চট্টগ্রামে পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করবেন প্রধানমন্ত্রী, নগরজুড়ে উৎসবের আমেজ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চট্টগ্রাম সফর ঘিরে বন্দরনগরীতে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) সন্ধ্যায় নগরের রহমতগঞ্জের জে এম সেন হলের দুর্গাপূজার মণ্ডপ পরিদর্শন এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের কথা রয়েছে তাঁর। প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে পূজামণ্ডপ সাজানোর পাশাপাশি নগরের বিভিন্ন সড়কে সংস্কার, পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ চলছে।
বিজ্ঞাপন
সোমবার (১৯ অক্টোবর) নগরের কাজীর দেউড়ি, জামালখান ও আন্দরকিল্লা এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন সড়কে কার্পেটিং করা হয়েছে। সড়ক বিভাজকে নতুন করে রং দেওয়া হচ্ছে, সরানো হচ্ছে পোস্টার ও ব্যানার। ফুটপাত দখল করে গড়ে ওঠা অবৈধ দোকানপাটও উচ্ছেদ করা হয়েছে। অন্যদিকে, জে এম সেন হলের পূজামণ্ডপে চলছে প্যান্ডেল নির্মাণ, ধোয়া-মোছা ও আলোকসজ্জার কাজ।
প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এবং বিএনপির নেতাকর্মীদের তৎপরতা বেড়েছে। নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিভিন্ন পর্যায়ে সমন্বয় ও প্রস্তুতিমূলক বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের কোনো সরকারপ্রধানের চট্টগ্রামে এসে দুর্গাপূজার মণ্ডপ পরিদর্শনের ঘটনা এবারই প্রথম।
পূজামণ্ডপ পরিদর্শনের পর সাংগঠনিক সভা
বিজ্ঞাপন
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন, মহানগর বিএনপি ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে জে এম সেন হলের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের পাশাপাশি আর্থিক অনুদান দেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর। প্রায় ৪০ মিনিট অবস্থানের পর নগরের হোটেল র্যাডিসন ব্লুতে বিএনপির নেতাদের সঙ্গে সাংগঠনিক সভায় যোগ দেবেন তিনি। পরে রাতে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে তাঁর।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
সাংগঠনিক সভায় বিএনপির চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা ইউনিটের নেতাদের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। মহানগর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটির সদস্যদের পাশাপাশি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ পাঁচ নেতা, সংসদ সদস্য এবং কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত থাকবেন। চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সাংগঠনিক কমিটি না থাকায় সেখানকার জ্যেষ্ঠ নেতারা সভায় অংশ নেবেন।

বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক (চট্টগ্রাম বিভাগ) ও চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক মাহবুবের রহমান শামীম বলেন, পূজামণ্ডপ পরিদর্শন ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির নেতাদের সঙ্গে সাংগঠনিক সভা করবেন। এতে সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় নেতারাও অংশ নেবেন।
দলের স্থানীয় জ্যেষ্ঠ নেতাদের মতে, পূর্ণাঙ্গ কমিটির সদস্যদের নিয়ে এ ধরনের সভা তৃণমূলের সংগঠকদের মূল্যায়ন এবং সাংগঠনিক কার্যক্রমে নতুন গতি সঞ্চারের সুযোগ তৈরি করবে।
বিজ্ঞাপন
প্রস্তুতি ও সমন্বয় কার্যক্রম
প্রধানমন্ত্রীর সফর নির্বিঘ্ন করতে কয়েক দিন ধরেই প্রস্তুতি চলছে। গত শনিবার জে এম সেন হলের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক মাহবুবের রহমান শামীম, চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ এবং সদস্যসচিব নাজিমুর রহমান।
একই দিন মণ্ডপ পরিদর্শন করেন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী ও এসআরবি-৭-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোস্তাফিজুর রহমান। দুপুরে সেখানে যান চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন ও সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান।
বিজ্ঞাপন
এর আগে ১৪ অক্টোবর চট্টগ্রাম জেলা পরিষদে বিএনপি, মহানগর পূজা উদ্যাপন পরিষদ, বাংলাদেশ জন্মাষ্টমী উদ্যাপন পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটি এবং বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্টের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা হয়। ১৬ অক্টোবর চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের রেস্ট হাউসেও বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পরদিন রাতে পানি সম্পদমন্ত্রী ও চট্টগ্রাম জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানির নেতৃত্বে প্রশাসন ও বিএনপির নেতাদের সঙ্গে অনলাইনে সভা হয়। একই রাতে চট্টগ্রাম মহানগর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির নেতারাও বৈঠক করেন।
রহমতগঞ্জের জে এম সেন হল প্রাঙ্গণ চট্টগ্রামে দুর্গাপূজা উদ্যাপনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। প্রতিবছর এখানে কেন্দ্রীয়ভাবে পূজার আয়োজন করা হয়। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক আয়োজনে উৎসবের সময় প্রাঙ্গণটি সর্বজনীন মিলনমেলায় পরিণত হয়।

