Logo

‘সু-খবর’ প্রচারের নামে শব্দদূষণ, অতিষ্ঠ ডিমলার সাধারণ মানুষ

profile picture
উপজেলা প্রতিনিধি
ডিমলা, নীলফামারী
২০ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:৩০
‘সু-খবর’ প্রচারের নামে শব্দদূষণ, অতিষ্ঠ ডিমলার সাধারণ মানুষ
ছবি: সংগৃহীত

‘সু-খবর, সু-খবর, সু-খবর’—মাইকে ভেসে আসা এমন উচ্চশব্দে ভোর হওয়ার আগেই ঘুম ভাঙছে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার অনেক বাসিন্দার। সকাল থেকে দুপুর, এমনকি সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত ১০টা পর্যন্ত বিভিন্ন পণ্য ও সেবার প্রচারে চলছে মাইকিং।

বিজ্ঞাপন

চিকিৎসকের উপস্থিতি ঘোষণা, কোচিং সেন্টারের বিজ্ঞাপন, দোকান উদ্বোধন, মুরগির মাংস বিক্রি কিংবা মোবাইল সিমের প্রচারণা—সবকিছুতেই উচ্চশব্দের মাইকের ব্যবহার বাড়ছে। এতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।

উপজেলার প্রধান সড়ক, গ্রামীণ জনপদ, হাটবাজার ও অভ্যন্তরীণ রাস্তায় ভ্যান ও ইজিবাইকে মাইক ও সাউন্ড বক্স লাগিয়ে প্রচার চালানো হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ রেখেও অনেক সময় এসব শব্দ থেকে রেহাই পাওয়া যায় না। প্রচারের প্রয়োজন থাকলেও শব্দের মাত্রা ও সময়সীমা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপের অভাব নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে তাঁদের।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ভোরের দিকে শুরু হওয়া মাইকিং অনেক ক্ষেত্রে রাত পর্যন্ত চলে। বেসরকারি ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতালে চিকিৎসকের উপস্থিতি জানানোর পাশাপাশি কোচিং সেন্টার, দোকান ও শোরুমের প্রচারেও ব্যবহার করা হচ্ছে উচ্চশব্দের মাইক। হারানো জিনিসের ঘোষণা থেকে শুরু করে বিভিন্ন পণ্যের বিজ্ঞাপন—সব ক্ষেত্রেই মাইকিংয়ের কারণে জনদুর্ভোগ বাড়ছে।

বিজ্ঞাপন

অতিরিক্ত শব্দের প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থী, শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের ওপর। সকাল ও সন্ধ্যায় পড়াশোনার সময় মাইকের শব্দে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। অসুস্থ ব্যক্তিদের বিশ্রামেও ব্যাঘাত ঘটছে। অন্যদিকে বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতাদের স্বাভাবিক কথাবার্তা বলতেও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।

ডিমলা সদর ইউনিয়নের বাসিন্দা আলম বলেন, উচ্চশব্দে মাইকিংয়ের কারণে স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে। প্রচারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সুবিধা-অসুবিধাও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

শুটিবাড়ি বাজারের কাপড় ব্যবসায়ী আব্দুল বাতেন বলেন, মাইকের বিকট শব্দে বাজারে ক্রেতাদের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে সমস্যা হয়। ব্যবসার পরিবেশ স্বাভাবিক রাখতে মাইকিংয়ের শব্দ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।

ডালিয়া নতুন বাজার এলাকার মনোয়ার হোসেন বলেন, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মাইকিং চলায় ঘরে থাকা অবস্থায়ও অনেক সময় স্বস্তি পাওয়া যায় না। এ বিষয়ে প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।

চাপানিরহাট এলাকার আব্দুল করিমের মতে, উচ্চশব্দে শিশুদের পড়াশোনা ও বয়স্কদের বিশ্রাম ব্যাহত হতে পারে। তাই প্রচারের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময় ও শব্দের মাত্রা মেনে চলা জরুরি।

বিজ্ঞাপন

শিক্ষার্থী নজরুল ইসলাম ও শিক্ষক আব্দুল জলিল জানান, সকাল ও সন্ধ্যায় পড়াশোনার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে মাইকের বিকট শব্দে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীদের জন্য পড়াশোনার উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করতে তাঁরা প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, মাইকিং পরিচালনার জন্য ভ্যানচালকদের দৈনিক ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত দেওয়া হয়। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এসব প্রচার চলে। তবে শব্দের মাত্রা, প্রচারের সময় এবং জনবসতিপূর্ণ এলাকায় মাইক ব্যবহারের ক্ষেত্রে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই বলে অভিযোগ তাঁদের।

বাসিন্দারা জানান, তাঁরা প্রচার-প্রচারণার জন্য মাইক ব্যবহারের বিরোধী নন। তবে ব্যবসায়িক প্রচার ও জনস্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। শব্দের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ, নির্দিষ্ট সময় মেনে প্রচার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় উচ্চশব্দের ব্যবহার সীমিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

বিজ্ঞাপন

দীর্ঘ সময় অতিরিক্ত শব্দের মধ্যে থাকলে শ্রবণশক্তির ক্ষতি, ঘুমের ব্যাঘাত, মানসিক চাপ ও মনোযোগের ঘাটতির মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরও উদ্বেগজনক হতে পারে। ফলে শব্দদূষণ কেবল বিরক্তির কারণ নয়; এটি জনস্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার মানের সঙ্গেও সম্পর্কিত।

ডিমলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মো. আতিকুর রহমান খান বলেন, অতিরিক্ত শব্দ মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য উচ্চশব্দ ক্ষতিকর। তাই জনবসতিপূর্ণ এলাকায় মাইকিংয়ের শব্দমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।

দেশে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০২৫ কার্যকর রয়েছে। এতে এলাকাভেদে শব্দের সর্বোচ্চ মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। জনপরিসরে মাইক ও লাউডস্পিকার ব্যবহারের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য অনুমতি ও বিধিনিষেধ অনুসরণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে এসব বিধান বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

বিজ্ঞাপন

তাঁদের মতে, শুধু নির্দেশনা জারি করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। এ জন্য নিয়মিত তদারকি, শব্দের মাত্রা পরিমাপ এবং বিধি লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রচার পরিচালনাকারীদের সচেতন করাও জরুরি।

এ বিষয়ে ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইমরানুজ্জামান জানান, শব্দদূষণ রোধে শিগগিরই মাইকিং পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাসহ লিখিত চিঠি দেওয়া হবে। নির্দেশনা অমান্য করে অনিয়ন্ত্রিত শব্দ সৃষ্টি করলে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রচার-প্রচারণা জনজীবনের অংশ হলেও তা যেন মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপনের প্রতিবন্ধক না হয়, এমনটাই প্রত্যাশা ডিমলাবাসীর। তাঁদের মতে, নির্ধারিত সময় ও সহনীয় শব্দমাত্রা মেনে মাইকিং পরিচালনা করা হলে প্রচারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের দুর্ভোগও কমবে।

বিজ্ঞাপন

এখন প্রশাসনের ঘোষিত উদ্যোগ কত দ্রুত বাস্তবায়িত হয়, সেটিই দেখার বিষয়। নিয়মিত নজরদারি ও আইন প্রয়োগের মাধ্যমে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ করা গেলে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার উপযোগী পরিবেশ পাবে, অসুস্থ ও বয়স্ক ব্যক্তিরা স্বস্তিতে বিশ্রাম নিতে পারবেন এবং সাধারণ মানুষও নির্বিঘ্নে দৈনন্দিন কাজ করতে পারবেন।

জেবি/আরএক্স

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD