রোজার মাসে মোবাইল আসক্তি কমাবেন যেভাবে

স্মার্টফোন এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। অনেকেই ঘুম থেকে উঠেই প্রথমে ফোন দেখেন, আবার ঘুমাতে যাওয়ার আগেও শেষ কাজ থাকে স্ক্রিনে চোখ রাখা। যুক্তরাজ্যের টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা Ofcom–এর তথ্য অনুযায়ী, দেশটির নাগরিকেরা গড়ে প্রতি ১২ মিনিটে একবার ফোন দেখেন। যুক্তরাষ্ট্রে এই হার আরও বেশি—সেখানে ব্যবহারকারীরা গড়ে প্রতি ৭ মিনিটে একবার ফোন চেক করেন।
বিজ্ঞাপন
এই অভ্যাসের পেছনে বড় ভূমিকা রাখে ডোপামিন বা সুখানুভূতির হরমোন। মস্তিষ্কে উৎপন্ন এই রাসায়নিক পদার্থ আনন্দের অনুভূতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। মজার বিষয় হলো, শুধু আনন্দ পাওয়ার সময় ডোপামিন নিঃসৃত হয় বিষয়টি এমন নয় বরং আনন্দ পাওয়ার প্রত্যাশা তৈরি হলেও নিঃসৃত হয়। ফলে বারবার ফোন চেক করার তাগিদ তৈরি হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অ্যাপ এমনভাবে নকশা করা হয়েছে যাতে ব্যবহারকারীরা বারবার ফিরে আসেন। Stanford University–এর মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক Anna Lembke একে আখ্যা দিয়েছেন “ডিজিটাল ডোপামিন ইনজেকশন” হিসেবে। তার মতে, লাগাতার ব্যবহারে মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে ডোপামিনের প্রতি কম সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। এর ফলে উদ্বেগ, বিষণ্ণতা ও অনিদ্রা দেখা দিতে পারে। তখন ফোন শুধু প্রয়োজন নয়, ভেতরের শূন্যতা এড়ানোর মাধ্যম হয়ে ওঠে।
বিজ্ঞাপন
ডোপামিন ফাস্টিং কী?
ডোপামিন ফাস্টিং মূলত আচরণগত থেরাপি থেকে অনুপ্রাণিত একটি পদ্ধতি। এর লক্ষ্য হলো অতিরিক্ত উদ্দীপক যেমন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বারবার নোটিফিকেশন, ভিডিও গেম এসবের সঙ্গে বাধ্যতামূলক মিথস্ক্রিয়া কমানো। এখানে ডোপামিন পুরোপুরি বন্ধ করার কথা বলা হয় না; বরং যেসব কর্মকাণ্ড অতিরিক্ত ডোপামিন নিঃসরণ ঘটায়, সেগুলো নিয়ন্ত্রণে আনার ওপর জোর দেওয়া হয়।
এই ধারণার প্রবর্তক ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার ক্লিনিক্যাল মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ক্যামেরন সেপাহ। তার মতে, ডোপামিন ফাস্টিং মানে শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার কমানো নয়; বরং বই পড়া, ধ্যান করা, হাঁটার মতো স্বাভাবিক ও সহজ কাজে আনন্দ খুঁজে নেওয়ার প্রশিক্ষণ। সাময়িকভাবে একঘেয়েমি বা নিঃসঙ্গতা মেনে নেওয়াও মস্তিষ্ককে রিসেট করতে সাহায্য করে। এর মাধ্যমে মনোযোগ বৃদ্ধি পায়, ইচ্ছাশক্তি দৃঢ় হয় এবং মানসিক স্থিতি তৈরি হয়।
বিজ্ঞাপন
রমজান ও ডোপামিন
রমজানের রোজা ডোপামিনের নিঃসরণকে স্বাভাবিক ভারসাম্যে আনতে সহায়ক। খাবার ও পানীয় থেকে বিরত থাকা তাৎক্ষণিক উদ্দীপনা কমায়, ফলে মস্তিষ্ক নতুন করে ভারসাম্য ফেরানোর সুযোগ পায়।
একই সঙ্গে নামাজ, তিলাওয়াত ও অন্যান্য ইবাদত মস্তিষ্কের তৃপ্তির ব্যবস্থাকে ইতিবাচকভাবে সক্রিয় করে, প্রশান্তি দেয়।
বিজ্ঞাপন
তবে রোজার সময় অতিরিক্ত ফোন ব্যবহার করলে এই উপকারিতা কমে যেতে পারে। ফোন তখন ডোপামিনের বিকল্প উৎসে পরিণত হয়, বাড়তে থাকে মানসিক চাপ ও ক্লান্তি।
রমজানে ডোপামিন ফাস্টিংয়ের কিছু কার্যকর কৌশল
ফোন ব্যবহারে স্পষ্ট লক্ষ্য ঠিক করুন
বিজ্ঞাপন
ইফতারের পর বা প্রত্যেক নামাজের পর নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে ফোন না ধরার সিদ্ধান্ত নিন। অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ করুন, আসক্তিকর অ্যাপ এড়িয়ে চলুন।
ফোন হাতের নাগালের বাইরে রাখুন
ইবাদতের সময় ফোন অন্য ঘরে বা ড্রয়ারে রাখুন। প্রয়োজন হলে ফ্লাইট মোড বা ডু নট ডিস্টার্ব চালু করুন।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন: রোজা শুরুর তারিখ জানা যাবে আজ সন্ধ্যায়
মাত্র ১৫ মিনিটের নিয়ম মেনে চলুন
ফোন ধরার ইচ্ছে হলে ১৫ মিনিট অপেক্ষা করুন। অনেক সময় এই বিরতিতেই আগ্রহ কমে যায়।
বিজ্ঞাপন
নিজের সঙ্গে সৎ থাকুন
বিরক্তি, চাপ বা অভ্যাস—কোন কারণে ফোন বেশি ব্যবহার করছেন, তা চিহ্নিত করুন। সম্পূর্ণ বর্জনের পরিবর্তে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ আনার চেষ্টা করুন।
বিকল্প কাজে ব্যস্ত থাকুন
বিজ্ঞাপন
ইবাদত, বই পড়া, শরীরচর্চা, স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে যুক্ত হন। পরিবারের সঙ্গে ইফতারের প্রস্তুতিও হতে পারে ফোনের ভালো বিকল্প।
অগ্রগতিতে নিজেকে পুরস্কৃত করুন
ফোন কম ব্যবহারের অভ্যাসে সফল হলে নিজেই নিজেকে পুরস্কার দিন। পরিবারকে সময় দিন অথবা সবাইকে নিয়ে পছন্দের খাবার খান।
বিজ্ঞাপন
মনে রাখবেন, ফোন কম ব্যবহার মানে পিছিয়ে পড়া নয়; বরং নিজের ভেতর মনোযোগ ও প্রশান্তি ফিরিয়ে আনা। রমজানই হতে পারে শরীরের পাশাপাশি মন ও ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের অভ্যাস নতুন করে সাজানোর সুবর্ণ সুযোগ।