চট্টগ্রাম মহানগর পূজা উদ্যাপন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অধ্যাপক অর্পণ কান্তি ব্যানার্জি বলেন, পূজামণ্ডপে প্রধানমন্ত্রীর আগমনের খবরে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে আনন্দের সঞ্চার হয়েছে। তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাতে সার্বিক প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান বলেন, সবাইকে সঙ্গে নিয়ে দেশ গড়ার প্রধানমন্ত্রীর লক্ষ্য বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে তাঁর চট্টগ্রাম সফর আনন্দের বিষয়। সফর সফল করতে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করছেন।
চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান বলেন, চট্টগ্রামের সনাতন ধর্মাবলম্বীরা প্রধানমন্ত্রীকে বরণ করে নিতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। তাঁর আগমন ঘিরে নগরে উৎসাহ ও আন্তরিকতার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সবার সমান অধিকার, মর্যাদা, নিরাপত্তা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
নিরাপত্তায় চার স্তরের ব্যবস্থা
বিজ্ঞাপন
প্রধানমন্ত্রীর সফর ও দুর্গাপূজা উপলক্ষে চট্টগ্রাম নগর ও জেলায় চার স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, পুলিশ, এসআরবি, আনসার ও বিজিবির ২০ হাজারের বেশি সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবেন।
এসআরবি-৭-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এসএসএফের নির্দেশনা ও সমন্বয়ে প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। র্যাব, পুলিশ, জেলা প্রশাসন ও বিভাগীয় প্রশাসন সমন্বিতভাবে কাজ করছে। পূজামণ্ডপগুলো নিয়মিত পরিদর্শন, মোবাইল টহল ও সাদাপোশাকে গোয়েন্দা নজরদারির আওতায় থাকবে। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষ স্ট্রাইকিং ফোর্সও প্রস্তুত রাখা হবে।
তিনি জানান, চট্টগ্রাম মহানগরে প্রায় ২ হাজার ৬০০টি পূজামণ্ডপ রয়েছে। মণ্ডপের সংখ্যা বিবেচনায় নিয়ে আগেভাগেই নিরাপত্তার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। মণ্ডপগুলোতে এসআরবির যোগাযোগ নম্বরও দেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে প্রটোকল অনুযায়ী প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। পূজামণ্ডপগুলোতে সার্বক্ষণিক পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি সাদাপোশাকেও পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। পূজা উদ্যাপন কমিটির সভাপতি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে পুলিশের সমন্বয় রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে উপহার বিতরণ
দুর্গাপূজা উপলক্ষে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে উপহার ও আর্থিক সহায়তা বিতরণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিএনপির নেতারা। মাহবুবের রহমান শামীম বলেন, জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রায় ১০ হাজার শাড়ি ও লুঙ্গি বিতরণ করা হয়েছে। চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় আসনে বিভিন্ন মন্দির, সংগঠন ও পূজা উদ্যাপন কমিটির মাধ্যমে এসব উপহার পৌঁছে দেওয়া হয়।

তিনি আরও জানান, গত ৯ অক্টোবর জে এম সেন হলের মাঠে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে পূজার উপহার বিতরণ করেন। এ ছাড়া নগর ও জেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপে আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে চট্টগ্রামে একদিকে চলছে প্রশাসনিক প্রস্তুতি ও নিরাপত্তা তৎপরতা, অন্যদিকে দুর্গোৎসবের আয়োজন। পূজামণ্ডপে তাঁর উপস্থিতি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উৎসবে নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের প্রত্যাশা, এই সফরের মধ্য দিয়ে ধর্মীয় সম্প্রীতি, পারস্পরিক সহাবস্থান ও সৌহার্দ্যের বার্তা আরও জোরালো হবে।








