হত্যার আগে কোথায় গিয়েছিল কিশোরী, সিসিটিভিতে মিলল নতুন তথ্য

কুমিল্লার লালমাইয়ে ধানক্ষেত থেকে উদ্ধার হওয়া সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় তদন্তে নতুন তথ্য পেয়েছে পুলিশ। মৃত্যুর আগের রাতে পদুয়ার বাজারের নূরজাহান হোটেলের সামনে বাস থেকে নামার পর ওই কিশোরীর চলাচলের সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া গেছে। এতে তাকে কয়েকটি দোকানের সামনে যেতে এবং এক দোকানির সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়। তবে সেখান থেকে বের হওয়ার পর সে কোন পথে গিয়েছিল, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
বিজ্ঞাপন
ফুটেজ অনুযায়ী, বুধবার (৭ অক্টোবর) রাত পৌনে ১২টার দিকে কক্সবাজার থেকে আসা আইকনিক পরিবহনের একটি বাস থেকে পদুয়ার বাজারের নূরজাহান হোটেলের সামনে নামে কিশোরীটি। এরপর হোটেলের পাশের খাবারের দোকান এবং পশ্চিম দিকে কয়েকটি স্টেশনারি দোকানের কাছে যায় সে। একটি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে দোকানির সঙ্গে কথা বলতেও দেখা যায় তাকে। এ সময় দোকানিকে কিছু একটা দেখাতে বা দিকনির্দেশনা দিতে দেখা যায়।
ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রাত ১২টার দিকে দোকানের সামনে কিছু একটা দেখানোর পর কিশোরীটি অন্য পাশে চলে যায়। রাত সোয়া ১২টার দিকে তাকে নূরজাহান এলাকা ছেড়ে যেতে দেখা যায়। এরপর তার গতিবিধির আর কোনো সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া যায়নি। ফলে সে কোন পথে গিয়েছিল এবং কীভাবে যাতায়াত করেছিল, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
বাস থেকে নামার পর কিশোরীটি কোথায় গিয়েছিল, কারও সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল কি না এবং মরদেহ উদ্ধারের স্থান থেকে কিছুটা দূরে পাওয়া সিএনজিচালিত অটোরিকশাটির সঙ্গে তার কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
ধানক্ষেতে দৌড়াদৌড়ি ও ধস্তাধস্তির চিহ্ন
বিজ্ঞাপন
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি ধানক্ষেত থেকে কিশোরীটির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনাস্থলের আশপাশের চার-পাঁচটি ধানক্ষেতে ধানগাছ এলোমেলো অবস্থায় পাওয়া যায়। কাছেই পড়ে ছিল একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা।
ঘটনাস্থল ঘুরে দেখা যায়, গ্রামের ভেতর দিয়ে যাওয়া নির্জন পাকা সড়কের দুই পাশে বিস্তৃত ফসলি জমি। সড়কের পাশের কয়েকটি ধানক্ষেতে দৌড়াদৌড়ি ও ধস্তাধস্তির চিহ্ন রয়েছে। একটি ধানক্ষেতে পড়ে থাকা সিএনজিচালিত অটোরিকশাটি পরে স্থানীয়রা টেনে সড়কের ওপর তোলেন।
স্থানীয় বাসিন্দা রুহুল আমিন জানান, সকালে ধানক্ষেতে একটি সিএনজি পড়ে থাকার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান তিনি। অটোরিকশা থেকে ২০-৩০ গজ দূরে একটি ভ্যানিটি ব্যাগ দেখতে পান। আশপাশের ধানক্ষেতে দৌড়াদৌড়ি ও ধস্তাধস্তির চিহ্ন দেখে এগিয়ে গিয়ে একটি ধানক্ষেতে নারীর মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন। মরদেহের মাথা কাদায় গোঁজা ছিল এবং গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল।
বিজ্ঞাপন
পরে তিনি মরদেহটি গামছা দিয়ে ঢেকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে পুলিশকে খবর দেন।
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা জহিরুল ইসলাম বলেন, ধানক্ষেতের অবস্থা দেখে তার মনে হয়েছে, কিশোরীটিকে নির্যাতন করা হয়ে থাকতে পারে। ধস্তাধস্তির চিহ্নও দেখা গেছে বলে জানান তিনি। তার দাবি, হামলাকারীদের হাত থেকে বাঁচতে মেয়েটি অনেক চেষ্টা করেছিল। এ ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তিনি।
বাবাকে পাঠিয়েছিল লাইভ লোকেশন
বিজ্ঞাপন
নিহত কিশোরীর বাবার ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৪ অক্টোবর কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকার ভাড়া বাসা থেকে বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বের হয় তার মেয়ে। পরে বান্ধবীর সঙ্গে কক্সবাজারে যায় সে। বুধবার রাতে কুমিল্লার উদ্দেশে বাসে রওনা হওয়ার পর মেয়েকে একাধিকবার ফোন করেন বাবা। কিন্তু কল রিসিভ না হওয়ায় পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।
নিহত কিশোরীর বাবা জানান, বুধবার রাত আনুমানিক পৌনে ২টার দিকে মেয়ে তাকে মোবাইল ফোনে বার্তা ও লাইভ লোকেশন পাঠায়। বার্তায় তাকে গিয়ে নিয়ে আসতে বলে।
তিনি বলেন, ‘তখন আমি ঘুমে ছিলাম। পরে সকালে মেসেজ দেখি। তারপর লাইভ লোকেশনে এসে মেয়ের মরদেহ উদ্ধার হচ্ছে দেখতে পাই।’
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
কিশোরীটির শিক্ষক সাদ বিন এরশাদ জানান, তিনি দীর্ঘদিন ধরে মেয়েটিকে পড়িয়েছেন। তার ভাষ্য, মেয়েটি চঞ্চল স্বভাবের ছিল। মা কিছুটা অসুস্থ থাকায় দুই যমজ ভাইয়ের দেখাশোনাও করত সে। তার বাবা একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করেন। এ হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেন শিক্ষক।
বিজ্ঞাপন
তদন্তে পুলিশের একাধিক দল
পুলিশের অনুসন্ধানে জানা গেছে, ৪ অক্টোবর বাসা থেকে বের হওয়ার পর কিশোরীটি পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিল। ব্রাহ্মণবাড়িয়া হয়ে কুমিল্লায় আসার পর সে কক্সবাজারে যায়। বুধবার দুপুরের পর কক্সবাজার থেকে বাসে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা হয়। তবে যাত্রাপথে তার সঙ্গে কেউ ছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রাত সাড়ে ১০টার দিকে পদুয়ার বাজারের নূরজাহান হোটেলের সামনে বাস থেকে নামে সে।
লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান জানান, কিশোরীটির মৃত্যুর সঠিক কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। প্রথমে মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। পরে পরিচয় নিশ্চিত হয়। কীভাবে ঘটনাটি ঘটেছে এবং কারা এতে জড়িত, তা উদ্ঘাটনে পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে।
বিজ্ঞাপন
কুমিল্লার সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (সদর দক্ষিণ সার্কেল) মোস্তাইন বিল্লাহ ফেরদৌস জানান, ঘটনাস্থল থেকে জব্দ করা সিএনজিচালিত অটোরিকশাটির নিবন্ধন রয়েছে। সেই সূত্র ধরে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশের একাধিক ইউনিট কাজ করছে।
এ ঘটনায় নিহত কিশোরীর বাবা বাদী হয়ে লালমাই থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন। তদন্তকারীরা সিসিটিভি ফুটেজ, অটোরিকশার নিবন্ধন এবং কিশোরীর চলাচলের তথ্য যাচাই করে ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা করছেন।








