সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নের অপচেষ্টা বিভিন্ন সময়ে হয়েছে: প্রধানমন্ত্রী

বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর সুনাম ও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর জন্ম। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, জনগণের আস্থা অর্জন এবং পেশাদারত্ব বজায় রাখতে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
রবিবার (১৮ অক্টোবর) সকালে ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড প্রদান অনুষ্ঠান ২০২৬-এ বক্তব্য দিতে গিয়ে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
নিজের সেনা পরিবারের পরিচয় তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, “একজন সেনা পরিবারের সদস্য হিসেবে আমি সেনা পরিবেশেই বেড়ে উঠেছি। সুতরাং, আজকের এই অনুষ্ঠানে আপনাদের সামনে ভিন্ন পরিচয়ে উপস্থিত হলেও এ ধরনের পরিবেশ আমার জন্য নতুন নয়।”
অনুষ্ঠানে পেশাগত সাফল্য ও দায়িত্ব পালনে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ৭ ও ৩২ ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারি, ২৫ এয়ার ডিফেন্স রেজিমেন্ট, ৯ ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়ন, ৫৬ ও ৫৭ ইস্ট বেঙ্গল এবং প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড বা জাতীয় পতাকা অর্জন করেছে।
বিজ্ঞাপন
প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোর সদস্যদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, “এই ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড শুধু একটি পতাকা নয়; বরং এটি একটি ইউনিটের ইতিহাস, ঐতিহ্য, শৃঙ্খলা, আত্মত্যাগ, পেশাদারত্ব এবং দেশের প্রতি অঙ্গীকারের প্রতীক।”
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, জাতীয় পতাকা দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং অসংখ্য মানুষের আত্মত্যাগের স্মারক। এই পতাকা অর্জনের মধ্য দিয়ে সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোর ওপর দায়িত্ব আরও বেড়েছে। পতাকার মর্যাদা রক্ষা করা প্রত্যেক সৈনিকের পবিত্র দায়িত্ব।
সেনাবাহিনীর ইতিহাস তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর হামলার প্রেক্ষাপটে চট্টগ্রামে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের তৎকালীন উপ-অধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমান ‘উই রিভোল্ট’ ঘোষণা করেছিলেন। এরপর তিনি রেজিমেন্টে ফিরে বাংলাভাষী কর্মকর্তা ও সৈনিকদের সংগঠিত করে সশস্ত্র প্রতিরোধের প্রস্তুতি নেন।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের লেখা ‘একটি জাতির জন্ম’ নিবন্ধের উল্লেখ করেন। সেখানে জিয়াউর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ রাত ২টা ১৫ মিনিটে তিনি ব্যাটালিয়নের কর্মকর্তা, জেসিও ও জওয়ানদের সশস্ত্র সংগ্রামে অংশ নেওয়ার নির্দেশ দেন।
বিজ্ঞাপন
তারেক রহমান বলেন, জিয়াউর রহমানের লেখা নিবন্ধে মুক্তিযুদ্ধের শুরুর সময়কার এসব ঘটনার বিবরণ পাওয়া যায়। তাঁর মতে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং সেনাবাহিনীর জন্মের ইতিহাস পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ ও অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাংলাভাষী সেনাসদস্যরা সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। পরবর্তী সময়ে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে বলেও বক্তব্যে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
আধুনিক সেনাবাহিনীর সক্ষমতা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু অস্ত্র, সরঞ্জাম কিংবা জনবল দিয়ে একটি সশস্ত্র বাহিনীর শক্তি নির্ধারিত হয় না। শৃঙ্খলা, দক্ষতা, নেতৃত্ব, নৈতিকতা, প্রশিক্ষণ এবং জনগণের আস্থার পাশাপাশি চেইন অব কমান্ডও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিজ্ঞাপন
তিনি জানান, সশস্ত্র বাহিনীকে আরও প্রযুক্তিনির্ভর, দক্ষ, শৃঙ্খলাবদ্ধ, পেশাদার ও আধুনিক করে গড়ে তোলার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কর্মকর্তা ও সৈনিকদের সংবিধান, আইন, সামরিক বিধিবিধান এবং মানবিক মূল্যবোধের প্রতি অবিচল থাকার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
বিশ্বের পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, যুদ্ধের ধরন ও কৌশল দ্রুত বদলে যাচ্ছে। স্থল, সমুদ্র ও আকাশের পাশাপাশি সাইবার স্পেস, মহাকাশ, ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং তথ্যভিত্তিক সক্ষমতা জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। এ বাস্তবতায় প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে এগিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেনাবাহিনীর আধুনিকায়নের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অস্ত্র, গোলাবারুদ ও প্রতিরক্ষাসামগ্রী দেশে উৎপাদনের লক্ষ্যে দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প প্রতিষ্ঠার ওপর সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, প্রযুক্তি কখনোই মানুষের বিকল্প নয়। বরং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর মধ্যে সমন্বিত কার্যক্রম নিশ্চিত করে একটি কার্যকর প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
তারেক রহমান আরও বলেন, দেশের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দুর্যোগ, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অগ্নিকাণ্ড এবং অন্যান্য জরুরি পরিস্থিতিতে সশস্ত্র বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিদেশে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনেও বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন।
সেনাসদস্যদের জীবনমান উন্নয়নের বিষয়েও বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, আবাসন, চিকিৎসা, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, ক্যারিয়ার উন্নয়ন এবং অবসর-পরবর্তী সামাজিক নিরাপত্তাকে সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, জাতীয় পে-স্কেলে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের বেতন ও ভাতা ১০০ শতাংশ থেকে ১৩৮ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি সেনাসদস্যদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ‘ওয়ান র্যাংক, ওয়ান পেনশন’ বাস্তবায়নের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদা রক্ষা হবে আগামীর বাংলাদেশের মূল অঙ্গীকার। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমতার ভিত্তিতে বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা জোরদার করার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন তিনি।
অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য নবম পদাতিক ডিভিশনের সংশ্লিষ্ট সদস্যদের ধন্যবাদ জানিয়ে বক্তব্য শেষ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।








