ইসলামী ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেশের অর্থনীতি মাটির সঙ্গে মিশে যাবে

দেশের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ড. শফিকুর রহমান। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ব্যাংকটির স্থিতিশীলতা নষ্ট হলে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষতিই হবে না, বরং দেশের অর্থনীতি মাটির সঙ্গে মিশে যাবে।
বিজ্ঞাপন
মঙ্গলবার (৯ জুন) জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে ব্যাংকিং খাতের বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরে তিনি ইসলামী ব্যাংকের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দেন।
ড. শফিকুর রহমান বলেন, অতীতে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যাংকটির মালিকানা কাঠামোয় পরিবর্তন আনা হয়েছিল। যেসব প্রকৃত শেয়ারধারী নানা চাপের মুখে শেয়ার ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। তিনি দাবি করেন, এ বিষয়ে স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য জনগণের সামনে তুলে ধরা উচিত।
বিজ্ঞাপন
তিনি আরও বলেন, অতীতের বিভিন্ন আর্থিক অনিয়ম ও ঋণ কেলেঙ্কারির সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ব্যাংকটির স্বাভাবিক কার্যক্রম ফিরিয়ে আনতে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। তার মতে, ব্যাংকিং খাতের প্রতি মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধার করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি অভিযোগ করেন, অতীতে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন—এমন ব্যক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বসানো হলে গ্রাহক ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়তে পারে। একটি সংকটাপন্ন প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে আরও সতর্কতা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সংসদে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার ও মালিকানা সংক্রান্ত বিষয়ও তুলে ধরেন। তার দাবি, ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের পেছনে যেসব আর্থিক লেনদেন ও মালিকানা পরিবর্তন ঘটেছে, সেগুলো নিয়ে বহু প্রশ্ন রয়েছে। এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে।
বিজ্ঞাপন
ব্যাংকের জনবল নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পর্কেও সমালোচনা করেন ড. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, অতীতে নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে অনেক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব নিয়োগের বৈধতা ও স্বচ্ছতা যাচাই করা প্রয়োজন।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কিছু বক্তব্যেরও জবাব দেন। কোনো রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে আর্থিক সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে মত দেন তিনি। একইসঙ্গে অভিযোগের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
নিজেকে ইসলামী ব্যাংকের একজন ক্ষুদ্র শেয়ারধারী ও দীর্ঘদিনের গ্রাহক উল্লেখ করে তিনি বলেন, ব্যাংকটি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নয়; এটি লাখো গ্রাহক, আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীর আস্থার প্রতীক। দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা ও ধর্মের মানুষ এই ব্যাংকের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংকের ওপর মানুষের দীর্ঘদিনের বিশ্বাস তৈরি হয়েছে। সেই বিশ্বাস ক্ষতিগ্রস্ত হলে ব্যাংকিং খাতের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে প্রবাসী বাংলাদেশিদের একটি বড় অংশ এই ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন করেন। ফলে ব্যাংকটিকে ঘিরে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে রেমিট্যান্স প্রবাহেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, রাজনৈতিক বিবেচনার বাইরে গিয়ে বাস্তব পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। তিনি মনে করেন, ব্যাংকটির কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা এবং গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
বিজ্ঞাপন
ড. শফিকুর রহমান আরও বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাতে ইতোমধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সংকটে পড়েছে। অনেক আমানতকারী নিজেদের অর্থ ফেরত পেতে নানা সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে দেশের বৃহৎ একটি ব্যাংকও যদি অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে, তাহলে সামগ্রিক আর্থিক খাতের ওপর তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তে পারে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে এবং ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে সৃষ্ট উদ্বেগ দূর করতে কার্যকর উদ্যোগ নেবে। এতে শুধু একটি ব্যাংক নয়, পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাও আরও শক্তিশালী হবে।








