‘কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারী নেই’; জামায়াতের বক্তব্য বিভ্রান্তিকর: টিআইবি

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারীদের প্রতিনিধিত্ব না থাকার বিষয়ে নিজেদের গবেষণা প্রতিবেদন নিয়ে দলটির বক্তব্যকে ‘বিভ্রান্তিমূলক ও সত্যের অপলাপ’ বলে মন্তব্য করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির মতে, নারীদের জন্য আলাদা কমিটি গঠন করে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দেওয়া আর দলের মূল সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোয় নারীদের অন্তর্ভুক্ত করা এক বিষয় নয়।
বিজ্ঞাপন
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব কথা জানায় টিআইবি। সম্প্রতি ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন নিয়ে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের দেওয়া বক্তব্যের জবাবে এ প্রতিক্রিয়া জানায় সংস্থাটি।
গত রবিবার গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে টিআইবি। সেখানে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারীদের অংশগ্রহণ নেই বলে উল্লেখ করা হয়। এর প্রতিবাদ জানিয়ে সোমবার এক বিবৃতিতে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার গবেষণায় প্রকাশিত তথ্যকে ‘অসত্য ও বিভ্রান্তিকর’ বলে দাবি করেন।
জামায়াতের বিবৃতিতে বলা হয়, দলের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদে ২১ জন নারী সদস্য এবং কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরায় ১২২ জন নারী সদস্য রয়েছেন। এ ছাড়া দলটির মোট রুকন বা সদস্যদের মধ্যে প্রায় ৪৩ শতাংশ নারী।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
মিয়া গোলাম পরওয়ারের দাবি, জামায়াতের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সংগঠনের প্রতিটি স্তরে গণতান্ত্রিক চর্চা রয়েছে এবং নারীদের জন্য সব পর্যায়েই সাংগঠনিক কার্যক্রম ও কমিটি গঠনের ব্যবস্থা রয়েছে। টিআইবির প্রতিবেদনে নারীদের অংশগ্রহণ নিয়ে দেওয়া তথ্যের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে ভবিষ্যতে দলটিকে নিয়ে প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে আরও সতর্ক ও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদে নারী সদস্য নেই
টিআইবি জানিয়েছে, গবেষণা প্রতিবেদনটি গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনা করায় জামায়াতকে ধন্যবাদ জানালেও গবেষণার তথ্য অস্বীকার করে দেওয়া বক্তব্যে সংস্থাটি বিস্মিত।
বিজ্ঞাপন
টিআইবির গবেষণায় রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারীদের প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও), ১৯৭২-এর ৯০খ(১)(খ)(আ) ধারার বিধান বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। ওই বিধান অনুযায়ী, রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্রে সব পর্যায়ের কমিটিতে অন্তত ৩৩ শতাংশ নারী সদস্য রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে তা অর্জনের কথা বলা হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারী প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে এ বিধান বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে। টিআইবির সংজ্ঞা অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় কমিটি বলতে কেন্দ্রীয় বা জাতীয় নির্বাহী কমিটি, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ কিংবা কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদকে বোঝানো হয়েছে।
সংস্থাটি জানায়, জামায়াতের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ২০২৩-২৫ মেয়াদের ১৯ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদে কোনো নারী সদস্য নেই। টিআইবির মতে, এটি আরপিওর সংশ্লিষ্ট বিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
বিজ্ঞাপন
পৃথক নারী কমিটি মূল কাঠামোয় অংশগ্রহণ নয়
টিআইবি বলছে, তাদের গবেষণায় কোনো রাজনৈতিক দলের জাতীয় কাউন্সিল, সম্মেলন কিংবা মজলিসে শুরায় নারীর সংখ্যা বিবেচনা করা হয়নি। গবেষণার মূল বিষয় ছিল কেন্দ্রীয় বা জাতীয় নির্বাহী পর্যায়ের কমিটিতে নারীদের অন্তর্ভুক্তি।
সংস্থাটির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, আরপিওতে কোনো রাজনৈতিক দলের মোট সদস্যদের মধ্যে কত শতাংশ নারী থাকতে হবে, সে বিষয়ে বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়নি। বরং নারী কর্মীদের মধ্য থেকে দলীয় কমিটিগুলোতে কতজনকে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
বিজ্ঞাপন
এ কারণে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ ও মজলিসে শুরায় নারী সদস্য থাকার বিষয়টিকে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদে নারীদের প্রতিনিধিত্বের বিকল্প হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মনে করে টিআইবি।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন স্তরে সাধারণত একটি করে কমিটি থাকে, যেখানে নারী ও পুরুষ সদস্যদের অন্তর্ভুক্তি দেখা যায়। কিন্তু জামায়াতের গঠনতন্ত্রে নারীদের সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রতিটি স্তরে পৃথক কমিটি গঠনের ব্যবস্থা রয়েছে। অর্থাৎ পুরুষদের জন্য একটি কমিটির পাশাপাশি নারী কর্মীদের জন্য আলাদা কমিটি পরিচালিত হয়।
টিআইবির দাবি, নারীদের জন্য পৃথক মজলিসে শুরা বা কর্মপরিষদ থাকলেও তাদের জন্য স্বতন্ত্র কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ নেই। একই সঙ্গে দলের মূল কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদেও কোনো নারী সদস্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
বিজ্ঞাপন
সংস্থাটি আরও উল্লেখ করেছে, জামায়াতের আমির, নায়েবে আমির, সেক্রেটারি জেনারেল ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বস্থানীয় পদে নারীদের অন্তর্ভুক্তির নজির নেই। টিআইবির মতে, নারীদের জন্য আলাদা সাংগঠনিক কাঠামো তৈরি করে তাদের কার্যক্রম নির্দিষ্ট পরিসরে সীমাবদ্ধ রাখা প্রকৃত রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করে না।
নির্বাচনে নারী প্রার্থী না দেওয়ার বিষয়ও তুলে ধরেছে টিআইবি
গবেষণা প্রতিবেদনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী কোনো আসনে নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেয়নি বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। দলটির সদস্যদের মধ্যে প্রায় ৪৩ শতাংশ নারী থাকার দাবি করা হলেও তাদের মধ্য থেকে কাউকে নির্বাচনে প্রার্থী করা হয়নি। এ বিষয়ে জামায়াতের প্রতিক্রিয়ায় কোনো মন্তব্য করা হয়নি বলে জানিয়েছে টিআইবি।
বিজ্ঞাপন
গঠনতন্ত্রের কয়েকটি বিধান নিয়ে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিকতার অভিযোগ
জামায়াতের গঠনতন্ত্রের কয়েকটি ধারার বিষয়েও আপত্তি জানিয়েছে টিআইবি। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণে রয়েছে—ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস ও চেতনার ভিত্তিতে সমাজ গঠন, আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক হিসেবে স্বীকার না করা, সামাজিক-অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আল্লাহর বিধান ছাড়া অন্য নিয়মনীতি ও পদ্ধতি প্রত্যাখ্যান এবং ইসলামী আকিদার পরিপন্থি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক না রাখার মতো বিধান।
এ ছাড়া দলীয় কর্মসূচির সঙ্গে একমত হওয়ার শর্তে অমুসলিম নাগরিকদের সহযোগী সদস্য বা সদস্যপদ দেওয়ার বিধানও পর্যালোচনা করেছে সংস্থাটি। টিআইবির মতে, এসব বিধানের সঙ্গে বাংলাদেশের সংবিধানের কয়েকটি অনুচ্ছেদের সাংঘর্ষিকতা রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
সংস্থাটি সংবিধানের এমন কিছু বিধানের কথা উল্লেখ করেছে, যেখানে রাষ্ট্রের সব ক্ষমতার মালিক জনগণ, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি, ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি ধর্ম, লিঙ্গসহ বিভিন্ন কারণে বৈষম্য নিষিদ্ধ করার বিষয়টিও সংবিধানে রয়েছে।
টিআইবির বক্তব্য, জামায়াতের কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারী সদস্য না থাকার বিষয়ে গবেষণায় পাওয়া তথ্যকে ‘অসত্য’ বা ‘বিভ্রান্তিকর’ বলার সুযোগ নেই। বরং অপ্রাসঙ্গিক তথ্য সামনে এনে গবেষণার ফলাফল অস্বীকারের মাধ্যমে দলটির প্রকৃত সাংগঠনিক চর্চাকে আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
গবেষণার পদ্ধতি ও তথ্য যাচাইয়ের ব্যাখ্যা
গবেষণার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে টিআইবি জানিয়েছে, সংস্থাটির প্রতিটি গবেষণায় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং সমাজবিজ্ঞানে প্রচলিত গবেষণাপদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতে প্রাথমিকভাবে সংগৃহীত উপাত্তের সঙ্গে বিভিন্ন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উৎসের তথ্য মিলিয়ে দেখা হয়। পাশাপাশি একাধিক পর্যায়ে ক্রস-চেকিং এবং সম্ভাব্য উৎস থেকে তথ্য যাচাই করা হয়।
এ গবেষণায় রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় পর্যায়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ও মনোনীত প্রতিনিধি, নেতাকর্মী, নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, শিক্ষক এবং গবেষকদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলের ওয়েবসাইট, দলীয় কার্যালয়, গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, গবেষণাপত্র ও বই থেকে তথ্য সংগ্রহ এবং যাচাই করা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তির শেষাংশে জামায়াতে ইসলামীসহ দেশের সব রাজনৈতিক দলকে গবেষণার ফলাফল গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি। একই সঙ্গে প্রতিবেদনে উত্থাপিত সুপারিশ অনুসরণ করে নিজ নিজ দলের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও সুশাসনব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কার আনার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।








