Logo

১৪ বছরেও চালু হয়নি বিআরটি, ২৮১১ কোটি টাকার প্রকল্প ভাঙার সিদ্ধান্ত

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
২০ অক্টোবর, ২০২৬, ১৬:৫৯
১৪ বছরেও চালু হয়নি বিআরটি, ২৮১১ কোটি টাকার প্রকল্প ভাঙার সিদ্ধান্ত
ছবি: সংগৃহীত

১৪ বছর ধরে নির্মাণকাজ চালিয়েও চালু করা যায়নি দেশের প্রথম বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) সেবা। গাজীপুর থেকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত এই প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা। এবার প্রকল্পটির নির্মিত অবকাঠামো অপসারণ করে সড়কটিকে সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়ন ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ‘ঢাকা বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট পিএলসি’ বিলুপ্ত করে সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) আওতায় নেওয়া হবে।

বিজ্ঞাপন

তবে সরকারের এ সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী ও পরিকল্পনাবিদরা। তাঁদের কেউ কেউ মনে করছেন, প্রকল্পটি বাতিলের পেছনে বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থ কাজ করতে পারে।

গত রবিবার (১৮ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিআরটি প্রকল্পের অবকাঠামো অপসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সোমবার (১৯ অক্টোবর) সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের উপসচিব তাসলিমা আহমেদ পলির সই করা চিঠিতে পরবর্তী করণীয় জানানো হয়েছে।

চিঠিতে বলা হয়, বিআরটি করিডোরের স্টেশন, লেন বিভাজকসহ অন্যান্য অবকাঠামো সরিয়ে সড়কটিকে দুই পাশে তিনটি করে মোট ছয় লেনের সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তর করা হবে। পাশাপাশি বিদ্যমান দুটি দুই লেনের ওভারপাসকে চার লেনে উন্নীত করার কার্যক্রম নেওয়া যেতে পারে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে চারটি বিকল্প বিবেচনা করা হয়েছিল। এগুলো হলো—প্রকল্পের কাজ শেষ করা, ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক বাস রুট চালু করা, সড়কটিকে এক্সপ্রেসওয়েতে রূপান্তর করা এবং বিআরটির অবকাঠামো অপসারণ করে সাধারণ মহাসড়ক নির্মাণ। শেষ পর্যন্ত চতুর্থ বিকল্পটিই বেছে নিয়েছে সরকার।

বিজ্ঞাপন

তবে প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করার আগে সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনা করে বিদ্যমান আইনি জটিলতা নিরসন করতে হবে। এরপর প্রকল্পের সমাপ্তি ঘোষণা বা ‘প্রজেক্ট ক্লোজার’ সম্পন্ন করার কথা বলা হয়েছে।

মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি সম্পর্কে ১৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে হবে। কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি মাসের ৩ তারিখের মধ্যে অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশনাও রয়েছে।

গাজীপুর থেকে ঢাকা বিমানবন্দর পর্যন্ত বিআরটি প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১২ সালে। প্রকল্পটির জন্য ১২ বছর সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল এবং প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪ হাজার ২৬৮ কোটি ৩২ লাখ টাকা। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হলেও চালু হয়নি বিআরটি বাসসেবা।

বিজ্ঞাপন

ওই সময় প্রকল্পের অবকাঠামোগত কাজের ৯৭ শতাংশ শেষ হয়েছিল। এতে ব্যয় হয়েছিল ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা। তবে প্রকল্পের সার্বিক ভৌত অগ্রগতি ছিল ৭৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ। এরপর আর প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়নি।

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ব্যস্ত এই অংশে বিআরটির জন্য নির্মিত নির্দিষ্ট লেন বর্তমানে সব ধরনের যানবাহনের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে। অথচ প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য ছিল দ্রুতগতির বিশেষ বাসসেবা চালু করা। এ রুটে চলাচলের জন্য দুই দফায় বাস কেনার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা সফল হয়নি।

দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামো নির্মাণ চললেও যাত্রী পরিবহনে বিআরটি সেবা চালু করা সম্ভব হয়নি। এখন সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আইনি জটিলতা নিরসন ও প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে অবকাঠামো অপসারণ করে সড়কটিকে সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে।

বিজ্ঞাপন

ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ডুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. খসরু মিয়া বলেন, প্রকল্পের প্রায় ৯৭ শতাংশ অবকাঠামোগত কাজ শেষ হওয়ার পরও এর ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক ও অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়া উদ্বেগজনক।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

তাঁর মতে, প্রকল্প বাস্তবায়ন কিংবা পরিচালনায় কারিগরি, ব্যবস্থাপনাগত বা পরিচালনাগত সমস্যা থাকলে সেগুলো চিহ্নিত করে সমাধান করা উচিত। পরিচালনাপদ্ধতিতে ত্রুটি থাকলে তা পরিবর্তন করতে হবে। যান চলাচল ব্যবস্থাপনায় জটিলতা থাকলে কার্যকর পরিকল্পনার মাধ্যমে তা নিরসন করা প্রয়োজন।

খসরু মিয়া বলেন, ঢাকার মেট্রোরেল পরিচালনায় সরকার বছরে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে প্রস্তুত থাকলেও গাজীপুরের বিআরটি চালুর ক্ষেত্রে অনীহার কারণ খতিয়ে দেখা দরকার। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে কোনো গোষ্ঠীর প্রভাব রয়েছে কি না, তা অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। প্রকল্পের অনিয়মে জড়িত ব্যক্তি কিংবা ব্যক্তিগত যানবাহন ও অকার্যকর বাস ব্যবসার স্বার্থ রক্ষাকারীরা এর বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করছেন কি না, সেটিও তদন্তের দাবি রাখে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক ও পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) এক বিবৃতিতে সরকারের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, বিআরটি প্রকল্প বাতিল, সংশ্লিষ্ট সংস্থা বিলুপ্ত এবং পুরো অবকাঠামোকে তিন প্লাস তিন লেনের মহাসড়কে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাঁর মতে, ১৮ অক্টোবরের মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিআরটি নিয়ে সবচেয়ে খারাপ বিকল্পটি বেছে নেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বিবৃতিতে তিনি আরও বলেন, বৈঠক-পরবর্তী নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে সিদ্ধান্তটি জানানো না হওয়ায় সিদ্ধান্তগ্রহণকারীদের একাংশের কিছু গোপন করার চেষ্টা নিয়ে জল্পনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় সুস্পষ্ট স্বার্থের সংঘাত রয়েছে বলেও মনে করে বিআইপি।

সংস্থাটি সরকারের সিদ্ধান্তের দ্ব্যর্থহীন প্রতিবাদ জানিয়ে দিনটিকে টেকসই, জ্বালানি-সাশ্রয়ী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণপরিবহনের ইতিহাসে ‘কালো দিন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। বিআইপির দাবি, সিদ্ধান্তটি ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারকারী এবং দেশি-বিদেশি নির্মাণ খাতের লবির স্বার্থের পক্ষে গেছে। একই সঙ্গে এটি গাজীপুর ট্রান্সপোর্ট মাস্টার প্ল্যান (জিটিএমপি) ও ঢাকার সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনার (আরএসটিপি) প্রস্তাবনার পরিপন্থি।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিআইপির মতে, গত ১৪ বছর ধরে নির্মাণকাজের কারণে দুর্ভোগ পোহানো গাজীপুর ও উত্তরার বাসিন্দাদের প্রত্যাশা এবং যাতায়াতের চাহিদার প্রতিও এ সিদ্ধান্ত সুবিচার করেনি।

বিআইপি বিআরটি প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার, বিআরটি ও এমআরটি পরিচালনা এবং সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের জন্য সমন্বিত সংস্থা গঠন করার দাবি জানিয়েছে। পাশাপাশি ঢাকা শহরসহ দেশের অন্যান্য মহানগরের জন্য বিআরটির বৃহত্তর পরিকল্পনা প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।

বিজ্ঞাপন

পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়নে প্রকল্পভিত্তিক সিদ্ধান্তের পরিবর্তে পরিকল্পনাভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ এবং সময় ও ব্যয়সাশ্রয়ী প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়ারও সুপারিশ করেছে বিআইপি। নারী, স্বল্প দূরত্বের যাত্রী, শারীরিক প্রতিবন্ধিতাসম্পন্ন ব্যক্তি ও সীমিত সামর্থ্যের মানুষসহ বেশি সংখ্যক যাত্রীকে সেবা দিতে সক্ষম পরিবহন প্রকল্প গ্রহণের দাবি জানিয়েছে তারা।

এ ছাড়া বৃহত্তর ঢাকা অঞ্চলের পরিবহন পরিকল্পনায় ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষকে (ডিটিসিএ) নেতৃত্বদানকারী সংস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নিয়ন্ত্রণে ন্যস্ত করার আহ্বান জানিয়েছে পরিকল্পনাবিদদের সংগঠনটি।

এ বিষয়ে জানতে মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) সকালে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হককে ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD