা কার্যকর করে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর প্রস্তুতি নেয়।
মহড়ার এয়ার সাইডের দৃশ্যে আরও দেখানো হয়, জরুরি অবতরণের সময় উড়োজাহাজটি রানওয়ের কেন্দ্রীয় রেখা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়ে নির্ধারিত অংশ অতিক্রম করে দ্রুত সামনে এগিয়ে যায়। একপর্যায়ে উড়োজাহাজটি রানওয়ের বাম দিকে ছিটকে পড়ে এবং ট্যাক্সিওয়ে সিয়েরা অতিক্রম করে রানওয়ের দক্ষিণ পাশে গিয়ে থেমে যায়।
বিজ্ঞাপন
দুর্ঘটনার পরপরই উড়োজাহাজটির নিচের অংশে আগুনের সূত্রপাত হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই আগুন পুরো উড়োজাহাজে ছড়িয়ে পড়ার কাল্পনিক পরিস্থিতি তৈরি করা হয়।
এরপর বিমানবন্দরের ফায়ার সার্ভিস, এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল, উদ্ধারকারী দল, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, চিকিৎসাসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করে। আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া, যাত্রীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া এবং দুর্ঘটনা-পরবর্তী জরুরি ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন ধাপও মহড়ায় তুলে ধরা হয়।
এর মাধ্যমে জরুরি পরিস্থিতিতে বিভিন্ন সংস্থার দ্রুত সাড়া, পারস্পরিক সমন্বয় এবং বিমানবন্দরের সামগ্রিক প্রস্তুতির বাস্তবচিত্র তুলে ধরা হয়।
বিজ্ঞাপন
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত মহড়াটি সফলভাবে সম্পন্ন করায় বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এবং অংশগ্রহণকারী সব সংস্থাকে অভিনন্দন ও ধন্যবাদ জানান।
তিনি বলেন, আধুনিক ও নিরাপদ বিমান চলাচল ব্যবস্থা গড়ে তোলার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো অগ্নিনিরাপত্তা এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা। গত বছর বিমানবন্দরের আমদানি কার্গো কমপ্লেক্সে অগ্নিকাণ্ডের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বর্তমান সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
দেশের বিমান খাতের নিরাপত্তা আরও সুসংহত করতে সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী জাতীয় বেসামরিক বিমান চলাচল নিরাপত্তা কমিটি গঠন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। আসন্ন আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার নিরীক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে সম্ভাব্য পর্যবেক্ষণের বিষয়গুলোতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও বিধি-অনুবর্তিতা নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেন মন্ত্রী।
বিজ্ঞাপন
একই সঙ্গে ভিআইপি ও সিআইপিসহ সব যাত্রীর ক্ষেত্রে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বিধি সমানভাবে অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বিমানবন্দর এলাকায় অনুমোদনহীন ড্রোন উড্ডয়নকে নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি প্রতিরোধী ড্রোন ব্যবস্থা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান। পাশাপাশি নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও স্ক্যানারের পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।
নিয়মিত মহড়ার ওপর গুরুত্ব
বিজ্ঞাপন
ঢাকা-১৮ আসনের সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি যাচাইয়ের জন্য এ ধরনের বাস্তবভিত্তিক মহড়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে বিদ্যমান প্রস্তুতি ও সক্ষমতা যাচাইয়ের পাশাপাশি কোথায় আরও উন্নতি প্রয়োজন, তা চিহ্নিত করা সম্ভব হয়।
অনুষ্ঠানের সভাপতি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক বলেন, নিরাপদ বিমান চলাচল নিশ্চিত করতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, বাস্তবভিত্তিক মহড়া এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যকর সমন্বয় অপরিহার্য।
তিনি বলেন, এ ধরনের মহড়ার মাধ্যমে জনবলের পেশাগত দক্ষতা, জরুরি সরঞ্জামের কার্যকারিতা এবং বিভিন্ন সংস্থার সমন্বিত প্রতিক্রিয়া দেওয়ার সক্ষমতা যাচাই করা যায়। মহড়ায় অংশ নেওয়া সব সংস্থা এবং আয়োজনের সঙ্গে সম্পৃক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ধন্যবাদ জানান তিনি।
বিজ্ঞাপন
মহড়া শেষে বিভিন্ন পর্যায়ের কার্যক্রম মূল্যায়ন করা হয়। সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করেন, মহড়া থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা এবং চিহ্নিত বিষয়গুলো ভবিষ্যতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের জরুরি ব্যবস্থাপনা ও সমন্বিত প্রতিক্রিয়া সক্ষমতা আরও উন্নত করতে সহায়তা করবে।








